বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার শক্তি মূলত জনগণের অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ৪২টি জেলার জেলা পরিষদে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্ত সেই ব্যবস্থাকে নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাÑএমন অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। খবরে প্রকাশ, অনেক জেলায় এমন ব্যক্তিদের প্রশাসক করা হয়েছে যারা সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন কিংবা দলীয় মনোনয়ন পাননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, নির্বাচনী রাজনীতিতে অসন্তুষ্ট বা বঞ্চিত ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করার একটি উপায় হিসেবে এই প্রশাসক পদ ব্যবহার করা হয়েছে কি না। যদি বাস্তবতা এমনই হয়, তবে তা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য মোটেই ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
জেলা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এর মূল কাজ জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয় করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবামূলক কার্যক্রম তদারকি করা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাইরে থেকে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক বসানো হয়, তাহলে প্রশাসনিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষত যেসব জেলায় বিরোধী রাজনৈতিক জোট বা অন্য কোনো দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, সেখানে এই প্রশাসক নিয়োগ নতুন ধরনের দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসকের মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বৈততা দেখা দিলে জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক গতিতে এগোনো কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ যদি দলীয় বিবেচনায় গড়ে ওঠে, তাহলে স্থানীয় প্রশাসনও নিরপেক্ষতার প্রশ্নে চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধরনের নজির নতুন নয়। ২০১১ সালের দিকে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যা তখনও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, সেই সময় প্রশাসনের ওপর দলীয় প্রভাব বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। পরে অনেকের ধারণা হয়েছে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ প্রশাসনিক কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আরও তিক্ত করে তোলে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক সংস্কৃতির। বিশেষ করে যখন একটি সরকার অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন নাগরিকরা আশা করেন যে প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু জেলা পরিষদে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশাকে কিছুটা হলেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে নিয়মিত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে যদি সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হয়, তাহলে তা স্থানীয় শাসনব্যবস্থাকে জটিল করে তোলে।
বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের পরের ধাপে জেলাগুলোতেও প্রশাসক নিয়োগ দেয়ায় অনেকেই আশংকা করছেন সরকার হয়তো খুব সহসাই স্থানীয় নির্বাচনের দিকে হাঁটবে না- যা অনেকের মধ্যেই নতুন করে আশংকারও জন্ম দিয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা প্রবলভাবে বিরাজমান। অতীতের বিতর্কিত কৌশলগুলো পুনরাবৃত্তি করার বদলে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জেলা পরিষদ পরিচালনার ক্ষেত্রেও সেই নীতিই অনুসরণ করা উচিত। প্রশাসনিক পদ বণ্টনের রাজনৈতিক হিসাব হয়তো সাময়িকভাবে কিছু মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা যদি সত্যিই রাষ্ট্রের লক্ষ্য হয়, তবে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে জনগণের ম্যান্ডেট ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।