আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী ঘটনা। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা যে আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত ছিল, এ সিদ্ধান্ত সে প্রেক্ষাপটে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নির্বাচনকে আবার গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে- এটি নিঃসন্দেহে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় কমিশনের উচ্চ প্রতিনিধি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজা কালাস আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে একটি পূর্ণাঙ্গ ইইউ ইলেকশন অবজারভেশন মিশন (ইওএম) নিয়োগ দিয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবসকে প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইইউ স্পষ্ট করেছে যে তারা এ নির্বাচনকে আনুষ্ঠানিকতার চোখে নয়, বরং গভীর গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করছে।

এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনস্বীকার্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ভোটারবিহীন কেন্দ্র, রাতের ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন ও বিরোধী দলগুলোর কার্যত অনুপস্থিতির অভিযোগ সে নির্বাচনগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ফলস্বরূপ, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পর্যবেক্ষক দল ধীরে ধীরে বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় কিংবা সীমিত পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এমন প্রেক্ষাপটে ইইউর বর্তমান সিদ্ধান্তকে কেবল একটি পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর ঘোষণা হিসেবে দেখলে তার গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবে না বরং এটি বোঝায় যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আসন্ন নির্বাচনকে একটি সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন আয়োজন সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণার প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের একটি প্রাথমিক আস্থার প্রতিফলন বলেও মনে করা যেতে পারে।

ইভার্স ইজাবসের বক্তব্যও সে ইঙ্গিতই বহন করে। তিনি বলেছেন, এ মিশন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন মূল্যায়ন তুলে ধরবে এবং এটি বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতি ইইউর সমর্থনের একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। ইইউ আরও জানিয়েছে, তারা কেবল ভোটের দিন নয়-পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই পর্যবেক্ষণ করবে এবং বিভিন্ন ধাপে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও মতবিনিময় করবে। এ ‘প্রক্রিয়াভিত্তিক পর্যবেক্ষণই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে বাস্তবতা হলো, বিদেশি পর্যবেক্ষক মিশনের উপস্থিতি কোনো নির্বাচনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য করে তোলে না। নির্বাচন ব্যবস্থার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন কি না, বিরোধী দলগুলো সমান সুযোগ পাবে কি না, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ থাকবে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হবে মাঠের বাস্তবতায়, কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নয়।

এ প্রশ্নেই অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন শুধু একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়; এটি দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পূর্বশর্ত। ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের উপস্থিতি সরকারকে যেমন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের একটি সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি এটি একটি বড় ধরনের দায়বদ্ধতাও তৈরি করেছে। নির্বাচন যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক না হয়, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন সে ব্যর্থতাই স্পষ্ট করে তুলে ধরবে।

এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সংলাপ, সমঝোতা ও সহনশীলতার রাজনীতিতে ফিরে না এলে শুধু পর্যবেক্ষক মিশনের উপস্থিতি দিয়ে গণতন্ত্রের সংকট কাটানো সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের আগমন বাংলাদেশের জন্য একদিকে একটি সুযোগ, অন্যদিকে একটি কঠিন পরীক্ষা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে যদি একটি গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা যায়, তবে তা শুধু আন্তর্জাতিক আস্থাই পুনরুদ্ধার করবে না, বরং দেশের ভেতরেও গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশা ও অনাস্থা দূর করার পথ খুলে দেবে। আর সেটিই হবে এ মিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।