ইরানে হামলার ঘটনায় প্রমাণ হলো, ইরাক যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো শিক্ষাই নেয়নি। দুর্জয়ের ছলের অভাব হয় না। ইরাক যুদ্ধের সময় আমরা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের প্রোপাগাণ্ডা দেখেছি, ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের’ মিথ্যাচার দেখেছি। সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেলে মুখ রক্ষার জন্য বললো-স্যরি, ভুল বুঝাবুঝি থেকে এসব হয়ে গেছে। আসলে ওদের স্যরিটাও একটা মিথ্যাচার। প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরাককে ওরা প্রস্তর যুগে নিয়ে গেল। লাখো মানুষ হত্যা করলো, মা-বোনের সম্ভ্রম লুন্ঠন করলো। ফলে ‘স্যরি’ শব্দটা ওদের মুখে মানায় না, ওরা সেটার যোগ্যও নয়। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির পরিবেশে বসবাস করলেও ওরা আসলে জংলী। লক্ষ্য করলেই ওদের মুখের ‘কাউবয়-কাউবয়’ ভাবটা উপলব্ধি করা যায়। মননে ওরা এখনো জংলী এবং দস্যু। এ কারণেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সামর্থ্য ওদের সাম্রাজ্যবাদীর চাইতে বড় কিছু হতে দেয়নি। ২০২৬-এ এসে বলা যায়, অন্তর্গত দারিদ্র্যের কারণে পাশ্চাত্য আলো ঝলমলে এক জাহেলিয়াতের চাইতে বেশি কিছু উপহার দিতে পারেনি মানবজাতিকে।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ইতিহাসে কিছু ভালো কাজ, কিছু ভালো মানুষের পরিচয় তো জানা যায়। তারা রাষ্ট্র গঠন করেছেন, গণতন্ত্রের চর্চা করেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, যদিও বর্ণবাদ এখনো তাদের জন্য এক বড় সমস্যা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিককালের শাসকরা নিজেদের মুখে কালি লেপনের কাজটা অব্যাহত রেখেছেন-জর্জ বুশের পর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এর বড় উদাহরণ। ইসরাইল সম্পর্কে কথা কম বলাই ভালো। ওদের সবটাই মন্দ, নৃশংস ও নিন্দনীয়। ওরা মানব সভ্যতায় বসবাসের উপযুক্ত নয়। অথচ ট্রাম্প ওদের নিয়ে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। ইরানও কোন সরল ও অনুপম আদর্শের রাষ্ট্র নয়। ওদের ধর্মীয় উগ্র ও অশালীন ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা মুসলিম উম্মাহকে স্বস্তি দেয় না। সব মিলিয়ে এক দুর্যোগ ও দুর্ভাবনার মধ্যে এখন আমাদের বসবাস।

রয়টার্স ও আল জাজিরা পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানের দফায় দফায় তীব্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পাল্টা জবাবে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরানও। এরই মধ্যে খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলে হামলা চালিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। জবাবে লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরাইল ।ইতিমধ্যে ইরান ও ইসরাইল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে আশেপাশের দেশগুলোতেও। ফলে বলা চলে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার জবাবে প্রতিবেশী যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলাতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। তেহরানের এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে জ¦ালানি স্থাপনাও। গত সোমবার এ ধরনের কয়েকটি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গ্যাস ও তেল শোধনাগার বন্ধ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরাইলের মতো উন্নত না হওয়ায় ইরান তাদের সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলের প্রধান তেল শোধনাগারগুলোতে ইরানের হামলা, যুদ্ধের কারণে সংকটে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে সমস্যার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই হামলা মূলত এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিকে আঘাত করেছে। বিষয়টি ইরানকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। এ জন্যই হয়তো বলা হয়, ইরান কোনো সরল রাষ্ট্র নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে একদিকে জ¦ালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুশ্চিন্তায় পড়েছে বাংলাদেশও। মূল্যবৃদ্ধি স্থায়ী হলে, সরবরাহ সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশে ঘাটতি তৈরি হতে পারে, দামও বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রও ড্রোন হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশী নাগরিক নিহত এবং আরো সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসবের কোনটাই আমাদের জন্য ভালো নয়।

আমরা জানি, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে নৃংশস পদ্ধতিতে হত্যা করেছে, তা আন্তর্জাতিক সব আইন ও রীতির লংঘন। এর বিরুদ্ধে ইরান পাল্টা ও যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু এখন দৃশ্যত ইরানের যে পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা মূলত উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে। পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর রাজধানী ও শহরগুলোতে যখন ইরানের মিসাইলগুলো আঘাত হানছে, তখন কিন্তু নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, যা খুবই গুরুতর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সংকটের বাতাবরণেও এ দেশগুলো শান্তি ও স্থিতিশীলতার যে ভাবমর্যাদা সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তুলেছিল, তা যেন এখন ধসে পড়ছে। ফলে প্রশ্ন জেগেছে, পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন কি করবে? তারা কি ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানে পাল্টা হামলা চালাবে, নাকি নিজেদের ভূখণ্ড জ¦লতে দেখেও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকবে? আশার কথা হলো, এসব দেশ থেকে এখনো পাল্টা হামলার আওয়াজ ওঠেনি। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবির আল সানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর উচিত হবে না ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, যদিও তেহরান জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লংঘন করেছে।’ এমন বাস্তবতায় আমরা ইরানের কাছ থেকেও যৌক্তিক ভূমিকা আশা করবো।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত’ এ ‘ন্যায়সঙ্গত অভিযান’ চলবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, চলমান অভিযানে আরও মার্কিন সেনার প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এ অভিযান প্রয়োজনে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে বলে জানান ট্রাম্প। অভিযান সম্পর্কে নানা কথা বলছেন ট্রাম্প। তবে মার্কিন সেনা হতাহতের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এখন সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি এখন শুধু প্রচণ্ড চাপেই পড়েননি, ইরান নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার দাবিও উঠেছে। বিরোধীপক্ষ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অথচ এ ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প বারবার। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে এখন অভিযুক্ত ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও ট্রাম্পের ইরান হামলাকে সমর্থন করছেন না। গত রোববার শেষ হওয়া রয়টার্স/ইপসোসের এক জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে যে, ইরানে হামলা চারিয়ে আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে সমর্থন করেন না প্রতি চার মার্কিন নাগরিকের তিনজনই। আসলে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনা থেকে খামেনি হত্যা ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমর্যাদাই শুধু নষ্টকরে নি, অন্ধকারের পথিক হিসেবেও চিহ্নিত করেছে দেশটিকে। দেশের এমন নেতাকে নাগরিকরা সমর্থন করতে চাইবে কেন? এবার ইরানের বিরুদ্ধে যে মাত্রায় যৌথ হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল, তা মোকাবিলা করা আসলেই কঠিন। তবে পৃথিবীতে একটি শক্তি আছে, যারা সহজেই ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে মোকাবেলা করতে পারে, সেই শক্তির নাম ‘গণশক্তি’। ‘মার্কিন গণশক্তি’ যদি যুদ্ধবাজ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজপথে ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, তাহলে হয়তো ওদের কাণ্ডজ্ঞান ফিরে আসতে পারে। আসলে কাণ্ডজ্ঞান ছাড়া শাসক হওয়া যায় না। কাণ্ডজ্ঞান ছাড়া দেশ ও পৃথিবীর কল্যাণ করা যায় না। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, ট্রাম্প তার কাণ্ডজ্ঞান অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। না হলে কোনো ক্ষুদ্র মানুষ কি মহাপ্রভু হতে চায় এবং পৃথিবীকে মহাপ্রভুর মতো চালাবার কসরৎ করতে পারে? অচিরেই হয়তো তার সবটাই পণ্ডশ্রম হিসেবে প্রতিভাত হবে।