মানুষ মানুষকে ভালোবাসে, ভালোবাসে জন্মভূমিকে। জন্মভূমির ঘটনাপ্রবাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের কাছে। কারণ ঘটনাপ্রবাহ দেশকে এগিয়ে নেয় অথবা টেনে নেয় পেছনের দিকে। গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহের সাথে যুক্ত হয়ে গেছেন ওসমান হাদি। আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনি। পুরো বাংলাদেশকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র জুলাই বিপ্লবী শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে ২০ ডিসেম্বর শনিবার বিকেলে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দুপুর আড়াইটায় তাঁর নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় এলাকাটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশের লাখ লাখ মানুষ জানাযায় অংশ নেন। ঐতিহাসিক এ জানাযায় তারা হাদির ইনসাফ ও আজাদির লড়াই অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন। জানাযার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, লাখ লাখ লোক এখানে হাজির হয়েছে। পথে পথে ঢেউয়ের মত লোক আসছে।
ওসমান হাদিকে স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছ। বাংলাদেশ যতদিন আছে, তুমি সব বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পাারবে না। প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, বিদায় দিতে নয়, আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি। উন্নত মম শিরের যে মন্ত্র তুমি দিয়ে গেছ, সেটা বাংলাদেশি সন্তানেরা জন্মলগ্ন থেকে যতদিন বেঁচে থাকবে, নিজের কাছে বলবে। আমাদের শির কখনো নত হবে না। আমরা দুনিয়াতে মাথা উঁচু করে চলবো। সে মন্ত্র তুমি আমাদের দিয়ে গেছ। আমরা সেটা পূরণ করে যাব। ওসমান হাদির জানাযায় রাজনৈতিক নেতা, সরকারের উপদেষ্টা ছাড়াও সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তা, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিসহ সমাজের বিশিষ্টজনরা অংশ নেন। আর জনতার অংশগ্রহণ ছিল বাঁধভাঙা জোয়ারের মত।
ওসমান হাদি তার ছোট্ট পরিসরের আয়োজনের মধ্যে অনেক বড় কথা বলে গেছেন। তিনি ইনসাফ ও আজাদির কথা বলেছেন, বলেছেন, ‘উন্নত মম শির’। এগুলোই রাজনীতির আসল কথা। রাজনীতির আসলকে উড্ডীন রাখতে গিয়ে হাদিকে জীবন দিতে হয়েছে। রাজনীতির ভিন্ন চিত্রও আছে। অনেকেই আদর্শ ও নীতি বিসর্জন দিয়ে রাজনীতির ময়দানে নানা চাতুর্য প্রদর্শন করেন, কৌশল অবলম্বন করেন এবং এভাবেই ক্ষমতার মসনদে আরোহন করতে চান। ক্ষমতাকেন্দ্রিক এ রাজনীতির বিরুদ্ধে দ্রোহ করেছিলেন কবি নজরুল, তারই পদাংক অনুসরণ করেছেন জুলাই বিপ্লবী শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। তবে দুঃখের বিষয় হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও আমাদের রাজনীতি দূষণমুক্ত হয়নি। এখনো অনেকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ব্যস্ত। কেউ কেউ তো ক্ষমতার লালসায় পরাজিত ফ্যাসিবাদী চক্র ও আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে হাত মিলাতে কুন্ঠিত নয়। অথচ এমন অপরাজনীতির বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ ছিলেন ওসমান হাদি। ইনসাফ ও আজাদির জন্য তিনি জীবন দিলেন, কিন্তু তার এই ত্যাগের মূল্য দিতে অক্ষম ক্ষমতালোভী কিছু কুলাঙ্গার রাজনীতিবিদ।
ইনসাফ ও আজাদির লড়াইয়ে হাদি ছিলেন সৎ ও আপসহীন। এ কারণেই হয়তো তার প্রতি দেশের মানুষের এতো ভালাবাসা। হাদির জানাযায় লাখ লাখ মানুষ হাজির হয়ে হাদির রাজনীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এখানে বিবেচনার বিষয় হলো, হাদির রাজনীতি তো ভূরাজনীতির গোলাম নয়, প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতির বিপক্ষেই ছিল তার অবস্থান-এখন হাদির অবর্তমানে তার রাজনীতি চলবে কেমন করে? হাদির প্রতিনিধিরা ইনসাফ ও আজাদির লড়াই চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন। এ রাজনীতি তো ক্ষমতা লিপ্সুদের পছন্দ নয়, পছন্দ নয় আধিপত্যবাদী শক্তিরও। ফলে উপলব্ধি করা যায়, হাদির উত্তরসূরীদের পথচলা হবে বেশ কঠিন। নানাভাবে সৃষ্টি করা হবে প্রতিবন্ধকতা, সৃষ্টি করা হবে বিভ্রান্তির জটাজালও। হাদির হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছে, সেখানে শৃঙ্খলাবিধান খুব সহজ কাজ নয়। কুচক্রী মহল মন্দ এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে মব। এভাবেই তারা হাদির ইনসাফ ও আজাদির লড়াইকে ব্যর্থ করার কৌশল নিতে পারে। দুই পত্রিকার ওপর হামলার ঘটনা কি তেমন কোনো আলামত?
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার ঘটনা দেশের গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে অভিযোগ করা হয়েছে সম্পাদক পরিষদের সভায়। তারা জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায আনার দাবি জানিয়েছেন। সভায় বক্তারা বলেন, মব-ভায়োলেন্স দিন দিন বাড়ছে। তারই অংশ হিসেবে দুটি পত্রিকায় হামলা হয়েছে। গত সোমবার সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক যৌথ প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে সংবাদপত্র ও সম্পাদকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (নোয়াব)। অর্থাৎ সম্পাদক ও মালিকরা মব-ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। খুবই ভালো উদ্যোগ। প্রতিবাদ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সংহতি জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা মানে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত। জুলাই আন্দোলনের ওপর আঘাত। আমরা অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরতে চাই।
জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের সভায় বলেন, অতীতেও আমরা সম্পাদকদের ওপর হামলার ঘটনা দেখেছি। আমরা সকল হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, সব জায়গায় পতিত স্বৈরাচারের লোকজন ঘাপটি মেরে আছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের এক হয়ে লড়তে হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সভায় বলেন, প্রথম আলো, ডেইরি স্টারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দুঃখজনক। আমাদের স্লোগানগুলো ব্যবহার করে তারা সেখানে আক্রমণ করেছে এবং সেটার পক্ষে সম্মতি তৈরি করছে। তিনি আরো বলেন, শরীফ ওসমান হাদির একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে এবং হওয়ার পর কী কী ঘটনা ঘটানো হবে বাংলাদেশে, এর একটি চক্রান্ত পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি হয়েছে। সভায় গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনাযেদ সাকি বলেন, বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকা- করে জুলাই বিপ্লবকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের একসঙ্গে রুখে দাঁড়াবার সময় এসেছে।
অপশক্তির বিরুদ্ধে এক সঙ্গে রুখে দাঁড়াবার সময় দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশের অনেক রাজনীতিবিদ, টকশোবিদ, সাংবাদিক এখনো দলীয় বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছেন। গ-ি পেরিয়ে আসার সামর্থ্য তাদের নেই। সংবাদপত্র সম্পাদক ও সংবাদপত্র মালিকদের ভূমিকাও স্বচ্ছ নয়। তাদের বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক প্রবণতাও কোনো গোপন বিষয় নয়। এখন তো তারা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন; এ প্রতিবাদ ন্যায়সঙ্গত, আমরা সমর্থন জানাই। কিন্তু যখন দৈনিক সংগ্রাম, নয়াদিগন্ত ও আমার দেশ পত্রিকার ওপর হামলা হয়েছে, সংগ্রাম সম্পাদক ও আমার দেশ সম্পাদকের ওপর হামলা হয়েছে, জেল-জুলুম চলেছে; তখন সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াব কোথায় ছিল? তখন কি তাদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা কিংবা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার কথা মনে ছিল না? ফ্যাসিবাদী সরকার বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম কৌশলে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তখন তো এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি এখনকার প্রবক্তারা। গণতন্ত্র ও সাংবাদিকতায় কোনো বর্ণবাদ আছে কী? আসলে নীতিহীনতা ও সততার অভাবেই আমাদের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় এমন দুর্দশা ঘটেছে। দলবাজি, নীতিহীনতা ও ক্ষমতার পদলেহন আমাদের তথাকথিত বদ্ধিজীবী ও সুশীলদের অমানুষে পরিণত করেছে। এদের কারণেই মানুষের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং দেশের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে শোষণ ও বঞ্চনার মাত্রা। দেশের এমন পরিবেশে আধিপত্যবাদীরা তাদের আগ্রাসনের মাত্রা বাড়িয়েছে। দেশি-বিদেশি এ চক্রের বিরুদ্ধে ছিল শরীফ ওসমান হাদির লড়াই, ‘ইনসাফ ও আজাদির লড়াই’Ñ আগামীতে এ লড়াই হবে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার মুক্তির আসল লড়াই।