মূলত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে একটি বিশেষ মহলকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার জন্যই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (Lequefied Petroleum Gas) এলপিজি খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো। তাই ‘এলপিজি’ নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা সর্বসাম্প্রতিক নয় বরং পতিত আওয়ামী সরকারের আমলের একটি দুষ্ট ক্ষত। মূলত, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রেখে লাখো পরিবারকে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছিলো সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বানানোর জন্য। এরই অংশ হিসাবে এলপিজি বাজারকে কার্যত ছেড়ে দেয়া হয় সেসব সরকার ঘরানার প্রভাবশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে তারা অতিমাত্রায় স্বেচ্ছাচারি হওয়ার সুযোগ পান।

মূলত সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই সম্প্রতি দেশে এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মূল্য নির্ধারণ বা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম-নীতিই মানা হচ্ছে না বরং এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা চরম স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিচ্ছেন। এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করা হলেও বাস্তবতার সাথে তা মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মূলত, সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এলপিজির বাজারে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, আমাদের দেশের এলপিজি আমদানি ও বিতরণ শত ভাগের কাছাকাছি বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরাসরি এলপিজি আমদানি করে না। অথচ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) উৎপাদিত এলপিজি দিয়ে দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ পূরণ করা হয়, যা কার্যত বাজারে কোনো প্রভাবই সৃষ্টি করার জন্য মোটেই কার্যকরী নয়। ফলে এককথায় প্রতীয়মান হয় যে, বাজারে যদি কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয় বা একযোগে দাম বাড়ে, তা হলে সরকারের কিছু করণীয় থাকে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিছক অব্যবস্থাপনা নয়, এটি একটি নীতিগত দুর্বলতা, যা বছরের পর বছর ধরে সংশোধন করা হয়নি বরং স্বৈরাচারি আমলের ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। যা জ¦ালানির মত একটি অতিগুরুত্বপূর্র্ণ খাতকে নৈরাজ্যের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, তাদের নিজস্ব এলপিজি আমদানির মত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশে যে বেসরকারি অপারেটররা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকা থেকে লাইটারিং জাহাজের মাধ্যমে নিয়মিত এলপিজি খালাস করছে, বিপিসি কি তাদের অবকাঠামো ব্যবহার করতে সক্ষম নয়? খাতদের সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিপিসি চাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেসরকারি অপারেটরদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে এলপিজি আমদানি শুরু করতে পারে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সে মূল্য অনুসরণ করা হয় না। অভিযোগ রয়েছে, ঘোষিত দাম কাগজে থাকলেও বাজারে এর কোন প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় না। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার অতীতে জ্বালানি তেলের সঙ্কট মোকাবেলায় একাধিকবার জি-টু-জি আমদানির পথ বেছে নিয়েছে। বিপিসির তালিকাভুক্ত জি-টু-জি সরবরাহকারীরা বড় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান, যারা এলপিজিসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে সক্ষম। তা হলে প্রশ্ন উঠছে, ডিজেল বা অকটেনের ক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যৌক্তিক হয়, এলপিজির ক্ষেত্রে তা কেন ‘বাজারবিরোধী’ হিসেবে বিবেচিত হবে? মূলত, এক্ষেত্রে এমন কিছু গোষ্ঠী ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের স্বার্থ জড়িত এবং তারা এতোই প্রভাবশালী যে, তাদের স্বার্থের প্রতিকূলে সরকার বা সরকার সংশ্লিষ্টরা কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না।

একথা ঠিক যে, এলপিজি বাজারে কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ নতুন নয়। সরবরাহ কম অজুহাতে মূল্যবৃদ্ধি, মজুদদারী করে বাজারে চাপ সৃষ্টি, এ ধরনের একেবারে সর্বসাম্প্রতিক নয় বরং খুবই পুরনো। এদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। যা আছে তা কথামালার ফুলঝুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা বেশ বেপরোয়া। ভোক্তারা দাবি করছেন, দাম বাড়ার পর ‘দুঃখ প্রকাশ’ কোন সমাধান নয় বরং দায়িদের বিরুদ্ধের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মূলত, এলপিজি বাজারে বিপিসির সম্ভাব্য প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক যতটা নীতিগত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। কারণ, এতে বর্তমান বাজার কাঠামোতে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ তৈরি হবে। আনলে সেটাই কি সবচেয়ে প্রতিবন্ধকতা? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিপিসির সীমিত পরিসরে এলপিজি আমদানি মানে বাজার দখল নয়, বরং সঙ্কটকালে একটি বার্তা দেয়া যে, সরকার প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করবে। এ বার্তাটিই হয়তো কেউ কেউ চান না।

এলপিজি বাজারে চলমান অরাজকতা কেবল একটি পণ্যের সঙ্কট নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট। একথা ঠিক যে, বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেয়া মানে মুক্তবাজার ধ্বংস করা নয়, বরং ভোক্তা সুরক্ষার একটি ন্যূনতম নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। তাই দেশ জাতির বৃহত্তর স্বার্থে স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী বৃত্ত থেকে এসে এলপিজি সমস্যার একটি যৌক্তিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। দাম নিয়ে কোন ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের জ¦ালানি খাতকে সুবিধাভোগীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কোন ভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।