ওমর ফারুক

আমরা খুবই চিল্লাপাল্লা করে এলোমেলো অবস্থা করে ফেলতাম আগে। কেনো জানেন বাকস্বাধীনতা ছিল না বলে। মন খুলে মনের-মাধুরী মিশিয়ে কথোপকথন করতে পারতাম না বলে। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় যা মন চাই তা লিখলেও ঝামেলায় পড়তে হতো। কিন্তু এখন কী হচ্ছে ভেবে দেখেছেন কী আপনারা? যেমন খুশি তেমন নোংরামি করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বাকস্বাধীনতা কখনোই অশালীন শব্দ, নোংরা বাক্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণের অনুমতি দেয় না। মত প্রকাশের অধিকার মানে শালীনতা ও দায়িত্ব বজায় রেখে কথা বলা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় সেটাকে আজ লাগামহীন ভাষার ঢাল বানানো হচ্ছে। হইহট্টগোল করেই মূল একাউন্ট এবং ফেইক একাউন্ট খুলে অজস্র অসামাজিক আচরণ করলে কেমন বাকস্বাধীনতা হয়? আপনার মাথা কিংবা মস্তিষ্কে কী এসবকেই বাকস্বাধীনতা বলে? এমন বাকস্বাধীনতা চাই না যার কারণে অসভ্য ও নোংরা ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে হয়।

আরেক জিনিস দেখলাম আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে। আরে গণতন্ত্র মানেই হচ্ছে সবার মত একই না। একেকজন মানুষের এক-এক মতামত হলোই গণতন্ত্র তবে তা ইতিবাচক হওয়া চাই অবশ্যই। নেতিবাচক বা দেশ ও সমাজ বিরোধী হওয়া চলবে না। কারো কারো মত আপনার সাথে নাও মিলতে পারে। আপনার দলের, গোত্রের, পক্ষের ও স্বার্থের দিকে নাও যেতে পারে। বৈচিত্র্য বা অমিল হতেই পারে। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু সে ভিন্নমতের নামে গালাগাল, কটূক্তি ও পরিবার টেনে অপমান রাজনীতিকে নয় বরং আমাদের নৈতিক অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যুক্তির জায়গায় যখন ঘৃণা আসে, তখন সমাজে প্রতিহিংসা বাড়ে। হু-হু করে বৃদ্ধি পায় অনিহা, ঘৃণা, নির্দয়া ও সহস্র কি.মি. দূরত্ব। সবাই একই দলের লোক হলেতো আর গণতন্ত্রের দরকার পড়ে না। একজনের মন্তব্য অন্যের সাথে নাই মিলতে পারে তাই বলে পরিবারের নারী জাতি ধরে টান দিয়ে আপনি লাগামহীন গালাগাল দিতে পারেন না। কারো মৃত মা-বাবা নিয়ে হুলুস্থুল নোংরামি শব্দ বানিয়ে বাক্য গঠন করতে পারেন না।

সবচেয়ে বেমানান ও কষ্টকর টপিক হচ্ছে মৃত মানুষকে পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে না মানুষ। কেমন সুশীল সমাজে বসবাস করছি আমরা? কেমন জ্ঞান আহরণ করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা? কেমন শিক্ষা অর্জন করছি আমরা? কেমন মুহূর্ত সৃষ্টি করে যাচ্ছি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য? এখন একটু বুঝতে শিখলেই মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হয়। সে ক্ষেত্রে ছোটদের ও তরুণদের কী পথ দেখাচ্ছি আমরা? মৃত মানুষ নিয়ে মক, ট্রল, ব্যঙ্গ, নেংরামি ও কটূক্তি করে যাচ্ছি নিয়মিত এসব পরবর্তী প্রজন্ম শিখবে না? মৃত মানুষকে নিয়ে লজ্জাজনক ও ব্যঙ্গ মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের উদাহরণ। এতে শুধু মৃত ব্যক্তিকে নয়, আমাদের সামষ্টিক বিবেককেই অপমান করা হয় এবং মানুষের মধ্যে সংবেদনশীলতা দিন দিন কমে যায়। কোথায় যাচ্ছে ভবিষ্যৎ তরুণ? আদোও কী ভালো কিছু বয়ে আনবে বলে মনে হয় এসবে?

আপনারা সুশীল সাজছেন নষ্টামি করে? আপনাদের কী মনে হয় না আরো পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা জাতি হিসেবে? আমরা সমাজকে নষ্ট করছি না? এ নোংরা ভাষা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করছে। সহমত ও সহনশীলতার জায়গায় প্রতিশোধপরায়ণতা ঢুকে পড়ছে, ফলে সমাজ আরও বিভক্ত ও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। টক্সিক একটা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষপূর্ণ শব্দমালা দ্বারা আরো বহুগুণ পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের এ বিষয়ে নজর রাখা দরকার। দেশের নয়া নব্য জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া চলবে না। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে লাফ দিতে বাধ্য করছি আমরা রিতিমত। এসব আক্রমণাত্বক মন্তব্য দিয়ে আমরা জাতিকে ফারাক করে দিচ্ছি নিয়মিত একে অপরের থেকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ভদ্রতা নয়, নোংরামিই বেশি ভাইরাল হয়। যত বেশি কটু ভাষা, তত বেশি লাইক ও শেয়ার-এ বিকৃত সংস্কৃতি মানুষকে দায়িত্বহীন করে তুলছে এবং ঘৃণাকে স্বাভাবিক করে দিচ্ছে। জ্যামিতিক হারে ভাইরাল হতে থাকে নোংরা কথা ও ডার্ক স্যাটায়ার কন্টেন্ট। হ্যাঁ, স্যাটায়ার ও ক্রিটিক দরকার আছে। তবে তা সীমাহীন সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। এতো অতিরিক্ত ডিফ স্যাটায়ার ও ক্রিটিক জাতিকে কোনো ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে না। উল্টো আরো হযবরল করে দিচ্ছে পরিস্থিতি। এআই ইউজ করে মুহূর্তেই হইহই করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে নোংরা ভিডিও ও অশালীন ছবির দৃশ্য। যা আমাদের জাতিগোষ্ঠীকে দিনদিন অতিষ্ঠ করে তুলছে কিংবা দিনের পর দিন হয়রানি হচ্ছে। এমন বাকস্বাধীনতার দরকার আছে বলে মনে হয় না। এই গুলো যারা করে বা সৃষ্টি করে তাদের দ্বারা দেশ বা দেশের মানুষকে একত্র করা সম্ভব না। সুন্দর সুললিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা পুরোপুরি অসম্ভব।

আপনারা শুধু পরবর্তী প্রজন্ম ও বর্তমান প্রজন্মের অবস্থা কেমন হচ্ছে বা হবে একটু চিন্তা করুন। ভালো ক্রিটিক কন্টেন্ট, ভালো মিমস, ভালো শব্দের মিশ্রণে স্যাটায়ার বা সমালোচনা করা যায়। সোজাসাপ্টা পরিবার, নারী, গায়ের রং, ছোট-বড়, ধনী-গরিব এবং ধর্ম-বর্ণ টেনে এনে স্যাটায়ার বা মব-মক-ট্রল করতে হয় না। লিমিটে থেকে সমালোচনা ও যুক্তি দিয়ে জবাব দেওয়া শ্রেয় বলে মনে করি। এ পরিবেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। তাই এসব থেকে সরে আসা এখন জরুরি-ভাষা শুদ্ধ করা, সংযত হওয়া এবং দায়িত্বশীল মতপ্রকাশে ফিরে আসাই সময়ের দাবি। নীরবতা নয়, চুপ রয়ে নয়, উৎসাহ দিয়ে নয় ও আরো করেন বলে নয় উল্টো সচেতন হয়েই প্রতিবাদ করতে হবে এসবের বিরুদ্ধে। নয়তো দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে তার কোনো হদিস থাকবে না। সচেতন হোন, বুঝিয়ে বলুন, সাবধান করুন, নৈতিকতা শিখান, না হয় জটিল কঠিন ভোগান্তি সৃষ্টি করবে একসময়।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি সিটি কলেজ।