এখন বড় নেতা হতে বড় গুণের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ধ্বংস করার ক্ষমতা। মানবসমাজে একসময় মানবিক গুণের কদর ছিল, তাই নেতারা মহৎ হতে চাইতেন। এখন তো ওই সবের বালাই নেই। নেতারা এখন ভয় দেখিয়ে জয় করতে চান, আর নাগরিকদের অনেকেই ভীত হয়ে নিরীহ জীবনযাপন বেছে নেন। এইতো আমাদের মানবসমাজ। এমন সমাজে ট্রাম্পই নেতা হবেন, নয়তো পুতিন। ট্রাম্প যেন অনেকটা অস্থির, পুতিন কিছুটা শান্ত এবং কৌশলী। তবে তারা কেউই মহৎ মানবিক গুণে মণ্ডিত নন। তাদের ভূরাজনীতি এবং মারণাস্ত্রের ব্যবহার দেখে বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। আত্মরক্ষার চাইতেও অধিক পারমাণবিক অস্ত্র তাদের অস্ত্রাগারে মজুত আছে। তারপরও চলছে অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা। আরও অস্ত্র, আরও শক্তি, আরও কূটনীতি, আরও যুদ্ধ-এসব নিয়েইতো আমাদের সভ্যতা। কেউ ভয় দেখাতে দৌড়াচ্ছেন, কেউ বা ভয় পেয়ে দৌড়াচ্ছেন। দৌড়ের মধ্যেই আছেন সবাই। শান্তি ও স্বস্তিতে নেই কেউ। এত বিজ্ঞান, এত সম্পদ, এত রাজনীতি-তারপরও কারো যেন কিছু নেই, সবাই অদ্ভুত ভিখারি এবং ক্লান্ত। ওদের মুখে দেখা যায় অতিকষ্টের শুষ্ক হাসি। সামান্য তৃণলতার মত প্রাণবন্ত হওয়ার সামর্থ্যও নেই আমাদের বিশ্বনেতাদের। প্রকৃতির বিপরীতে চললে এমন পরিণতিই স্বাভাবিক।
বর্তমান সভ্যতার কলঙ্কজনক দু’টি অধ্যায় হলো-ফিলিস্তিন ও ইউক্রেন। সেখানে এখন কারিগর হিসেবে কাজ করছেন ট্রাম্প এবং পুতিন। বেশ আলোচনা হয় ট্রাম্পকে নিয়ে, তবে পুতিনকে নিয়ে আলোচনা কমই হয়। তাই পুতিনের চাতুর্য নিয়ে আজ কিছুটা আলোকপাত করা যাক। পুতিনের সাথে জড়িয়ে আছে ইউক্রেন যুদ্ধ। প্রশ্ন আছে, ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন কি আসলেই কোনো সমঝোতা বা শান্তি চান, নাকি দেখাতে চান শক্তির দাপট? ৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে পুতিন আদৌ কোনো চুক্তি চান না। একটি চুক্তির জন্য তাকে যেভাবে তোষামোদ করা হচ্ছে, তা উপভোগ করবেন তিনি। মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে পাঁচ ঘণ্টা বৈঠকের পর কোনো সমঝোতায় যাননি পুতিন। বৈঠক থেকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারকে একরকম খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে। প্রায় চার বছর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনই শুরু করেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ। ভেবেছিলেন খুব সহজেই ইউক্রেনে জয় পাবনে তিনি। কারণ, আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে তখন বেশ বিব্রত অবস্থায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে আশা পূরণ হয়নি পুতিনের। ইউক্রেনের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ওয়াশিংটন ও ন্যাটো। ফলে এক বছর আগে যুদ্ধে ইউক্রেনের কৌশলগত জয়ের মতো এক অবিশ্বাস্য পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। যে কোনো মূল্যে যুদ্ধ থামাতে তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাফ জানিয়ে দেন, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নয়। আর কোনো অর্থ এর পেছনে অপচয় করতে চান না তিনি। এভাবে একটি শান্তিচুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার পেছনে ঘুরবে, এমনটি হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি পুতিন। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ চললেই মস্কোর লাভ। উল্লেখ্য, মস্কো-আলোচনায় কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন আবার ইউরোপীয়দের সাথে বসবেন, তারপর যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। প্রক্রিয়াটি হয়তো এভাবেই চলতে থাকবে। কারণ, সমঝোতা বা চুক্তির ব্যাপারে এখন পুতিন আগ্রহী নন। পুতিন একজন কৌশলী মানুষ। সুযোগকে কাজে লাগাতে চান তিনি। ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে তিনি একটি ভূরাজনৈতিক স্বপ্নবুনে চলেছেন। বৈশ্বিক নিরাপত্তার ভারসাম্য নতুন করে সাজিয়ে নিতে চাইছেন পুতিন। বহু দশক ধরে চলে আসা মার্কিন আধিপত্যে পরিবর্তন আনতে চান তিনি। এছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকতে যুদ্ধকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন পুতিন। ইউক্রেনে সামরিকভাবে এগিয়ে আছে রাশিয়া। বিপরীতে ইউক্রেনে চলছে সেনা ও তহবিল সংকট। এ কারণে বাড়ছে রাজনৈতিক সংকটও। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছেন পুতিন। ভূরাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে এখন বদ্ধপরিকর তিনি। বিষয়টি জানে যুক্তরাষ্ট্র। এখানে বলে রাখা ভালো যে, ট্রাম্প ও পুতিনরা কোনো নৈতিক মানুষ নন। ফলে চতুর ও সুযোগসন্ধানী মানুষ হিসেবে আধিপত্য বিস্তারে তারা গ্রহণ করবেন নানা কৌশল। এর একটি হলো সমর-কৌশল, যার সাথে জড়িয়ে আছে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা। শক্তির এ মহড়ায় তো মানুষের জন্য ভালো কোনো বার্তা নেই।