২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, যাঁদের মধ্যে ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত কয়েকজন, বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) বিপথগামী কিছু সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান কিছু নিরীহ বেসামরিক ব্যক্তি। এ হত্যাকাণ্ডে যে নৃশংসতা দেখা গেছে, তা অকল্পনীয়Ñ দেহাবশেষ এতটাই বিকৃত ছিল যে অনেককে চেনা সম্ভব হয়নি, পরিবারগুলো অপমানিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়েছিল। এ হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। শহীদদের স্মরণ আর ১৭ বছর আগেকার এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে চলে গেল দিবসটি।
স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের সময় লোক দেখানো গোঁজামিল দেয়া একটি তদন্ত ও বিচারের প্রহসন করা হয়। যা ছিলো নেহায়েত বিষয়টিকে কোনরকমে ধামাচাপা দেয়ার প্রচেষ্টা। দেশবাসীর হৃদয় কাঁপানো এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের জনগণের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক প্রাক্তন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে। নভেম্বর ২০২৫ এ তদন্ত শেষে কমিশন কর্তৃক একটি রিপোর্ট অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাখিল করা হয়, যা মোটামুটিভাবে সর্বজন কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। কিন্তু রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি। এতদিন পেরিয়ে গেলেও, জাতীয় চেতনায় সৃষ্ট ক্ষত এখনও পূরণ হয়নি। নিহত কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো এখনও নীরব যন্ত্রণা ভোগ করছে এবং সান্ত্বনার অপেক্ষায় আছে। জাতি অপরাধীদের বিচারের অপেক্ষায় আছে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু বিচারের।
শহীদ কর্মকর্তার স্বজনরাও ১৭ বছর ধরে অপেক্ষায় আছেন বিচারের। গত বুধবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন তাদের আকুতি ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানানো হয়েছে।
আশার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার করা হবে। বুধবার বনানী সামরিক কবরস্থানে জাতীয় শহীদ সেনা দিবসের অনুষ্ঠানের পর তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেনা শহীদ দিবস পালন করলাম। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী এসেছেন, শহীদ পরিবারের স্বজনরা এসেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা জীবন দিয়েছেন, তারা চিরতরুণ, চিরভাস্বর। এ পিলখানা হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের একটি। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানার জন্য তৎকালীন সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও, তার ফলাফল আজো প্রকাশিত হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়, যার রিপোর্ট আমাদের সামনে এসেছে। তবে সে রিপোর্ট বাস্তবায়নে সে সরকার তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
তিনি বলেন, আমরা নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করবো না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যথোপযুক্ত লোক দিয়েই তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনের রিপোর্টে যে সুপারিশগুলো এসেছে, বিচারাধীন যে মামলাগুলো আছে, এ জুডিশিয়াল প্রসেসগুলো সমাপ্ত করা হবে। অন্যান্য সুপারিশগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। শহীদ পরিবারদের বলতে চাই, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার করা হবে, যাতে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর না ঘটে।
আমরা নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে চাই। আমরা মনে করি জাতীয় কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুবিচার হওয়া এখন সময়ের দাবি।