কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাজশাহী অঞ্চল বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ধান, গম, ডাল, সবজি ও ফল উৎপাদনে এ অঞ্চলের অবদান কেবল স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যায়েও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে-এ কৃষিভিত্তিক অঞ্চলটি আজ এক নীরব অথচ গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বসতবাড়ি নির্মাণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশেষ করে ফসলি জমিতে নির্বিচারে পুকুর খননের ফলে রাজশাহীতে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হতে পারে। এ বিষয়ে দৈনিক সংগ্রামে একটি সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি।
জেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য এ উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। মাত্র ছয় বছরেÑ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে-রাজশাহীতে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ৫ হাজার ২৮৯ একর। ২০২০ সালে যেখানে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭০৫ একর, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৬ একরে। এ পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক অবক্ষয়ের চিত্র, যেখানে প্রতিবছরই কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। কৃষিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাজশাহীর কৃষি উৎপাদন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় খাদ্য ব্যবস্থাকে চাপে ফেলবে।
এ সংকটের পেছনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক কারণগুলোর একটি হলো তিন ও চার ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত পুকুর খনন। মাছচাষ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও, তা যদি উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস করে করা হয়, তবে তা সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহীর বিল ও নিচু এলাকায় যে পরিমাণ পুকুর খনন হয়েছে, তার অধিকাংশই হয়েছে অত্যন্ত উর্বর তিন ফসলি জমিতে। আশ্চর্যের বিষয় হলোÑকৃষিজমি সুরক্ষায় আইন বিদ্যমান থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ কার্যত অনুপস্থিত। আইনে যেখানে ওয়ারেন্ট ছাড়াই অবৈধ খননের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়ির বিস্তার এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে শহর থেকে মানুষ গ্রামে গিয়ে কৃষিজমি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করছে। রাস্তা সম্প্রসারণ, আবাসিক প্রকল্প, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও ছোট শিল্পকারখানার নামে উর্বর জমি একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার প্রান্তিক কৃষকদের বক্তব্য এ বাস্তবতাকে আরও জীবন্ত করে তোলে। তারা বলছেন, ১৫-২০ বছর আগেও যেখানে দিগন্তজোড়া কৃষিজমি দেখা যেত, সেখানে এখন চোখে পড়ে কেবল ইট, কংক্রিট ও অবকাঠামোর সারি। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ফসলের জমি সংকুচিত হচ্ছে এবং কৃষকের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এ সংকটের আরেকটি দিক হলো ইটভাটার আগ্রাসন। বিল ও কৃষিজমির টপ সয়েল ব্যবহার করে ইট তৈরি করা হচ্ছে, যা জমির উর্বরতা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, একবার টপ সয়েল নষ্ট হলে সে জমিকে পুনরায় আবাদযোগ্য করতে দীর্ঘ সময় লাগে, অনেক ক্ষেত্রে তা আর সম্ভবও হয় না। অথচ বিকল্প হিসেবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে ইট তৈরির মতো বাস্তবসম্মত সমাধান থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, আবাসন নির্মাণ, পুকুর খনন, ইটভাটা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে আবাদি জমি দ্রুত কমছে। তাদের মতে, আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান ছাড়া এ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়। কৃষিজমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
অতএব এখনই প্রয়োজন সমন্বিত, কঠোর ও দূরদর্শী উদ্যোগ। তিন ও চার ফসলি জমিতে পুকুর খনন, ইটভাটা স্থাপন ও আবাসন নির্মাণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে বহুতল আবাসনের ধারণা উৎসাহিত করতে হবে, যাতে বসতির চাহিদা মেটানো যায় কৃষিজমি নষ্ট না করেই। কৃষিজমি সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি-কারণ কৃষিজমি রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সামষ্টিক দায়িত্ব। রাজশাহীর কৃষিজমি সংকট আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে-আমরা কি স্বল্পমেয়াদি লাভ ও তথাকথিত উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত? উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু সে উন্নয়ন যদি কৃষির ভিত্তি ধ্বংস করে হয়, তবে তা উন্নয়ন নয়-বরং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রাজশাহীর কৃষি অর্থনীতি যেমন বিপর্যস্ত হবে, তেমনি তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে জাতীয় খাদ্য উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে।