বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। কলেমা, নামায, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাতকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এছাড়া তারা ফজিলতময় কিছু রাতকেও বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখে থাকেন। এ প্রসঙ্গে শবে-বরাত ও শবে-কদরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের এই উপমহাদেশে ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে শবে-বরাত পালিত হয়ে থাকে। শবে-বরাতকে ভাগ্য-রজনী কিংবা মুক্তির রজনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শবে-বরাত রাতকে অনেকেই বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে পালন করে থাকেন। তবে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগের সাথে সঠিক জ্ঞান যুক্ত না থাকলে মানুষ কিছু ভুল কাজও করে ফেলতে পারে। এ প্রসঙ্গে শবে-বরাত রাতে আলোকসজ্জা, পটকা ফুটানো, হালুয়া-রুটির উৎসব এবং দলবেঁধে মসজিদ ও কবরস্থানে ঘুরে বেড়ানোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইসলামে ইবাদত এবং সামাজিক রীতি-নীতি বা প্রচলন এক বিষয় নয়। ইসলামে কোনো বিষয়কে ইবাদত হিসেবে সাব্যস্ত করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে মহান আল্লাহ সেই কাজটি করতে বলেছেন কিনা এবং রাসূল (স:) কোন পদ্ধতিতে সে কাজটি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশনা এবং রাসূল (স:)-এর মানহাজ বা কর্মপদ্ধতির যোগফলই হলো ইবাদত। তাই কোনো বিষয়কে ইবাদত হিসেবে মেনে নিতে হলে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সহী দলিল প্রয়োজন। প্রসঙ্গত এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইবাদতের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে আমরা কতটা গুরুত্ব দেব তাও রাসূল (স:)-এর কর্মপদ্ধতি থেকেই আমাদের জেনে নিতে হবে। কোন্ ইবাদত ফরজ, কোনটি সুন্নাত, কোনটি নফল, তা অনুধাবনের ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকলে ইবাদতের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে। আমরা জানি যে, নফল ইবাদত কখনও ফরজ ইবাদতের সমতুল্য হতে পারে না। অথচ আমরা শবে বরাতের রাতে অনেককেই দেখি রাত জেগে নফল ইবাদতে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে ফজরের ফরজ সালাত আদায়ে ব্যর্থ হন। এটি ইবাদতের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না। বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। অর্থাৎ যথা বিষয়কে যথাস্থানে রাখতে ব্যর্থ হলে ইবাদতের ক্ষেত্রে আমরা সাফল্য অর্জন করতে পারবো না।

শবে-বরাত বা ভাগ্যরজনী নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য বা মতবৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। যারা শবে-বরাতকে ভাগ্যরজনী হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তারা এমন কিছু হাদিসের কথা উল্লেখ করে থাকেন যা জইফ বা দুর্বল। তবে এ প্রসঙ্গে হযরত আবু বকর (রা:) বর্ণিত একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। হাদিসটিতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রাতে (দুনিয়ার আসমানে) আসেন এবং সবাইকে মাফ করে দেন, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া যার হৃদয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষ রয়েছে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করে।’ প্রখ্যাত হাদিস বিশেষজ্ঞ আলবানি এ হাদিসটিকে সহী বলে বিবেচনা করেছেন। এ হাদিসের আলোকে উপলব্ধি করা যায়, এই রাতে কারা মাফ বা মুক্তি পেতে পারে। তাই আলেমদের অনেকে মনে করেন, শবে-বরাত রাতকে মুক্তির রজনী হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও রাতটিকে ভাগ্যরজনী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কারণ ইসলামের দলিল হিসেবে বিবেচনা করতে গেলে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হয় পবিত্র কুরআনের আয়াতকে, তারপর গুরুত্ব দিতে হয় সহীদ হাদিস বা সুন্নাহকে। আমরা জানি, সূরা কদরে ভাগ্যরজনীর ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। তাই কোনো দুর্বল বক্তব্য দ্বারা পবিত্র কুরআনের বক্তব্যকে রদ করা যায় না।

আমরা জানি, সূরা কদরে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মহিমান্বিত কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে মহান আল্লাহর সব ধরনের আদেশ নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন ফেরেসতারা। আর এ কথাও আমরা জানি যে, কদরের রাতে পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছে এবং পবিত্র রমযান মাসের শেষ ১০ রজনীতে আমাদের ওই রাতকে তালাশ করতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের আলোকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি কদরের রাত কিংবা ভাগ্যরজনী আছে। তবে তা মধ্য শাবানে রাতে নয়, আমাদের তা তালাশ করতে হবে পবিত্র রমযান মাসের শেষ ১০ রাতে। তবে এ কথার অর্থ আবার এই নয় যে, শাবান মাসের কোনো গুরুত্ব নেই। রমযান মাসের পূর্ববর্তী মাস শাবানেরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। এ মাসে নবী (স:) অন্যান্য মাসের চাইতে অধিক রোজা রাখতেন। এ মাস যেন রমযানের সিয়ামের প্রস্তুতি মাস। এছাড়া মধ্য শাবানের রজনীতে তো আল্লাহর কাছে চাওয়া যায়। ঘৃণা-বিদ্বেষমুক্ত হয়ে এবং শিরক থেকে দূরে থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আল্লাহ আমাদের মাফ করে দিতে পারেন। তাই কোনোভাবে সীমালঙ্ঘন না করে সহী দলিলের ভিত্তিতে যে রাতের যে মর্যাদা রয়েছে তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আর ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো প্রসঙ্গ আসলে প্রথমেই আমাদের জেনে নিতে হবে-রাসূল (স:) ও সাহাবীরা তা করেছেন কিনা এবং করলে তা কীভাবে করেছেন? ইবাদতের ক্ষেত্রে আবেগ, সহীহ দলিলবিহীন বক্তব্য কিংবা প্রবৃত্তির খায়েসকে কখনো গুরুত্ব দেয়া যাবে না। বিষয়টি উপলব্ধির মধ্যেই নিহিত রয়েছে আমাদের কল্যাণ।