মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন এক অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮.৭৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন। গত সপ্তাহে তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পর নতুন করে এ দাম বাড়ার ঘটনা বিশ্ববাজারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন পরিবাহিত হয়। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে ওই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। হামলা-পাল্টা হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এ পথ ব্যবহার করতে দ্বিধাগ্রস্ত। ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ জ্বালানি একটি আমদানিনির্ভর দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাত ব্যাপকভাবে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির এ অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেলের যথাযথ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ‘মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল’ গঠন করেছেÑএটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেলের পাশাপাশি ঢাকা, বগুড়া, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ সেলগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন ডিপোগুলোতে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয় পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাঠানো হবে। পাশাপাশি প্রস্তুতকৃত মজুদ প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কাছে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হবে। বিশেষ করে চলমান কৃষি সেচ মৌসুমে ডিজেলের সরবরাহ ও বিক্রয় পরিস্থিতি জেলা প্রশাসকদের নিয়মিতভাবে জানানো হবেÑযা কৃষি উৎপাদন নির্বিঘ্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া জ্বালানি তেলের বিতরণ, মজুদ, পাচার বা ভেজাল সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য দ্রুত জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখাও একটি ইতিবাচক দিক। কারণ সংকটের সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি বা অনিয়মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলে এসব অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তবে কেবল কন্ট্রোল সেল গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এ উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, দ্রুত তথ্যপ্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। ডিপো, পরিবহন ব্যবস্থা এবং খুচরা বিক্রয় পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের পুরো শৃঙ্খলকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে সরকারকে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথাও মাথায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে অস্থির থাকলে তার প্রভাব আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারমূল্যের ওপর পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন হলে বিকল্প সরবরাহ উৎস অনুসন্ধান, পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপও বিবেচনায় নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের মধ্যে আস্থা বজায় রাখা। জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে গুজব বা আতঙ্ক তৈরি হলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। তাই বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রদান এবং নিয়মিত আপডেট দেওয়ার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করা প্রয়োজন। বিশ্ব পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত। এমন বাস্তবতায় আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও জীবনযাত্রার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যও অপরিহার্য। তাই সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ঘোষিত পদক্ষেপগুলো যেন বাস্তবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়-সেই প্রত্যাশাই এখন সবার।