॥ অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল বিন আমীন ॥
লেভেল প্লেয়িং (Level Playing) বলতে বুঝায় যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতায় সবার জন্য সমান সুযোগ ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা। হোক সেটা খেলার মাঠ কিংবা নির্বাচনী ভোট। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত নয় এটাকে লেভেল প্লেয়িং বলা যায় না। প্রহসনের কোনো প্রতিযোগিতাই সুখকর হয় না। খেলার ক্ষেত্রে মাঠ সমতল না হলে কেবল মাত্র একটি দল পরাজিত হয়; কিন্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাঠ সমতল না হলে পরাজিত হয় দেশের জনগণ, হারিয়ে যায় গণতন্ত্র, আর জাতির কাঁধে চেপে বসে স্বৈরশাসক, যার ভুরি ভুরি উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। ভোটকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে সমতল মাঠের বিকল্প নেই। কিন্তু এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে,ততই কেন যেন নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে- বিশেষ করে বিএনপি জোট ও জামায়াতে ইসলামী জোটের মধ্যে। এ দু’জোটের প্রতি সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা। যদি পক্ষপাতিত্ব করে তাহলে আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে পারে। বিএনপি জামায়াতে ইসলামী এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদের মোকাবেলা করেছে। একসময় দু’দলের সম্পর্ক সহোদরের মতো ছিল। হাসিনার শাসনামলে দু’দলের নেতাকর্মীরাই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; জামায়াতের শীর্ষ নেতারা জীবন দিয়েছেন। কিন্তু এখন সেই সম্পর্ক সাপে-নেউলের মতো দৃশ্যমান।
ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম দু’দলের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন আসবে, প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান হবে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তা হয়নি। ফলে ভোটের মাঠে লেভেল প্লেয়িংয়ের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব। আর মাঠে লেভেল প্লেয়িং কতটুকু আছে তা বুঝার জন্য মহাপ-িত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত সব প্রার্থী সমান সুযোগ পেয়েছে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। প্রকৃত অর্থে লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা, সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ এবং কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব না থাকা জরুরি। যাতে কেউ অন্যায্য সুবিধা না পায়, আবার কেউ অযথা বঞ্চিতও না হয়। এমন পরিবেশ যখন একটি নির্বাচনে বিদ্যমান থাকে, তখনই সেটিকে সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায়। লেভেল প্লেয়িং ছাড়া নির্বাচন মানেই অসম প্রতিযোগিতা, আর অসম প্রতিযোগিতা কখনোই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। শুধু ব্যালট বাক্স থাকলেই নির্বাচন অর্থবহ হয় না; নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে লেভেল প্লেয়িং সবার আগে নিশ্চিত করতে হয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়-লেভেল প্লেয়িংয়ের বড়ই অভাব। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত যতগুলো জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, তার একটিতেও প্রকৃত অর্থে লেভেল প্লেয়িং ছিল না। যারা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন আয়োজন করেছে, তারাই বিজয়ী হয়েছে। পুরো রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কাজ করেছে- যার দৃষ্টান্ত ২০১৪,২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন। এমন নির্বাচন দেশবাসী আর দেখতে চায় না। আমরা প্রত্যাশা করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মতো একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলের নেতাদের চরিত্র ততই উন্মোচিত হচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের আলামত খুবই ক্ষীণ। অথচ এ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কারণ ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অনেকে ভোট দিতে পারেনি। অথচ একসময় ভোট মানেই ছিল উৎসব-ভোটকেন্দ্রের আশপাশে খাবারের পসরা, চায়ের কাপে ঝড় তোলা আলোচনা। কিন্তু এখন ভোট শব্দটি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। ভোট মানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, খুন ও ব্যালট ছিনতাই আর পেশিশক্তির মহড়া। অথচ একসময় বিজয়ী প্রার্থী পরাজিত প্রার্থীর বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে হাজির হতো, বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত¡না দিত। এখন উল্টো প্রতিপক্ষকে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দিতে চায়। এ সংস্কৃতি কারও জন্য কল্যাণকর নয়।
ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তাই যেকোনো মূল্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করা জরুরি। হাসিনার শাসনামলে সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি, বাজার কমিটি ও বার নির্বাচন সব জায়গায় থেকেই ভোট উধাও ছিল। এখন সময় এসেছে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার। এর জন্য প্রয়োজন নির্বাচনী সংষ্কার। জোর যার মুল্লুক তার-দশটা হো-া আর বিশটা গু-ার র্নিবাচন আর মানুষ দেখতে চায় না। মানুষ চায় লেভেল প্লেয়িং, সমান প্রচারের সুযোগ, পোস্টার-মাইকিং-সভা-সমাবেশের সমতা। হিংসা ও প্রতিহিংসার নোংরা রাজনীতি মানুষ প্রত্যাখ্যান করছে। সমান মাঠ ছাড়া যেমন খেলা হয় না, তেমনি লেভেল প্লেয়িং ছাড়া নির্বাচনও হয় না- হয় শুধু একটি আয়োজন, যার ফল আগেই জানা থাকে। সুতরাং এখনও সময় আছে লেভেল পেয়িং নিশ্চিত করুন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, আসন্ন গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। এজন্য নির্বাচন কমিশন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ঢাকার হোটেল ওয়েস্টিনে কূটনৈতিক মিশনগুলোর প্রধান বাংলাদেশে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন (সূত্র: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, বণিক বার্তা)। প্রধান নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ভোটের আশ^াস দিলেও নির্বাচনী মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করছে। কিছু জায়গাতে হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ‘‘ঢাকা ৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ২৭ জানুয়ারী হাবিবুল্লা বাহার কলেজে, একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গেলে তাঁর ওপর হামলা করা হয়। এ হামলার সাথে যারাই জড়িত থাকুক তাদেরকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তারও আগে নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে উদ্দেশ্য করে ডিম ও ময়লা পানি নিক্ষেপ করা হয়। এ ঘটনার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন-আমি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলছি। যাদের চাঁদাবাজির সা¤্রাজ্য ভেঙে পড়ছে, তারাই ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে জড়িত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী নারী কর্মীদেরকে হেনস্তা, ভয়ভীতি, মারধর ও অপমানজনক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। গাইবান্ধার স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং পরিশালের মুলাদীতে এবি পার্টিও কর্মীর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে দাঁড়িপাল্লার অফিসে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদে স্ত্রীকে প্রকাশ্যে হুমকির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন সুত্রাপুর এলাকায় এক সভায় সরাসরি হুুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন- বিএনপি চাইলে ঢাকায় জামায়াত শিবিরকে রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না। তিনি দলটিকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকা-ে সাবধান হওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন- প্রশাসনের নিরপেক্ষতা জরুরি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে রিটানিং কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন- নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারছে না। ’’ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রী ও প্রার্থীরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। প্রার্থীদের বক্তব্যে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপিসহ অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতা ও প্রার্থীরা একে অন্যের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়ছেন। দিন যতই যাচ্ছে প্রার্থীদের কথার লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এর সঙ্গে হুমকি-ধমকির ঘটনাও যুক্ত হয়েছে। ক্রমশই বাড়ছে উত্তাপ। কেউ কেউ তুলছেন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ।
ফলে সুষ্ঠু ভোটের শঙ্কা বাড়ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া নির্বাচন কখনোই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। সমান সুযোগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্র যদি কোনো একটি পক্ষের জন্য মাঠ বাঁকা করে দেয়, তবে ভোটার যত স্বাধীনই হোক, তার ভোট আর স্বাধীন থাকে না। সমান মাঠ ছাড়া যেমন খেলা হয় না, তেমনি লেভেল প্লেয়িং ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না- হয় শুধু একটি আয়োজন। যার ফল আগেই জানা থাকে। এখনো সময় আছে। সবার জন্য সমান মাঠ নিশ্চিত করুন। সমান মাঠ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয় তখন গণতন্ত্র হয়ে ওঠে অর্থহীন। সমান সুযোগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও অবাধ রাজনৈতিক কর্মকা- ছাড়া জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হয় না। তাই গ্রহণযোগ্য ও বিশ^াসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে সবার জন্য সমান মাঠ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
লেখক : প্রাবন্ধিক।