শান্তি, সমৃদ্ধি ও নৈতিক জীবনযাপনের জন্য মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছিল। মানুষের সে সমাজের চিত্রটা এখন কেমন? অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে মানুষের সমাজ নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। মানুষের সমাজ ক্রমে বড় হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক রূপলাভ করেছে। এরপর আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-মহাযুদ্ধও হয়েছে। এসবের কারণ কিন্তু মৌলিক। সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ন্যায়-অন্যায়, উৎপাদন-বন্টন, জুলুম-নির্যাতন, ধর্ম ও বর্ণের উগ্রতা এবং ক্ষমতার ভরকেন্দ্র নিয়ে সংকট দেখা দেয়। এ সংকট সমাধানের প্রয়োজন হয় ন্যায্যতা এবং উন্নত নৈতিক আচরণ। এসবের অভাবে যা হবার তা-ই হয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র দুর্বল হয়েছে এবং বৃহত্তর পরিসরে মানুষ দেখেছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ। পরাশক্তিবর্গ তো এখন আস্থার সংকটে ভুগছে এবং মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতাকে নিজেদের কর্তব্য বলে বিবেচনা করছে। পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে ওরা এখন বেশ পারঙ্গম। কিছুদিন আগে তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ অহংকার করেই বলেছিলেন, পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করার মত পারমাণবিক অস্ত্র তাদের ভাণ্ডারে মজুত আছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন স্ত্রীসমেত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়ার ঘটনায়। পুরো বিশ্ব নিন্দা জানিয়েছে এ ঘটনায়। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও চলছে ট্রাম্পবিরোধী নিন্দা ও ক্ষোভ। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো যুদ্ধাপরাধী ও গাজা ধ্বংসকারী রাষ্ট্র ইসরাইল। উভয়ক্ষেত্রেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মিতালী বেশ স্পষ্ট। ট্রাম্পের আগ্রাসন নিয়ে জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টেইনমায়ার কিছু কথা বলেছেন যা উল্লেখ করার মতো। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে। বুধবার দিবাগত রাতে বার্লিনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করেন। জার্মান প্রেসিডেন্ট বিশ্বের উদ্দেশে বলেছেন, বিশ্বব্যবস্থাকে ‘ডাকাতের আস্তানায়’ পরিণত করা যাবে না, যেখানে নীতিহীনরা যা খুশি তা-ই করতে চায়। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক গণতন্ত্র নজিরবিহীন আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। জার্মান প্রেসিডেন্টের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও তার কথার কিছুটা গুরুত্ব রয়েছে। অন্য রাজনীতিবিদদের তুলনায় তার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাও বেশি। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো আমেরিকার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে জার্মান প্রেসিডেন্ট একে একটি ‘ঐতিহাসিক ভাঙন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে যেমন একটি সন্ধিক্ষণ মনে করেন, ঠিক তেমনি আমেরিকার বর্তমান আচরণকেও বিশ্বব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছেন। এদিকে বৃহস্পতিবার পাবলিক ব্রডকাস্টার এআরডি’র এক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৬ শতাংশ জার্মান এখন মনে করেন, আমেরিকা এমন কোনো অংশীদার নয়, যার ওপর জার্মানি নির্ভর করতে পারে। আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নির্ভর করার কোনো যৌক্তিক কারণ তো নেই। যেখানে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করার ঘোষণা দিয়ে নিজেই বলেছেন, বিশ্বজুড়ে তার নেওয়া আগ্রাসী নীতিগুলো নিয়ন্ত্রণে তার ‘নিজস্ব নৈতিকতাই’ যথেষ্ট। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যেই এমন মন্তব্য করলেন তিনি। এখন ট্রাম্পকে কেমন করে থামাবেন তার দায়িত্ব বর্তায় মার্কিন সিনেটের ওপর। ট্রাম্পের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ বন্ধে একটি প্রস্তাব পাসের প্রক্রিয়া অবশ্য শুরু হয়েছে সিনেটে। এর ফলাফল দেখার অপেক্ষায় আছে বিশ্ব। বিশ্ব মার্কিন জনগণের সঙ্গত ভূমিকাও আশা করছে। কারণ দেশের জনগণ যে কোনো শাসকের অন্যায় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের স্পর্ধা রাখে।