বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বাইরে বসবাসরত কোটি প্রবাসী নাগরিকের অংশগ্রহণের ঘাটতিতে ভুগছিল। রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখা প্রবাসীরা বারবার দাবি জানালেও বাস্তবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন যে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ চালু করেছে-তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ইতোমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৭২ জন প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছেনÑযা প্রবাসী বাংলাদেশিদের গভীর আগ্রহ ও দায়িত্ববোধের প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইতালি এবং মালয়েশিয়ায় সর্বাধিক নিবন্ধন-এ থেকে স্পষ্ট যে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশীরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে আগ্রহী। তাদের এ আগ্রহ দেশপ্রেম, নাগরিকত্ববোধ এবং দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশগ্রহণের আকাক্সক্ষাকে প্রতিফলিত করে।

নির্বাচন কমিশন সময়ের দাবি মেনে নিবন্ধনের সময়সীমা ১৮ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছেÑএটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ছুটিÑঅবকাশের কারণে অনেক প্রবাসী এই সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। সময়সীমা বাড়ানোয় আরও বহু প্রবাসী সহজেই নিবন্ধন করতে পারবেন, যা অংশগ্রহণের পরিধি বাড়াতে সহায়ক হবে। অ্যাপ-ভিত্তিক এ নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুধু প্রবাসীদের জন্যই নয়, ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং (ওঈচঠ) পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, আইনি হেফাজতে থাকা নাগরিক এবং কর্মস্থলের কারণে নিজ এলাকা থেকে দূরে থাকা সরকারি চাকরিজীবীরাও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় এটি এক বিরল আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর সংস্কারের পথ সুগম করতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি অনেক প্রবাসীই ব্যবহার করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক সময় ভেরিফিকেশন কোড পৌঁছাতে সমস্যা হয়, কখনো আবার ঠিকানা যাচাই জটিল হয়ে পড়ে। তাই অ্যাপটি আরও ব্যবহারবান্ধব ও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি প্রতিটি দূতাবাসে একটি বিশেষ হেল্পডেস্ক চালু করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, বিদেশে ব্যালট পৌঁছানোর জন্য সঠিক ঠিকানা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকানা বা যোগাযোগ নম্বরে ত্রুটি হলে ভোটাররা ব্যালট নাও পেতে পারেন-এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপে ঠিকানা যাচাই অত্যাবশ্যক। তৃতীয়ত, পোস্টাল ব্যালটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যালট পাঠানো থেকে ভোট গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই হতে হবে স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং প্রযুক্তিগতভাবে সুরক্ষিত। ভোট গণনার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতি যেন না তৈরি হয়-সেটিই এখন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না; তাদের শ্রম, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের অগ্রযাত্রায় এক অমূল্য সম্পদ। রাষ্ট্রের অর্থনীতি আজ যে অবস্থানে, তার পেছনে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা মানে কেবল একটি সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা নয়-এটি রাষ্ট্র ও প্রবাসী সমাজের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা। এ প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রবাসী ভোটার সংখ্যা আরও বাড়বে এবং নির্বাচনব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও প্রবাসী ভোটারদের গুরুত্ব বুঝে তাদের সামনে দেশের উন্নয়ন-উন্নয়ন, সুশাসন ও গণতন্ত্রের রূপরেখা তুলে ধরতে হবে।

পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা কেবল একটি নতুন ভোটিং পদ্ধতি নয়; বরং এটি প্রবাসীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের দরজা উন্মুক্ত করেছে। এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক বিকাশকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন যে উদ্যোগ নিয়েছে-তা অবশ্যই সময়োপযোগী, দূরদর্শী ও জনবান্ধব। এখন একমাত্র প্রত্যাশা-এই সুযোগ যেন বাস্তবে ফলপ্রসূ হয় এবং প্রবাসীদের কণ্ঠ যেন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়।