দীর্ঘ অশাসন-শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার পর ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। আর এ বিপ্লব কিনতে হয়েছে বেশ চড়ামূল্যে। এ জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় দু’সহস্র মানুষকে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার বনি আদম। অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন; কেউ কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। সন্তানহারা হয়েছে অনেক পিতা-মাতা। স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন অনেকেই। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে ছাত্র-জনতার এ বিপ্লবকে রুখে দিতে পারে নি বরং অনেক রক্ত পিচ্ছিল পথ ধরেই এক নতুন সূর্যদয় হয়েছে। শীর্ষনেতাসহ শাসকগোষ্ঠী দেশ ছেড়ে চালিয়েছেন। যারা পালাতে পারেন নি তা দেশেই আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ কেউ পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাবরণ করেছেন। ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধ থেকে তারা মোটেই রেহাই পাননি। কিন্তু দুঃজনক বিষয় হলো এ নিয়ে তাদেরকে কখনো অনুশোচনা করতে দেখা যায়নি।

এক অনিবার্য বাস্তবতায় আওয়ামী সরকারের লজ্জাজনক পতনের পর দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দেশে যাতে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের নতুন করে উত্থান ঘটতে না পারে সেজন্য সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করে। সকল রাজনৈতিক দল সহ বিভিন্ন মহলের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়। আর সে সংস্কার প্রস্তাবনার অনুকূলে প্রণীত হয় জুলাই সনদ। সরকারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনুস সহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এ সনদে সাক্ষর করে। যা ছিলো দেশ ও জাতির জন্য একটি মাইল ফলক এবং আমাদের বড় অর্জন।

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর গত ১২ ফেব্রয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন এবং একই সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জনমত গ্রহণ করতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং উৎসব মুখর পরিবেশে ভোট প্রদান করে। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ি বিএনপি জোট জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও সংসদে সম্মানজনক আসন লাভ করে। দলটি এখন প্রধান বিরোধী দল হওয়া এখন নিশ্চিত। গণভোটে ব্যাপক ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ে করে জনগণ অনগণতান্ত্রিক শক্তি, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করে। তারা দেশকে অপশাসন-দুঃশাসনমুক্ত দেখতে চায়। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একেবারে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। মূলত, জনগণ অতীতের অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে নব উদ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে গণরায় প্রদান করেছে।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফলে ভিত্তিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকালই নতুন সরকার শপথ গ্রহণের সম্ভবনা রয়েছে। ফলে দীর্ঘ অপশাসন-দুঃশাসনের পর নতুন সম্ভবনা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকারকে এগোতে হবে অতি সন্তর্পনে। এ ক্ষেত্রে নতুন সরকারকে স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামো নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবম্ক্তু করা সময়ের দাবি। একই সাথে জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে অমিমাংসিত সমস্যাগুলো ইনসাফপূর্ণ সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যারও যৌক্তিক সমাধান করা দরকার। একই সাথে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিক নায্য অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। অন্যথায় আমাদের অর্জনই স্থায়িত্ব লাভ করতে না।

আমাদের দেশে রাজনীতি সব সময় সংঘাতপূর্ণ। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, এক্ষেত্রে বিরোধী দলের চেয়ে সরকারি দলের দায়িত্বই বেশি। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে সকল জাতীয় সমস্যার ন্যায়ানুগ ও ইনসাফপূর্ণ সমাধান করতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। কারণ, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের কাছে কোনভাবেই আত্মসমর্পণ করা যাবে না। এটাই নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা।