‘নাইন-ইলেভেন’ নিয়ে এখন কথা কম হয়। তবে এ দিনটি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে নানা কারণে। প্রথমত ওইদিনের ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য। দ্বিতীয়ত বিমান হামলা নিয়ে যে বয়ান প্রচার করা হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। তৃতীয়ত এরপর লক্ষ্য করা গেছে মুসলিম বিরোধী প্রোপাগাণ্ডা ও প্রতিশোধমূলক হামলার উগ্র তৎপরতা। সব মিলিয়ে নাইন-ইলেভেন ঘটনার ধোঁয়াশা এবং পরবর্তী আগ্রাসী আচরণ বর্তমান সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে মারাত্মকভাবে। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে বড় প্রভাব ফেলেছিল ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলা। ছড়িয়ে পড়েছিল এক ধরনের ইসলাম ফোবিয়া। সে ইসলামভীতির আবহে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন নিউইয়র্কের মুসলিমরা। তাদের এ সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিফলন নিউইয়র্ক শহরের ডেমোক্রেট মেয়রপ্রার্থী জোহরান মামদানি। নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর আরবও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন প্রতিশোধমূলক হামলার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল নগরজুড়ে-এমনকি পুরো যুক্তরাষ্ট্রেও। আজকের নির্মম ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসের অভিযানের পূর্বাভাস যেন সে সময়েই পাওয়া গিয়েছিল। অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগে শতশত মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তাদের অনেকেই অমানবিক অবস্থায় আটক ছিলেন। মুসলিমদের নাগরিক অধিকারকেও পদদলিত করা হয়েছিল।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ বছর পর নিউইয়র্কের চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সব চেয়ে বড় এই নগরী প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত করার জন্য প্রস্তুত। ৪ নবেম্বর ঐতিহাসিক সে ঘটনা ঘটতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন জিতে মেয়র প্রার্থী হয়েছেন। প্রশ্ন হলো, গভীর এ পরিবর্তনের পেছনে কোন বিষয় কাজ করেছে? জোহরানের এ অপ্রতিরোধ্য উত্থানের পেছনে কাজ করেছে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অসাধারণ বাগ্মিতা। মার্কিন রাজনীতিবিদ আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজসহ অনেকে বলেছেন, ‘এক প্রজন্মে একবার পাওয়া যায় এমন নেতা।’ উল্লেখ্য, মামদানির সাফল্যের গল্প কেবল ব্যক্তিগত নয়-এটি বড় এক ইতিহাসের অংশ, যেখানে ৯/১১-এর পর কঠিন পরিস্থিতিতে পড়া তরুণ মুসলিম নিউইয়র্কবাসী সংগঠিত হয়ে নতুনভাবে নিজেদের গড়ে তুলেছেন। ইসলাম ভীতির উত্থানের বিপরীতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় এই তরুণ মুসলিমদের রাজনৈতিক জাগরণ। বছরের পর বছর ধরে তারা শহরে রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলেছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। তারা এমন এক নতুন ধারা গড়ে তলেছেন, যা নতুন পরিচয়কে গ্রহণ করে এবং সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। এ আন্দোলন নীরবে এবং ধারাবাহিকভাবে বেড়ে উঠেছে বহু বছর ধরে। জোহরান মামদানি আজ সে আন্দোলনের সবচেয়ে সফল ও পরিপূর্ণ প্রতিফলন। নিউইয়র্কের মুসলিমরা যেমন সংগঠিত হচ্ছেন, তেমনি তাদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে এখন কোনো প্রার্থীই মুসলিম ভোটারদের উপেক্ষা করে জেতার আশা করতে পারেন না।
উপলব্ধির বিষয় হলো, নাইন-ইলেভেনকে কেন্দ্র করে যেভাবে ইসলাম ফোবিয়া ছড়ানো হয়েছে, মুসলমানদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে-তা তাদের পরাভূত করতে পারেনি। বরং এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুসলিম তরুণরা নীরবে সংগঠিত হয়েছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, কৌশলে এগিয়ে গেছেন। যার ফসল জোহরান মামদানি। মুসলিম তরুণরা সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী প্রচারণার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। মন্দ রাজনীতির জবাব দিচ্ছেন উত্তম রাজনীতি দিয়ে। ফলে মজলুম মুসলিম নাগরিকরা আজ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছেন নিউইয়র্কে। জোহরান মামদানি ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন জিতে তার স্বাক্ষর রেখেছেন। ৪ নবেম্বরের মেয়র নির্বাচনে তিনি হয়তো জিতেই যাবেন। ভিন্নকিছু হলেও ক্ষতি নেই। কারণ নাইন-ইলেভেনের প্রোপাগাণ্ডার শিকার মজলুম মুসলিম নাগরিকরা এখন রাজনীতির ময়দানে একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের অবজ্ঞা করে নিউইয়র্কে রাজনীতি করা এখন একটি অবাস্তব বিষয়।