অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পণ্য রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং টেকসই করতে জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জানুয়ারি মাসেই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ জাপানি রপ্তানিকারকদের জন্য ৯৭টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এর বিপরীতে জাপান বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ১২০টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ প্রথম দিন থেকেই জাপানি বাজারে ৭ হাজার ৩৭৯টি রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর বিপরীতে জাপানি উৎপাদকগণ বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৩৯টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি সুবিধা লাভ করবে। উভয়পক্ষ সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে একমত হয়েছে এবং চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে সমঝোতায় উপনীত হয়েছে।
বাংলাদেশ এবার প্রথম কোন দেশের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করতে চলেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ অনেক আগে থেকেই এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক ভলিউম বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে ভিয়েতনাম হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের রপ্তানির পরিমাণের পার্থক্য খুবই সামান্য। যেকোন সময় ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে অতিক্রম করে দ্বিতীয় স্থানে চলে আসতে পারে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা প্রত্যাহৃত হবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা প্রদান করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নিশ্চিতভাবেই বিপর্যয় নেমে আসবে। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর বছরে রপ্তানি আয় অন্তত ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে যাবে। ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জিএসপি সুবিধা পাবার লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। এটা করা হলে তাদের রপ্তানি আয় তাৎক্ষণিকভাবে অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
ভিয়েতনাম অন্তত ৩০টি দেেেশর সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করে রপ্তানি আয় বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা এ ক্ষেত্রে বেশ সফলতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভিয়েতনাম এখন এক বিস্ময়। দীর্ঘদিন মার্কিন অগ্রাসনের শিকার ভিয়েতনাম স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭৫ সালে। এর ঠিক চার বছর আগে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। ভিয়েতনাম এক সময় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতো। কিন্তু পরবর্তীতে তারা সময়ের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে উদার অর্থনীতি গ্রহণ করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিকদের দেশপ্রেম দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। ভিয়েতনাম এখন বিদেশি বিনিেেয়াগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
চীনের যেসব কোম্পানি অন্য দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে তার একটি বড় অংশই ভিয়েতনামে চলে গেছে। ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে তাদের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছি। জাপান বাংলাদেশের পুরনো বন্ধু দেশ। কিন্তু জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আমরা তেমন কোন সফলতা দেখাতে পারিনি। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বাণিজ্য স্বাক্ষরিত হলে জাপানি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সাধিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আগামীতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে এখনই বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে হবে।