ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের উত্থাপিত দাবি এবং বাস্তবতার নিরিখে নতুন সরকার উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য খুব শীঘ্রই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, বাংলাদেশ এখনো উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার মতো অবস্থানে নেই। তাই উত্তরণ বিলম্বিত করার জন্য যা যা করা দরকার তা করা হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনেক দিন ধরেই উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার সময়সীমা পেছানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তাদের সে অনুরোধে সাড়া দেয়নি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরবর্তী ৮ বছর নানাভাবে যাচাই-বাছাই এবং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় চলতি বছর ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিঘাত সহনশীলতা এই তিনটি সূচকের মধ্যে দু’টি সূচকের মানদণ্ড অর্জন করতে পারলেই একটি দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ করা হয়। বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই সাফল্য প্রদর্শন করেছে।
কোন দেশই চিরদিন দরিদ্র দেশের তালিকায় থাকতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হতে পারা একটি দেশের জন্য মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি এ মুহূর্তে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর সেই মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম কিনা? এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর সে অর্জন ধরে রাখতে ব্যর্থ হবার কারণে তাদের আবারো স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ আমলে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অর্জনকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে এ মুহূর্তে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হলে তা আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হতে পারা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাকর হবে। কিন্তু সে মর্যাদা অর্জন করতে গিয়ে আমাদের যে মূল্য দিতে হবে তাও কম নয়। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আর্থিক কার্যক্রমে নানা ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা প্রদান করে। একক অঞ্চল হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশী তৈরি পোশাক সামগ্রির প্রায় অর্ধেকই রপ্তানি করা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে। উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর জিএসপি সুবিধা আপনা আপনি বাতিল হয়ে যাবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর আরো তিন বছর তারা জিএসপি সুবিধা বহাল রাখবে। কিন্তু তারপর কী হবে? জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহৃত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর প্রতি বছর গড়ে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হারাবে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কনসেশন পেয়ে থাকে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সুদ প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাতে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর যে অভিঘাত দেখা দেবে তা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে আসীন হোক আমরা তা চাই কিন্তু প্রাপ্ত মর্যাদা ধরে রাখার মতো সামর্থ্য আমাদের আছে কিনা সেটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অর্জন বিলম্বিত হওয়া ভালো। কিন্তু প্রাপ্ত অর্জন ধরে না রাখার ব্যর্থতা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। তাই এ ব্যাপারে বাস্তবতার আলোকে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।