যুদ্ধ একটি বড় বিষয় হলেও যুদ্ধই সবকিছু নয়। যুদ্ধ এক সময় থেমে যায়, এখানে মানুষের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। তবে দাম্ভিক মানুষ তা বুঝতে চায় না। যুদ্ধে আগ্রাসী বা বড় শক্তি যে সবসময় জিতে যায়, তা কিন্তু নয়। যুদ্ধ শেষে বিশ্লেষণ হয়, তদন্ত হয়, রিপোর্ট হয়। বড় শক্তিও আত্মপক্ষ সমর্থন করে, চাতুর্য করে। বড় বড় নৃশংস ঘটনার যখন তদন্ত হয়, তখন উপলব্ধি করা যায় ‘কাঠগড়ার’ বিষয়টি এখনো মানবসমাজে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যুদ্ধেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। রয়টার্স ও বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের মিনাবে বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাকে ইচ্ছাকৃত নয় বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে এক সংবাদ সম্মেলেনে তিনি বলেন, যুদ্ধের বাস্তবতায় ভুল হতেই পারে, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় ১৭৫ জনেরও বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীই সম্ভবত দায়ী। তবে পেন্টাগন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফলাফল স্বীকার করে নেয়নি। এদিকে তদন্তের পরিধি আরো বাড়ানো হয়েছে। জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে মিনাবের ওই হামলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং এমন প্রশ্ন করাই অদ্ভুত। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, ইরান হাজার হাজার সেনা হত্যা করেছে, সেটিও বিবেচনায় আনা উচিত। তবে পর্যবেক্ষকদের অনেকের কাছেই ট্রাম্পের অভিযোগটাই অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে। একটি স্কুলে হামলা করে শিশু হত্যা, আর যুদ্ধে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার বিষয়টিকে কি এক পাল্লায় মাপা যায়? যুদ্ধে সেনা নিহতের ঘটনা সমরশাস্ত্রে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। তবে ট্রাম্পের অভিযোগের মধ্যে ইরান যুদ্ধে হাজার হাজার মার্কিন সেনা নিহতের একটা স্বীকৃতি পাওয়া গেল। ট্রাম্প সাংবাদিকদের আরো বলেন, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ওই হামলা চালায়নি। যুদ্ধ খুবই নিষ্ঠুর বিষয় এবং যুদ্ধে ভুলত্রুটি হতেই পারে। তবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, হামলার পরপরই ট্রাম্প কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই স্কুলে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছিলেন। এমন দায়ের সাথে সত্যের সংযোগ না থাকলেও মিথ্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এখন তো খোদ মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ‘হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীই সম্ভবত দায়ী।’
এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে বলা হচ্ছে, ইরানের ব্যাপারে ‘যথেষ্ট কঠোর নন’ ট্রাম্প। এর জবাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ-এ তিনি লিখেছেন, ‘এই বোকারা যারা মনে করে আমি ইরানের বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর ছিলাম না; যখন শেয়ারবাজার সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তেলের দাম কমছেÑওই সমালোচকরা হয় হিংসুক, নয়তো খারাপ মানুষ অথবা নির্বোধ। ট্রাম্প এই মন্তব্যটি করলেন এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনপ্রণেতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির সমালোচনা করছেন এবং সতর্ক করেছেন যে, এই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পর্যাপ্তভাবে সীমাবদ্ধ করে না এবং একই সঙ্গে ইরানকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুদ্ধটা সহজে শুরু করা গেলেও বন্ধ করাটা বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। আর যুদ্ধ বন্ধ করা গেলেও এর দায় ও ক্ষয়ক্ষতি বহন করা হয়ে ওঠে বেশ সুকঠিন। আরো বিষয় আছেÑ যুদ্ধটা দু’টি পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হলেও এর সাথে জড়িয়ে যায় আরো বহু দেশের স্বার্থ, এমন কি বিশ^ব্যবস্থাও। আগ্রাসী দেশ হিসেবে এখন এ সবের মোকাবিলা করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে। তাদের তুলনায় ইরানের অবস্থা ভালো। এটাকে এক ধরনের বিজয় বলে ভাবা যায়।