দৃশ্য জগতের বাইরে আর একটি জগৎ আছে, সেটি অদৃশ্য জগৎ। দৃশ্য জগৎ সম্পর্কে আমরা কতটা জানি? অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে জানার প্রশ্নই ওঠে না। তবে মহান আল্লাহ অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে যতটুকু জানিয়েছেন, কেবল ততটুকুই আমরা জানি। আর এই জানার মাধ্যম ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী (স.)। পরকাল আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়, তবুও আমরা পরকালে বিশ্বাস করি। কারণ, মহান আল্লাহ নবীর মাধ্যমে পরকালের কথা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান সভ্যতায় যারা ইহুদি ও খৃস্টান হিসেবে পরিচিত, তাদের নবীরাও অনুসারীদের পরকাল এবং সেখানে জবাবদিহিতার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এসব ধর্মে বিশ্বাসী মানুষরা পরকালে জবাবদিহিতার বিষয়টি কথায় স্বীকৃতি দিলেও তাদের আচরণে এর প্রতিফলন কতটা লক্ষ্য করা যায়? তাদের অধিকাংশের আচরণেই ইহলোকিকবাদিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইহলোকই তাদের কাছে মুখ্য, পরলোক গৌণ। এরা এখন ‘সেক্যুলার’ হিসেবে পরিচিত। পরকালে জবাবদিহিতার বিষয়টি তাদের কাছে তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। ফলে বর্তমান সভ্যতায় তারা ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, প্রযুক্তি সক্ষমতা অর্জনে এবং পৃথিবী শাসনে ভূরাজনীতির কূটচালে বেশ বেপরোয়া। পারমাণবিক অস্ত্রে ক্ষমতাবান শাসকরা এখন যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রভু হয়ে উঠেছেন। তাদের শাসন-প্রশাসনে প্রিয় পৃথিবীটা ক্রমেই মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এর বড় প্রমাণ গাজা।
‘গাজা ট্র্যাজেডি’ কি শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য? ভিন্ন এক ট্র্যাজেডির শিকার হচ্ছে ইহুদিরাও, বিশেষ করে ইসরাইলি সেনারা। আর সেটা হলো মানসিক যন্ত্রণা ও আত্মদহনের ট্র্যাজেডি। গাজায় দুই বছর ধরে হামলার সময় এবং এরপর থেকে ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে আত্মহত্যা ও আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপ সংক্রান্ত রোগ (পিএসটিডি) বাড়ছে। জেরুসালেম থেকে রয়টার্স জানায়, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনগুলোয় ইসরাইলি বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংকটের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আগ্রাসী ও যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র ইসরাইলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়। সেদিন থেকেই গাজা উপত্যকায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতিতে যায় হামাস ও ইসরাইল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে কার্যকর হয়নি। ইসরাইল বিভিন্ন মাত্রায় হামলা চালিয়ে গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাদের হামলায় গাজায় ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা সংঘাতের কারণে ইসরাইলি সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তাদের পিএসটিডি বা মানসিক রোগের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া গাজায় আগ্রাসনের সময় আহত ২২ হাজার ৩০০ সেনার মধ্যে ৬০ শতাংশ পিএসটিডিতে ভুগছেন।
ইসরাইলের এমেক মেডিকেল সেন্টারে যুদ্ধফেরত সেনাদের ওপর গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন মনোবিজ্ঞানী রোনেন সিদি। তিনি বলেন, ইসরাইলি সেনারা সাধারণত দুই কারণে পিএসটিডি তথা মানসিক রোগে ভুগছেন। একটি হলো যুদ্ধের সময় মৃত্যুর ভয়। আর অপরটি হলো নৈতিক আঘাত। যুদ্ধের সময় তারা এমন সব কর্মকাণ্ড করেছেন, যার ফলে এখন মানসিক পীড়ায় ভুগছেন। ইসরাইলি পার্লামেন্ট কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৭৯ জন ইসরাইলি সেনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এটি আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি। এছাড়া ২০২৪ সালে ইসরাইলে যতজন আত্মহত্যা করেছেন, তাদের ৭৮ শতাংশই যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইসরাইলি সেনা। চিকিৎসা না দিলে এই হার আরও বাড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেন রোনেন সিদি। এমন চিত্র থেকে উপলব্ধি করা যায়, এক ধরনের হতাশায় ভুগছেন ইসরাইলি সেনারা। তারা গাজায় যুদ্ধ করার কোনো নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। এছাড়া তারা গাজায় নারী, শিশু ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এমনসব জুলুম-নির্যাতন ও নৃশংসতা চালিয়েছেন; যার কারণে এখন তারা মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। ইসরাইলিদের জন্য এটা এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি।