॥ রাকিব মাহমুদ ॥
১৯৯৩ সালের জুন মাসে জন্ম নিয়েছিলেন শহীদ ওসমান বিন হাদী। কাকতালীয়ভাবে এই জুন মাসেই ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.) শাহাদাত বরণ করেছিলেন। হয়তো সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ধর্মীয় ভালোবাসা থেকেই বাবা তার নাম রেখেছিলেন ‘ওসমান গণি’। ধর্মীয় আবহে বেড়ে ওঠা হাদীর শৈশব কেটেছে মসজিদ আর মক্তবের সান্নিধ্যে। সুবহে সাদিকের একটু পর বাবার হাত ধরে মক্তবে যাওয়া, বর্ষার সকালে মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর হৃদয়ের গভীরে অনুভব করা-এসব স্মৃতিই ধীরে ধীরে তার ভেতরে গড়ে তুলেছিল এক আলাদা সংবেদনশীলতা ও নৈতিক দৃঢ়তা।
বাবাকে ঘিরে লেখা তার একটি পঙক্তিতে ধরা পড়ে সেই শৈশবের অনুরণন-
“যার ডাকে লাল হয়ে ওঠে শিমুলবাগান,
ঝড়ের রাইতে আজও কানে বাজে আব্বার আজান।”
বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ওসমান হাদী। বাবা ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষক। সাদামাটা জীবনের আবরণে বেড়ে উঠলেও তার মননে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল এক তীক্ষè প্রতিবাদী সত্তা। প্রশ্ন জাগে-এই অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেটি কীভাবে হয়ে উঠলেন এক দ্রোহী বিপ্লবী?
একটি অনুষ্ঠানে ওসমান হাদী নিজেই তার বিপ্লবী হয়ে ওঠার গল্প বলেছিলেন। সেই যাত্রার সূচনা একটি নামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত-কুলকাঠি। হাদীদের বাড়ি থেকে মাত্র তিন-চার কিলোমিটার দূরের এই জায়গাটি বহন করে এক রক্তাক্ত ইতিহাস, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষের চেতনাকে আলোড়িত করে এসেছে।
হাদীর জন্মের বহু আগের একটি ঘটনা হাদীর মানসে স্থায়ীভাবে আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। ঝালকাঠি শহরের অদূরে, সুগন্ধা নদীর দক্ষিণ তীরে পোনাবালিয়া ও কুলকাঠি ইউনিয়নে এ ঘটনার সূত্রপাত। হিন্দু সম্প্রদায় ঢোল-বাদ্যসহ মসজিদসংলগ্ন সড়ক দিয়ে মেলায় যাতায়াত করায় মুসলমানদের ইবাদতে বিঘœ ঘটে। বিষয়টি নিয়ে মসজিদের খতিব মৌলভি সৈয়দ উদ্দিনের নেতৃত্বে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। একপর্যায়ে উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকে।
পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সতীন্দ্রনাথ সেন তথাকথিত ‘হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক’ বাহিনী নিয়ে এলাকায় অবস্থান নেন। শান্তি রক্ষার নামে ২ মার্চ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই. এন. ব্লান্ডির নির্দেশে গুর্খা বাহিনী মুসলমানদের ওপর গুলী চালায়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন ১৯ জন মুসল্লি, আহত হন অসংখ্য মানুষ।
এই কুলকাঠি হত্যাকা- সারাদেশে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দেয়। ১৯২৭ সালে পিরোজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন সংগঠিত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সতীন্দ্রনাথ সেনের সত্যাগ্রহ আন্দোলন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা এই মর্মান্তিক গণহত্যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এই ইতিহাস শুনেই বড় হয়েছেন ওসমান হাদী-বাবা-দাদার মুখে, গ্রামের প্রবীণদের কণ্ঠে। প্রতিবছর কুলকাঠির সেই মসজিদে মিলাদ ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হতো। অন্যায়ভাবে শহীদ হওয়া ১৯ জন মুসলমানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক প্রতিবাদী আত্মা-নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।
আমরা অনেকেই হয়তো ওসমান হাদীর রাজনৈতিক উত্থান কিংবা বিপ্লবী ভূমিকার কথা জানি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে-তিনি ছিলেন একজন শক্তিমান কবিও। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লাভায় লালশাক পূবের আকাশ’-এ স্থান পেয়েছে প্রায় ত্রিশটি কবিতা। প্রতিটি কবিতায় তিনি কলমের কালিতে ঢেলে দিয়েছেন আগুন-যে আগুন স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের মুখোশ খুলে দেয়, আবার সেই আগুন থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভালোবাসা, নতুন স্বপ্ন ও নতুন প্রতিবাদ।
‘আগুন কি আলো নয়’ কবিতায় তিনি কলম তুলেছেন পশ্চিমা সভ্যতার ভ-ামির বিরুদ্ধে। তার কবিতায় উচ্চারিত হয় নির্মম ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা-
“প্রিন্স অব ওয়েলসে ঘোষণা হলো-
গণহত্যা গিলে খাবে না দুনিয়ারে
আর অতঃপর হলোকাস্টের হাঁপর নিভায়ে
শান্তির সুনামি আনল আটলান্টিক সভ্যতা!
এরপর? সত্তর বছর ধরে
তাফালের তুষ হলো প্রাচ্য,
লাভায় লালশাক হয়ে গেল পুবের আকাশ,
জেরুসালেম হয়ে গেল জল্লাদের জলসাঘর।”
সাম্রাজ্যবাদ, বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং স্বৈরাচারের লোক দেখানো উন্নয়নের বিরুদ্ধে তার কবিতা হয়ে উঠেছে তীক্ষè প্রতিবাদের ভাষ্য। এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’-
“হে সীমান্তের শকুন এক্ষুনি ছিঁড়ে খাও আমাকে,
হে আটলান্টিকের ঈগল শিদৃণির খুবলে খাও আমাকে,
হে বৈকাল হ্রদের বাজ আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে।
আমার রক্তরসে শুধু অসহায়ত্ব আর অভাব:
কাগজের কামলারা তারে আদর করে মুদ্রাস্ফীতি ডাকে।
ঋণের চাপে নীল হয়ে যাচ্ছে আমার অণুচক্রিকা,
সংসার চালাতে অন্তরে হয় ইন্টারনাল ব্লিডিং-
কী আশ্চর্য, তবুও আমি মরছি না!
ওদিকে দোজখের ভয়ে আত্মহত্যা করবারও সাহস পাই না আমি!”
‘সীমান্ত শরীফ’ ছদ্মনামে লেখা তার উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে-আগুন কি আলো নয়, আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন, বেওয়ারিশ সন্ধ্যা, মায়ার অ্যাস্ট্রোনমি, অন্তরঙ্গ অবহেলা, মাগরেব, আব্বান, অবহেলার আভিজাত্য, আকসার কয়লা প্রভৃতি।
ওসমান হাদীর কবিতা কেবল সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়-এ এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান, সময়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক অগ্নিস্বর।
কুলকাঠির রক্তাক্ত ইতিহাস আর শৈশবের ধর্মীয় আবহ-এই দুইয়ের সংযোগেই গড়ে উঠেছিলেন শহীদ ওসমান হাদী। ইতিহাস তাকে শুধু একজন শহীদ হিসেবেই নয়, এক জাগ্রত বিবেক, এক অন্তর্গত দ্রোহ এবং এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর হিসেবেও মনে রাখবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট।