মাত্র দু’তিন দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি এভাবে পাল্টে গেল কেন? এর পেছনে মৌলিক কোনো কারণ আছে কী? আমরা দু’প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের কথা বলছি। খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গত বুধবার ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। একই সঙ্গে তারেক রহমানের কাছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠিও হস্তান্তর করা হয়। চিঠিতে দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা ছিল। এতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, বৈরিতাকে দূরে সরিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের পথে হয়তো অগ্রসর হচ্ছে ভারত। তবে দু’দিন যেতে না যেতেই সম্পর্ক উন্নয়নের সে প্রত্যাশায় যেন যতি টানা হলো। গত শনিবার বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ আমলে নিয়ে এবারের আইপিএলে অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বহিষ্কার করে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এ ঘটনা জানান দিল যে, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের বৈরী ভাবনায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের শত্রুভাবাপন্ন নীতির বহিঃপ্রকাশ বলেই বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, আসলে ভারত মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে কোনোভাবেই সুপ্রতিবেশী হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। ভারত কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে এমন আচরণ করছে, যা কোনো শত্রু দেশের সঙ্গেও অন্য কোনো দেশ করে না। ক্রিকেট খেলার মত একটি বিষয়েও তারা বাংলাদেশের সাথে বৈরী আচরণ করছে। মোস্তাফিজের বহিষ্কারের খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন শহরে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। এমন উগ্র ও অস্বাভাবিক জাতি পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে কী?

উল্লেখ্য, মোস্তাফিজের বহিষ্কারের দাবিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কংগ্রেস নেতারাও যোগ দিয়েছেন। হুমকি দেওয়া হয় মোস্তাফিজকে দলে নেওয়া কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কে কে আর) মালিক অভিনেতা শাহরুখ খানকেও। আইসিসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান জয়শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহের ছেলে। জয় শাহের ইশারাতেই পরিচালিত হয় বিসিসিআই। আর আইসিসি’র দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিসিসিআই-এর প্রধান ছিলেন জয় শাহ। বিসিসিআই-এর সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া ভারতের গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে বিসিসিআই কে কে আরকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের মিথ্যা খবরকে সামনে এনে আইপিএলে মোস্তাফিজের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যান্য রাজনৈতিক দল। ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত দেবকীনন্দন ঠাকুরও মোস্তাফিজ বিরোধী প্রোপাগাণ্ডায় যুক্ত হয়ে যান। আর বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় কে কে আর-এর মালিক অভিনেতা শাহরুখ খানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ যেন এক ‘অবাক-উন্মাদনা’! ভিন্ন ধর্মের একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে এমন বিচার-বিবেচনাহীন উগ্র আচরণকে কি নামে অভিহিত করা যায়?

মোস্তাফিজের বহিষ্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বৈরী মনোভাব নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। দাবি উঠেছে আইপিএল বয়কট করার। ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার কথাও উঠেছে। সব মিলিয়ে ভারতের উগ্র ও অন্যায় আচরণের জবাব দিতে চায় বাংলাদেশের জনগণ। জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা বলছেন, ভারতের সমাজ ব্যবস্থা ভেতর থেকেই এমনভাবে বদলে গেছে, যার প্রকাশ ঘটছে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের পদক্ষেপে। জয়শঙ্কর বাংলাদেশে এসে তো সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেন, কিন্তু দু’দিন পার হতে না হতেই হিন্দু নির্যাতনের ভুয়া অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ বিদ্বেষী পদক্ষেপ নিল দিল্লি। আসলে ‘ধর্মীয় উগ্রতার কার্ডেই; রয়েছে বিজেপি’র রাজনীতির প্রাণভোমরা। বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না