দীর্ঘ সময়ের চাপ, অনিশ্চয়তা ও ভারসাম্যহীনতার পর দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে যে ধীর কিন্তু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উঠে আসা তথ্য ও পরিসংখ্যান দেখায় যে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, চলতি হিসাব, প্রবাস আয় এবং শিল্পখাতে কার্যক্রমÑএসব ক্ষেত্রে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। তবে এ অগ্রগতি কতটা গভীর ও টেকসই হবে, তা এখনো বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির গতি কমে আসা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ক্ষয় করেছে, সঞ্চয় কমিয়েছে এবং ভোগব্যয় সংকুচিত করেছে। মূল্যস্ফীতি যখন এক ডিজিটের নিচে নেমে আসে এবং ধারাবাহিকভাবে কমার ইঙ্গিত দেয়, তখন বাজারে আস্থা ফিরতে শুরু করে। একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হার ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান সংকুচিত হওয়ায় প্রকৃত আয়ের ওপর নেতিবাচক চাপ কিছুটা হলেও কমছে। এটি অর্থনীতির চাহিদা-পক্ষকে সক্রিয় করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষিখাতের সাম্প্রতিক অগ্রগতি খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধান শস্য উৎপাদনে সন্তোষজনক ফলন বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে একদিকে খাদ্যপণ্যের মূল্যচাপে লাগাম পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, অন্যদিকে কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে কৃষিখাতে উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ, পরিবহন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, উৎপাদন উপকরণের উচ্চমূল্য এবং কৃষকের লাভজনকতা টেকসই করার প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
আর্থিক ও বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক অগ্রগতি অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকা আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা ফেরাতে সহায়ক। দীর্ঘ সময় ধরে চলতি হিসাব ঘাটতির চাপ অর্থনীতিকে যে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল, সেখানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ভারসাম্য ফিরে আসার প্রমাণ দেয়। বৈদেশিক আয়ের প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক।
আমদানি ব্যবস্থায় উৎপাদনমুখী খাতে শিথিলতা এবং শিল্পখাতে ঋণপত্র খোলার হার বৃদ্ধি অর্থনীতির চাকা আবারও ঘোরার ইঙ্গিত দেয়। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে গতি সঞ্চার হলে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও তা যেন অপ্রয়োজনীয় বা অনুৎপাদনশীল খাতে না যায়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তবে এ ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কিছু গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা, ব্যাংকিংখাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের সীমাবদ্ধতা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে ধীর করে দিতে পারে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি দেশের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনীতির সূচকে যে উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা ধরে রাখতে হলে স্বল্পমেয়াদি সাফল্যে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা জোরদার, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয়বৈষম্য কমানোর দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সার্বিকভাবে বলা যায়, অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে যে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে, তা আশাব্যঞ্জক হলেও এখনো এটি নাজুক। ধারাবাহিক, বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণের মাধ্যমেই এই অগ্রগতিকে স্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া সম্ভব। জাতীয় স্বার্থে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের বিকল্প নেই।