জামায়াতে ইসলামির আমির ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটির উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৮ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎকালে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। দলটির নায়েবে আমীর ডা: আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের অভিযোগ উত্থাপন করে বলেন, দেশের প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় ও হতাশা সৃষ্টি হবে। একইভাবে নির্বাচনী মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হলে নির্বাচন কমিশন তার ‘দায়’ এড়াতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, সারাদেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষাপাতমূলক আচরণ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা ডিসি,এসপিদের মধ্যে যারা একই সঙ্গে রিটানিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করবেন তাদের মাঝে আচরণে বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এ ধরনের কর্মকর্তাদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তারা প্রণয়ন করেছেন। তবে বিষয়টি এখনো লিখিত অভিযোগ আকারে কর্তৃপক্ষের নিকট জাম দেয়া হয়নি। তারা আরো গভীরভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।

জামায়াত ইসলামির প্রতিনিধি দল যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত গুরুতর। নির্বাচন কোন ধরনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলো তা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে যারা মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা করবেন তাদের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ কেমন তার উপর। নির্বাচন পরিচালনাকারি কর্মকর্তা যেমন, রিটানিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারগণ নির্বাচনের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। এরা চাইলে যে কোন সময় নির্বাচনেক প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলতে পারেন। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি দল বিশেষের লিপ্সা বেশি থাকে সেখানে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সত্যিই খুব কঠিন। অন্তর্বর্তী সরকার অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই তা সর্বাঙ্গ সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। ২০০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ফলে যে সরকার নির্বাচন হয় তারা পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারেনি।

এমন ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে, যেখানে একজন মানুষ চাইলেই নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবে। আর ভোটারগণ তাদের ইচ্ছে মতো পছন্দনীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে। নির্বাচনে সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকে যদি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত করতে হয় তাহলে অন্তত ৫টি প্রতিবন্ধকতা থেকে নির্বাচনকে মুক্ত রাখতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় টাকার খেলার কথা। আমাদের দেশে নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে হলে বিপুল পরিমাণ টাকা থাকতে হয়। ভোটারদের সন্তুষ্ট করার জন্য টাকা ব্যয় করতে হয়। এমতাবস্থায় যারা দরিদ্র বা স্বল্প সম্পদের মালিক তাদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ এবং জয়লাভ করা সম্ভব হয়না।

সুষ্ঠু নির্বাচনে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শত্রু হচ্ছে পেশি শক্তির ব্যবহার। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পেশি শক্তি প্রদর্শন করার মাধ্যমে ভোটারদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করে থাকে। চতুর্থ নাম্বার শত্রু হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা এবং আঞ্চলিকতার প্রচার-প্রচারণা। পঞ্চম হচ্ছে প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং কারসাজি বন্ধ করা। আমাদের দেশ দীর্ঘ দিন ধরে এসব সমস্যার কারণে নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা না যাবে এবং বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন করা না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য করতে পারবো না। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারিদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা সম্ভাব্য বিজয়ী দলের পক্ষে কাজ করেন। এটা সম্পূর্ণ নৈতিকতা বিরোধি এবং কোনভাবেই গ্রহণীয় হতে পারে না। অন্তর্বর্তীকালিন সরকার যদি গণপ্রত্যাশা অনুযায়ী সুষ্ঠু এবং জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারেন তাহলে তাদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর যদি তা করতে ব্যর্থ হন এবং কোন কারণে নির্বাচন বিতর্কিত হয় তার ‘দায়ভার’ সম্পূর্ণরূপেই তাদের উপর বর্তাবে।