বড় এক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফল হয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ঈদের মতো আনন্দ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ এবারের ভোট উৎসবে অংশ নিয়েছেন। মানুষের এমন সচেতন দায়িত্ব পালনে বিজয় হয়েছে গণতন্ত্রের এবং বাংলাদেশের। এর বিপরীতে পরাজয় হয়েছে আধিপত্যবাদী শক্তি ও আওয়ামী নীলনকশার। ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ের কারণে এককভাবে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করেছে। অপরদিকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সংসদের বিরোধী দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মুখেও ভোট পড়েছে প্রায় ৬১%। দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভোটের ফল প্রকাশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টালবাহানা লক্ষ্য করা গেছে। এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগও করেছেন। ভোট গণনা সিটের সংখ্যা পরিবর্তন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

নতুন দিনের আশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ এবার ভোট দিয়েছে। সেই আশা জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত দিনগুলোতে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। দেশের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতির বর্ণালি হরফেও অঙ্কনে তা বাঙময় হয়ে উঠেছে। আশা করি দেশের রাজনীতিবিদরা তা ভুলে যাননি। আর যারা সরকার গঠন করবেন, তাদের ওপর জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা পূরণের দায়িত্ব বর্তাবে। বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করলে তারা ভালো করবেন। এবার ভোটে বিজয়ী বিএনপির শীর্ষ নেতারাও বারবার জুলাই-আকাক্সক্ষার কথা উচ্চারণ করেছেন। জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা হলো-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ, সবাইকে নিয়ে বসবাসের বাংলাদেশ, ইনসাফের ও আজাদীর বাংলাদেশ। নতুন সরকার এমন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করলে মানুষের সমর্থন পাবেন। আর বিপুল বিজয়ের কারণে অঙ্গীকার ভুলে যদি সরকার দাম্ভিক হয়ে ওঠেন, তাহলে তারা নিজের ক্ষতি করবেন। আসলে আওয়ামী লীগের পরিণতি থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেওয়ার বিষয় আছে।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সাফল্য কামনা করবো আমরা। কারণ, সরকারগুলো বারবার ব্যর্থ হলে দেশ সফল হবে কেমন করে? তবে সরকারের সফলতা শুধু পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। এখানে নৈতিক মেরুদণ্ডেরও প্রয়োজন হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়টি অবহেলিত হয়ে আসছে। নৈতিক মানদণ্ডের বিষয়টি শুধু সরকারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক। যারা দল করেন, রাজনীতি করেন, তারা তো বলে থাকেন- আমরা দেশ ও জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি করি। কিন্তু সবার আচরণে কি সেবা তথা ত্যাগের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়? বরং রাজনীতিবিদদের আচরণে, বিশেষ করে যারা সরকারে থাকেন, তাদের তো দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অগাধ সম্পদের মালিক হতে দেখা গেছে। এদের কাছে রাজনীতি এক ধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এদের বিরুদ্ধেই সংঘটিত হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থান। যারা আসলেই দেশ ও জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি করবেন; তারাতো এখানে দিতে আসবেন, নিতে নয়। রাজনীতির পরিবেশে এমন হলে দলের মধ্যেই নৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে। তখন দলের মন্ত্রীরা সরকারে গেলে দুর্নীতি ও লুটপাট করবেন না বরং এসব রুখে দেবেন। নৈতিক অবক্ষয়ের এ সময়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নীতিবান দলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যাদের নেতা-কর্মীরা দুর্নীতি করেন না, বরং উপার্জিত অর্থের একটা অংশ দলের তহবিলে দিয়ে থাকেন। নতুন সরকারকে এসব বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। দুনীতি ও লুটপাট বন্ধে বক্তৃতা-বিবৃতির পরিমাণ কমিয়ে উদাহরণ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাতে হবে আন্তরিকভাবে। আমরা দেশ ও জাতির কল্যাণে আহ্বান জানাতে পারি, কিন্তু কাজতো করতে হবে সরকারকেই। কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি, সরকারের অনেকেই শুধু কথা বলাকেই কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ কারণেই ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছে, ‘কথামালার রাজনীতি’। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ আর কথামালার রাজনীতি দেখতে চায় না। দেখতে চায় অঙ্গীকার বাস্তবায়নের রাজনীতি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রাজনীতি। আশা করি নতুন সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করবে এবং ভোটের মর্যাদা রক্ষায় সফল হবে।