বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মধ্যে কিছুটা বিভেদের সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে। এতদিন তো তারা মিলেমিশেই আগ্রাসনের নীতি অবলম্বন করেছেন। এর বড় উদাহরণ ফিলিস্তিন। আগ্রাসনের ছোঁয়া নিজের গায়ে লাগায় এখন হয়তো ইউরোপ উপলব্ধি করতে পারছে, আগ্রাসন খুব মন্দ বিষয়। প্রশ্ন জাগে, সঠিক উপলব্ধিতে এতোটা বিলম্ব ঘটলো কেন? কোন বিষয়টা তাদের আটকে রেখেছিলো? পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্বের বিষয়টা স্পষ্ট করতে গেলে বলতে হয়, এটা ইউরোপ এবং আমেরিকার স্বার্থের দ্বন্দ্ব। বিবিসি জানায়, ইউরোপ গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তর না করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, ভয়ভীতি বা দাদাগিরির কাছে ইউরোপ কখনোই মাথা নত করবে না। আটলান্টিকের দুই পাড়ের মধ্যে উত্তেজনা এড়াতে ইউরোপের অনেক নেতা সতর্ক ভাষায় কথা বলছেন, সেখানে ম্যাক্রোঁ নিয়েছেন কড়া অবস্থান। দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স ও ইউরোপ কোনোভাবেই ‘শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম’ মেনে নেবে না। তা করলে ইউরোপ ধীরে ধীরে পরাধীন হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন। ম্যাক্রোঁ আরো বলেন, বিশ্ব রাজনীতি যদি নীতিহীনতার দিকে এগোয়ও, ইউরোপ ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে আপস করবে না। তার ভাষায়, গুণ্ডামির বদলে সম্মান এবং বর্বরতার বদলে আইনের শাসনই ইউরোপের পছন্দ।

প্রশ্ন হলো, গুণ্ডামি ও বর্বরতা কি শুধু ইউরোপেরই অপছন্দের বিষয়? বিশ্বের কোনো মানুষেরই গুণ্ডামি ও বর্বরতা পছন্দ নয়। অথচ যুগের পর যুগ এসবের নির্মম শিকার হয়েছে বিশ্বের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর নাগরিকরা। তাদের আর্তনাদ শুনেনি পাশ্চাত্য। এই ‘পাশ্চাত্য’ শুধু আমেরিকা নয়, এরমধ্যে সামিল ছিল ইউরোপও। নিজের গায়ে আঘাত লাগার পর আজ ভিন্ন সুরে কথা বলছে ইউরোপ। এদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অবস্থানে এখনো অনড় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই এবং এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। গ্রিনল্যাণ্ড ইস্যুতে বিরোধিতার জেরে আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি স্থগিতের কথা ভাবছে।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ এখন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে তারা গুণ্ডামি ও বর্বরতা হিসেবে অভিহিত করছেন। ইউরোপ এখন স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের কথা বলছে। এটা কি শুধু গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? ফিলিস্তিন-এর বাইরে থাকবে কেন? ইউরোপ যদি আসলেই আগ্রাসন, গুণ্ডামি ও বর্বরতার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নেওয়ার সাহস রাখে, তাহলে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পক্ষেও তাদের একই ভাষায় কথা বলতে হবে। কারণ, ফিলিস্তিনের বর্তমান দুর্দশার জন্য ইউরোপেরও দায় আছে। সেই পাপ মোচনের এখনই সময়। শুদ্ধির পথে ইউরোপ এগিয়ে আসে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।