যার কাজ তাকে সাজে। বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ভাষার ওপর খবরদারি না করলেও পারতেন। কে তাকে বলেছে, ‘ইনকিলাব’, ‘জিন্দাবাদ’ শব্দের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে? এর অর্থ আবার এটা নয় যে, তিনি ভাষা নিয়ে কথা বলতে পারবেন না। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান। মন্ত্রী হলেই সব বিষয়ে কথা বলা যায় না। কথা বলতে গেলে যথা বিষয়ে যথাজ্ঞান প্রয়োজন। মন্ত্রী কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সেখানে কিছু লোক তো থাকবেই। মন্ত্রীর একটা প্রোটোকল আছে না! তবে মন্ত্রী হলেও যা ইচ্ছে তা বলা যায় না, কথা বলতে হয় সাবধানে, মানুষকে সম্মান করে। শনিবার সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসন আয়োজিত শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কেমন বয়ান পেশ করলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী? তিনি বললেন, বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলাকে যদি আমার মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ইনকিলাব ডোন্ট মাই ল্যাঙ্গুয়েজ। ইনকিলাব মঞ্চ হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক নেই।
প্রশ্ন হলো, বাংলাকে ধারণ করতে গেলে ‘ইনকিলাব’ কিংবা ‘জিন্দাবাদ’ শব্দ বর্জন করতে হবে কেন? বিদ্যুৎমন্ত্রী কি জানেন না যে, ইনকিলাব ও জিন্দাবাদ শব্দের মতো হাজারো আরবি-ফারসি শব্দ ইতিমধ্যেই বাংলাভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে এবং তা আমাদের প্রিয় মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাষা আসলে বহতা নদীর মতো। চলার পথে বাঁকে বাঁকে সে শব্দকে গ্রহণ করে, সমৃদ্ধ হয়। মানুষ তো নিজেকে প্রকাশ করার জন্য ভাষার আশ্রয় নেয়। শুধু আরবি-ফার্সি নয়; ইংরেজি, চিনা, পর্তুগিজ, সংস্কৃতসহ অনেক ভাষার বহু শব্দ মিশে গেছে বাংলা ভাষার সাথে। এসব শব্দ কি আমাদের বর্জন করতে হবে। বিদ্যুৎমন্ত্রীর নামের সাথেও যুক্ত আছে আরবি শব্দ। বাংলাকে ধারণ করতে গেলে কি আমাদের নাম থেকে আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিতে হবে? আর আরবি-ফারসি শব্দ বর্জনের প্রসঙ্গ আসলে প্রথমেই বাদ দিতে হবে আমাদের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামকে। বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি ভাষার ব্যাপক প্রচলন তো তিনিই শুরু করেছেন। গানে-কবিতায় আরবি-ফারসির সফল ব্যবহার দেখে পাঠক মুগ্ধ হয়েছেন এবং গ্রহণ করেছেন। আমাদের জাতীয় কবি নজরুল এভাবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। এখন আমাদের বিদ্যুৎমন্ত্রী কি জাতীয় কবিকেও বর্জনের আহ্বান জানাবেন? আমাদের বিদ্যুৎমন্ত্রী হয়তো জানেন না যে, ঔপনিবেশিক শাসক ইংরেজদের হটাতে এই উপমহাদেশের বিপ্লবীরা প্রথমে ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এবং তাদের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধ।
এবার বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করতে হয়, ‘ইনকিলাব’ ও ‘জিন্দাবাদ’ নিয়ে আপনার যে বয়ান-তাকে আপনার ঘোষিত রাজনীতির সাথে যায়? আপনার দল কি ‘বিএনপি জিন্দাবাদ’ বলে না? আপনার নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারত করতে যাননি, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেননি? অথচ আপনার অবস্থান নেতার বিপরীতে। ওসমান হাদীর কবরের পাশেই বহু আগে থেকেই শুয়ে আছেন আরবি-ফারসি শব্দের সফল প্রবক্তা কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্যুৎমন্ত্রী তো ‘ইনকিলাব’, ‘জিন্দাবাদ’, ‘ইনকিলাব মঞ্চ’- এসব শব্দের বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন, অথচ তার দল এবং বাংলাদেশের জনগণ তা করেন, বরং ওই শব্দগুলোকে মানুষ আপন করে নিয়েছেন। ফলে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে তার বয়ান শুদ্ধ করে নেওয়ার আহ্বান জানাবো। কারণ, গণআকাক্সক্ষার বিপরীতে গিয়ে কেউ রাজনীতিতে সফল হতে পারেন না।