রিদওয়ান বিন ওয়ালি উল্লাহ

৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে নির্বাচনের নামে তামাশা হয়েছে। ভারত থেকে পাকিস্তান হওয়ার যে কারণ ছিল ঠিক একই কারণে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়েছে। বৈষম্য; এটি সবারই জানা। মজার ব্যাপার হলো, ৭১ সালে এত এত জীবন, ইজ্জত, সম্পদের মাশুল গুনে সেটাই আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে ওপেন সিক্রেট পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে চর্চা শুরু হয়ে এখনো চলমান।

বৈষম্যকে তরতাজা করে টিকিয়ে রাখার প্রধান কারণ ক্ষমতার নেশা। একশ্রেণির রাজনীতি-বিদদের তলের খবর নিলে দেখা যায় যে, দৃশ্যমান কিছু ভালো কাজের নমুনা শুধুই সাধু সাজার প্রক্রিয়া। এছাড়া ভেতরে শুধু ক্ষমতার লোভ, স্বার্থান্বেষীতা, পেট পূরণের ধান্দা। যেকোনো বাজেটে দেশের জন্য হয়তো ২০% ব্যয় হয়। বাকি ৮০% মহান নেতা, দরদী রাজনৈতিক কর্মী কিংবা তথাকথিত ভাইদের পেটের ক্ষুধা আর নেশা পূরণের বন্দোবস্ত। আর এ পেট পূজারী ক্ষমতালোভীদেরকে দিয়েই আধিপত্যবাদ কোনো জাতির ঘাড়ে চেপে বসে। সুতরাং পেট পূজা, ক্ষমতা লিপ্সা আর আধিপত্যবাদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আধিপত্যবাদের প্রধান মিত্র স্বার্থান্বেষী পেট পূজারী রাজনীতিক। আর প্রধান শত্রু দেশপ্রেমিক শক্তি। সে নগন্য ব্যক্তি হোক কিংবা পাবলিক ফিগার হোক। একজন নগন্য নাগরিক হয়েও শুধুমাত্র দেশপ্রেমের কারণে বুয়েটের আবরার ফাহাদকে খুন হতে হয়েছে। আবার বাংলাদেশের সর্বমহলে স্বীকৃত, দুর্নীতিমুক্ত মন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসের উদাহরণ হয়ে থাকা দুজন মন্ত্রীকে শুধুই তাদের দেশপ্রেমের কারণে হত্যা করা হয়েছে।

গত ১৮ বছর ছিল আধিপত্যবাদের জয়জয়কার। একটা রাজনৈতিক দল, দলের প্রধান কিংবা কর্মীরা আধিপত্যবাদের দাস বনে যাওয়াতে বিনা বাধায় সর্বত্র রাজত্ব কায়েম করে টিকে ছিল। হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হওয়া তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। একটা পদ্মাসেতু আর একটা মেট্রোরেল তৈরি করে জাতিকে আনন্দের মহাসাগরে ভাসিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা দেশ লুট করে নিয়ে গেছে।

শ্বেতপত্রের সূত্র মতে (বিবিসি নিউজ, ২ ডিসেম্বর, ২০২৪) বিগত ১৫ বছরে দেশের শুধু ব্যাংক খাতে যে মন্দ ঋণ তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল বা ২৪টি পদ্মা সেতু করা যেত। আর অল্পে তুষ্ট জাতি ১টা পদ্মাসেতু আর ১টা মেট্রোরেল দেখেই আনন্দে আত্মহারা। এর বিনিময়ে কত অর্থ পাচার হয়েছে সে প্রশ্ন করা অন্যায়!

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক অধ্যায় ছিল গত ১৬ বছর। রাষ্ট্র থেকে বেড রুম সর্বত্র ছিল আশঙ্কা, ত্রাস, অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতার খড়গ। দিনে-রাতে, ব্যালটে-মেশিনে ভোট ডাকাতি আর চুরি ছিল ক্ষমতা পাকাপোক্ত রাখার প্রধান হাতিয়ার। জগদ্দল পাথরটিকে সরাতে শুধু জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সমূহ সম্ভাবনাময়ী দু সহস্রাধিক বনি আদম জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। গত ১৬ বছরের গুম, খুন, নির্যাতন তো ইতিহাসের কালো অধ্যায়। পঙ্গুত্ব বরণ করেছে হাজার হাজার। যে নির্বাচন দিয়ে আধিপত্যবাদ জেঁকে বসেছিল জাতির ঘাড়ে। স্বার্থান্বেষী বর্ণচোরা কপট রাজনীতিবিদদেরকে অবৈধ গাড়ি-বাড়ি-নারীতেব্যস্ত রেখে একটা চুরি-ডাকাতি, আমি-ডামির নির্বাচন ব্যবস্থা করে আধিপত্যবাদের জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে রেখেছিল জাতিকে। এখন আবার সে আভাস বাতাসে ঘুরে প্রাণ ওষ্ঠাগত নাগরিকের কানে আসছে। অথচ ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে ৫ আগস্ট ২০২৫ এখনো আসেনি। এর মধ্যেই নির্বাচন মেকানিজমের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর জাতি ধরেই নিয়েছে, এবার জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে। প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরে আসবে। গণহত্যাকারী দল পালিয়েছে। তাদের বিচার হবে। দেশদ্রোহীরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আর দেশপ্রেমিক সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ফ্রি, ফেয়ার ও ট্রান্সপারেন্ট নির্বাচন এর মাধ্যমে দেশ টেকসই উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। এটাই বিপ্লবের প্রত্যাশা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বিপ্লবের পরে দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোর আচরণ আধিপত্যবাদকে বিপ্লব নস্যাৎ করতে কিছুটা হলেও সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানের বিপ্লবী ভূমিকার আলোচনা ভুলে অধিকাংশই প্রত্যেকের অতীত দোষের খোঁজে সময় অপচয় করেছে। ব্যতিক্রম শুধু শিবিরের বিশাল বিজ্ঞান মেলা ও দেশব্যাপী প্রকাশনা উৎসব। আর ছাত্রদলের কুরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা। অথচ গত ১৬ বছরে গোলাম সরকার দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোকে কুকুর-বিড়ালের চেয়ে জঘন্যভাবে গুম, খুন, নির্যাতন করেছে সমানতালে। ২৪ এর নয়া বিপ্লবের আকাক্সক্ষা ছিল, দেশপ্রেমিক সকল শক্তি শিক্ষার উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধি, মিডিয়ার দাসত্ব মুক্তি ইত্যাদির টেকসই মডেল উদ্ভাবন করে রাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করবে।

দেশপ্রেমিক শক্তিগুলো শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেলে পরাজিত শক্তি হয় পালাবে, না হয় সকল অপরাধের জন্য তাওবা করে গোলামী ছেড়ে দেশপ্রেমিক হবে। তাই দেশের টেকসই উন্নতির পথ সুগম করতে পতিত শক্তিকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করে সকল দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোকে ফ্রি, ফেয়ার এন্ড ট্রান্সপারেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। সব ভেদাভেদ ভুলে আধিপত্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়া এখন প্রধান দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষাবিদ।