দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেছে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ খুব একটা সহজ কাজ হবে না। বিশেষ করে আগামীতে যে নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাসীন হতে যাচ্ছে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। বর্তমান ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে হার গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ব্যক্তিখাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাগণ নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করছেন। বিদেশি বিনিয়োগও খুব একটা আসছে না। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্বের কারণে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তার কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্বের কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, আগামীতে যে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে তাদের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে ব্যক্তি খাতে কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ আহরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগকাীরদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাসীন হলে দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি হবে। কারণ রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কিন্তু তাদের এ ধারণা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে কোনভাবেই কাক্সিক্ষত মাত্রায় স্থানীয়ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরিত হবে না।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ মোটেও সন্তোষজনক নয়। অনেক দিন ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২২ থেকে ২৩ শতাংশে আটকে আছে। বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দেখিয়েছিল ১৭৬তম। অর্থাৎ বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ খুব একটা অনুকূল নয়। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রকাশ বন্ধ রয়েছে। তার পরিবর্তে সংস্থাটি স্টার্ট বিজনেস নামে একটি নতুন সূচক প্রকাশ করেছে। মোট ৫০টি দেশকে বিবেচনায় নিয়ে প্রকাশিত এ সূচকে বাংলাদেশকে চতুর্থ স্তরে স্থান দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিকীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন উন্নতি করতে পারেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোন দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার রেটিং বিবেচনায় নেয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে নিকট অতীতে কোন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করছে। আগে যারা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিয়োজিত ছিলেন তারা এখন কিছুটা হলেও চুপ করে আছেন। আবার রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাসীন হলে দলীয় পরিচয়ে অন্য এক শ্রেণির কর্মকর্তা দুর্নীতিতে তৎপর হবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেরা পরিশুদ্ধ না হয় তাহলে এ অনাচার চলতেই থাকবে। স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের জন্য নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে দলীয় রাজনীতি চর্চা করেছেন তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে যারা কর্মরত আছেন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি বা কর্মকর্তা। তারা কোনভাবেই বিশেষ কোন সরকারের অনুকূলে দলীয় রাজনীতি চর্চা করতে পারেন না। দলীয় সরকার এ ব্যাপারে কতটা কঠোর হতে পারবেন সেটাই বিবেচ্য বিষয়।