ইরানের আগুনেই কি পুড়ে ছাই হবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার? ট্রাম্পের অস্থির ও আগ্রাসী বোলচাল তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে বেশ আগেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। তবে এবার ইরান আক্রমণের পর প্রশ্নটি আরো তীর্যক হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমে এর প্রতিফলন ঘটছে। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পের জন্য ইরান যুদ্ধ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে ১৬তম দিনে গড়িয়েছে এই যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জ¦লছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এর জেরে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। এতে অস্থির হয়ে উঠেছে গোটা বিশ্বের জ¦ালানি খাত। ইরান যুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়ায় এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্লেষকদের মতে যুদ্ধের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে অনিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালি সংকট এবং জ¦ালানির দাম বৃদ্ধির আশংকা ট্রাম্পের ঘরোয়া রাজনীতিতে চাপ বৃদ্ধি করছে। ফলে বলা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির হেবরন শহরে বক্তব্য প্রদান করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমেধ্য জয়ী হয়ে গেছে। এমন কি তার ভাষায় ‘যুদ্ধের প্রথম ঘন্টাতেই জয়ী হয়ে গেছে তার দেশ।’ ট্রাম্প তার সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘এপিক ফিউরি’ এবং এই নাম দেওয়ার জন্য নিজেই নিজের প্রশংসা করেন। দারিদ্র্য আর কাকে বলে! সাধারণত যুদ্ধ চলাকালে দেশপ্রেমের আবেগে জনগণকে সরকারের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়। তেমনটাই আশা করেছিলেন ট্রাম্প। বিশেষ করে ট্রাম্প যে জায়গায় বক্তৃতা করছিলেন, সেটি ছিল রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি। সেখানে উপস্থিত মাগা (মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) সমর্থকদের কাছ থেকে জোরালো সমর্থন বা উচ্ছ্বাস আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি। সমাবেশে উপস্থিত জনতা ছিল তুলনামূলকভাবে নীরব। মনে হচ্ছিল তারাও যেন বুঝতে পারছিলেন যে, যুদ্ধে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই এবং বিজয় এখনো দৃষ্টিসীমানায় নেই। অথচ ইরানের সরকার এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান খুব সহজেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। পুরুত্বপূর্ণ এই সমদ্রপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি থাকার পরও এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর কিছু করতে পারছে না।
এসব বিষয়ে ট্রাম্প সরকারের বক্তব্যে স্পষ্ট কিছু নেই। এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে আঘাত করার মতো লক্ষ্যবস্তুও হারিয়ে ফেলছে। তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েছে, এমন কি মেয়েদের একটি স্কুলেও হামলা করেছে। ইরানের শীর্ষ নেতাদের একটি অংশও নিহত হয়েছেন। তবুও ইরানের সরকার এখন ক্ষতায় রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্পকে কি কেউ সতর্ক করেছিলেন যে, এই যুদ্ধে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে? হয়তো কেউ সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি এমন উপদেষ্টা চান না যারা তাকে চ্যালেঞ্জ করবেন। বরং তিনি এমন লোকদের পছন্দ করেন যারা তার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করবেন। ফলে যা হবার তা-ই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে গাড়িতে জ¦ালানি ভরতে গিয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ বিজয়ের দাবি এখন অনেকের কাছে ফাঁপা মনে হচ্ছে। এদিকে ট্রাম্পকে রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। ২০২৮ সালের নির্বাচনে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হবেন? ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, নাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও? বর্তমান সময়ে ট্রাম্প রুবিও’র প্রশংসা বেশি করছেন। অন্যদিকে ভ্যান্স ইরান যুদ্ধ নিয়ে তুলনামূলকভাবে সংশয় প্রকাশ করছেন বেশি। দীর্ঘমেয়াদে তার এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া ডেমোক্র্যাটদেরও বোঝাপড়ার বিষয় রয়েছে। কারণ তারাও আছেন রাজনীতির মাঠে সবমিলিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনটা ট্রাম্পের জন্য সুখকর না-ও হতে পারে। দাম্ভিক, একরোখা ও নৈতিকতা বিরোধী আচরণ রাষ্ট্রনেতাদের সাথে যায় না। এগুলো ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।