জেফরি এপস্টিন। যৌন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এপস্টিনের মন্দ কর্মের তালিকা দীর্ঘ। এপস্টিনের সাথে যারা সম্পর্ক রেখেছেন তারাই এখন বিপদে। ‘এপস্টিন ফাইল’ এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে গোটা বিশ্বে। এপস্টিন ফাইল এমন এক আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয়েছে আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকৃত রূপ। এই ফাইল কোনো একক অপরাধীর গল্প নয়; বরং এটি পুরো সভ্যতার ব্যর্থতার দলিল। এপস্টিন ফাইল কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবও নয়; বরং এটি তদন্ত সংস্থা, আদালত ও সরকারি নথির সমন্বয়ে তৈরি এক বাস্তব দলিল। এই দলিল দেখিয়ে দেয়, কিভাবে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় ধরে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, যার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ বারবার উঠেছে। তারা শুধু সমপর্কই বজায় রাখেননি, এপস্টিনের সব অপকর্মে সঙ্গও দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন জাগে, এমন একটি ব্যবস্থা কি করে তৈরি হলোÑযেখানে শিশু ও কিশোরীদের আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল, অথচ ক্ষমতাবানরা রয়ে গেলেন নিরাপদে?
রাজপুত্র কিংবা রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক কিংবা রাজনীতিবিদÑজেফরি এপস্টিন কেলেঙ্কারির নথি প্রকাশের পর ধসে পড়ছে তাদের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। তবে এই পতনের জোয়ারটা যেন বইছে কেবল আটলান্টিকের ওপারে, ইউরোপে। ৩০ লাখ পৃষ্ঠার এপস্টিন ফাইল প্রকাশের পরও যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাতরা রয়েছেন রহস্যজনক এক রক্ষাকবচের ছায়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত এপস্টিন সংক্রান্ত নথির বিশাল ভাণ্ডার ইউরোপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিজাত মহলে তীব্র ধাক্কা দিয়েছে। এসব নথির চাঞ্চল্যকর তথ্য সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে এবং ক্ষমতাবান অনেক ব্যক্তিকে টেনে নামিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে এখন চলছে কঠিন রাজনৈতিক ও ফৌজদারি তদন্ত। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার জেরে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও নেতৃত্বের বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছেন। নরওয়ে, সুইডেন ও স্লোভাকিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের অনেক ব্যক্তি একইভাবে ধরাশায়ী হয়েছেন। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক নথিগুলো প্রকাশ্যে আসার আগেই রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর তার রাজকীয় সম্মাননা, পদবি ও রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত বিলাসবহুল প্রাসাদ হারিয়েছেন। অবশ্য অ্যান্ড্রু ছাড়া তাদের কারও বিরুদ্ধেই সরাসরি যৌন নিপীড়নের কোনো অভিযোগ নেই। তবে সাজাপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী জেনেও এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার দায়েই তাদের ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়তে হয়েছে। লন্ডনের হাওয়ার্ড কেনেডির আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ মার্ক স্টিফেনস বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেনÑলোকে যেভাবে ফ্লাইং পয়েণ্ট সংগ্রহ করে, এপস্টিন সেভাবেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংগ্রহ করতেন। কিন্তু সেই ভ্রমণের সব রসিদ এখন জনসমক্ষে চলে এসেছে।
এপস্টিন ফাইল নিয়ে ইউরোপে তোলপাড় চললেও আটলান্টিকের এপারের চিত্র ভিন্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি যেন জেনেশুনেও চোখ বুজে আছে। ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্কের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়ার পরও দলের নেতারা উল্টো প্রেসিডেন্টের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্প অবশ্য এপস্টিন সংক্রান্ত যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। এপস্টিন নথিতে লুটনিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় যেখানে সামান্য পরকীয়া বা ধূমপানের অভিযোগে ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেত, সেখানে এখন বড় কেলেঙ্কারিতেও কারও পদত্যাগ না করাটা ‘ট্রাম্প যুগের’ পরিবর্তিত নৈতিকতারই প্রতিফলন। তাদের মতো, ট্রাম্পের নিজের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং চরম রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং কেলেঙ্কারির প্রতি এক ধরনের সহনশীলতা তৈরি করেছে। এটাই হলো বর্তমান সভ্যতার মর্মকথা, যা তৈরি করেছেন এপস্টিন ও ট্রাম্পের মত ব্যক্তিরা।