দেশের বিভিন্নস্থানে একটানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে বন্যা আক্রান্ত হয়েছে সাতটি জেলা। এর মধ্যে রয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভী বাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলায় দশ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে পানি জমে তলিয়ে গিয়েছিল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান। চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকা ও কক্সবাজারেও পানিতে ডুবে গিয়েছিল। এখন পানি কমতে থাকায় বের হয়ে আসছে ক্ষত চিহ্ন। পানি কমছে কিন্তু বন্যায় দুর্গত মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

দৈনিক সংগ্রামসহ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কাটেনি হাজারো মানুষের। এখনো বহু পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ঘরে নেই পর্যাপ্ত খাবার, দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। দুর্গম ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্যোগের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি। টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৮০ শতাংশ বন্যার্ত এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৬৫ লাখ টাকাসহ মোট ৮৫ লাখ টাকা এবং ৭০০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রশাসনিক তথ্যমতে বাঁশখালীতে ৯৪ টি স্লুইস গেটের মধ্যে বেশিরভাগ অচল। ইতোমধ্যে ১৪টি স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত পানি নামাতে ২০টি জায়গায় বেড়িবাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। জোয়ারের পানি ডুকে যেন পুনরায় প্লাবিত না হয়, সেজন্য প্রশাসনের উদ্যোগে বেড়িবাঁধ বাধা হচ্ছে। কিন্তু পানি সরতেই ভেসে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। যে ক্ষত সহজে শুকাবে না। উপজেলার অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়ক এখন চলাচলের অনুপযোগী। বাঁশখালীর অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে এই বন্যা। বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত, ফসলি জমি, মাছের প্রজেক্ট ও পোলট্রি খামার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসার, শ্যামল চন্দ্র জানান, “বাঁশখালী উপজেলায় পুরো চট্টগ্রামের ৩০ শতাংশ ফসল উৎপাদন হতো। তার পুরোটাই বন্যায় নিশ্চিহ্ন। কোথাও কোন সবজি ক্ষেত অবশিষ্ট নেই। গোলায় রাখা শত শত আরি ধান বন্যার পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।” উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, এই বন্যায় উপজেলায় কিশোরসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়। প্রায় ৩০০০ ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে।

কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা থেকেও পানি নেমে গেছে। আর বের হয়ে আসছে ক্ষতচিহ্ন। অন্যদিকে রাঙ্গামাটির বেশিরভাগ এলাকা থেকে পানি নামলেও নিচু এলাকাগুলো এখনও জলাবদ্ধ রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, বিভিন্ন জেলায় এখনো হাজারো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে। শনিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শুক্রবারের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বলা হয়েছে। বন্যায় ভুক্তোভোগীরা বলছেন, আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে বলা হয়েছে। আমরা কোথায় যাবো? আমাদেরকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিন।

দেশের অন্যান্য বন্যা কবলিত এলাকার চিত্র একই। বন্যার্তদের মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার। আমরা মনে করি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সকল এলাকার কথা সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ভেবে দেখতে হবে। সাহায্যের পাশাপাশি প্রয়োজন তাদের পুনর্বাসন। বন্যার পানি কমার সাথে সাথেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। আমরা সে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাই।