॥ কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক ॥

বাংলাদেশে রমযান মাসের আগমন সবসময়ই আধ্যাত্মিক উৎসবের সাথে অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে আসে, বিশেষ করে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে। ২০২৬ সালের রমযান, যা আগামীকাল শুরু হতে চলেছে, নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর গঠিত এই সরকারকে বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব, আমদানি ব্যবস্থার জটিলতা এবং চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হার ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে উঠেছে, যা রমযানের আগে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই হারগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নি¤œ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ইতিমধ্যেই তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় করছে, এবং রমযানের চাহিদা বৃদ্ধিতে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে। গত বছরের তুলনায় আমদানি ৪০ শতাংশ বেড়েছে, যা বাজার স্থিতিশীল রাখার আশা জাগিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দামের উর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।

রমযানের প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে খেজুরের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। সরকার গত ডিসেম্বরে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেছে, কিন্তু তারপরও এক সপ্তাহের মধ্যে দাম প্রতি কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর তথ্য অনুসারে, সাধারণ মানের খেজুরের দাম এখন ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকা প্রতি কেজি, যা গত সপ্তাহের সমান কিন্তু গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে কম। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ঢাকার বাজারে জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা প্রতি কেজি, ডাব্বাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা, বরই খেজুর ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা এবং সুক্কারি ৮০০ টাকা প্রতি কেজিতে বিক্রি হয়েছে। অন্যান্য পণ্য যেমন ছোলা, ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, মশলা এবং মাংসের দামও বেড়েছে, যেখানে ফলমূলের দাম প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে পেঁয়াজ ৬০ টাকা, চিনি ১০০ টাকা, লোকাল গার্লিক ১২০ টাকা এবং ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা প্রতি কেজিতে বিক্রি হয়েছে। রমযানে ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন, যা আমদানি বৃদ্ধির পরও বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।

এই পরিস্থিতিতে সিন্ডিকেটের ভূমিকা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সিন্ডিকেট বলতে বুঝায় ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠিত গ্রুপ, যারা পণ্যের সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, আমদানি বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাজারে হোর্ডিং (পণ্য মজুত করে রাখা), সাপ্লাই উইথহোল্ডিং (সরবরাহ আটকে রাখা) এবং প্রাইস লিডারশিপের মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অসহনীয়। উদাহরণস্বরূপ, চাল, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ এবং অন্যান্য মৌলিক পণ্যের মার্কেটে এই সিন্ডিকেটের প্রভাব দেখা যায়, যেখানে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তা প্রতিফলিত হয় না। বিশ্লেষকরা বলছেন যে, এই সিন্ডিকেটগুলো ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের সমন্বয়ে গঠিত, যারা অসৎভাবে লাভ করে এবং কোনো বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই প্রথা চলতে থাকে। ফলে, রমযানের মতো উচ্চ চাহিদার সময়ে দামের স্পাইরাল আরও তীব্র হয়, এবং সাধারণ মানুষের আয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। গত বছরের রমযানে পেঁয়াজের দাম ৯০ টাকা থেকে কমে ৩৫ টাকায় নেমেছে, কিন্তু এ বছরের প্রবণতা দেখে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, সিন্ডিকেটের কারণে দাম আরও বাড়তে পারে।

সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রস্তাবিত কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে: প্রথমত, প্রতিযোগিতা কমিশন (Bangladesh Competition Commission) -কে শক্তিশালী করা, যাতে তারা অ্যান্টি-কার্টেল টাস্কফোর্স গঠন করে মনোপলি ভাঙতে পারে এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ফাইন, সিভিল এনফোর্সমেন্ট বা ক্রিমিনাল প্রসিকিউশনের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, লেনিয়েন্সি প্রোগ্রাম চালু করা, যেখানে সিন্ডিকেটের সদস্যরা তথ্য প্রদান করে ইমিউনিটি বা ফাইন কমানোর সুবিধা পেতে পারে, যা তদন্তকে সহজ করে। তৃতীয়ত, ডন রেইড (আকস্মিক অভিযান) চালানো এবং সাপ্লাই চেইনের নিয়মিত মনিটরিং, যাতে হোর্ডিং বা কৃত্রিম সংকট ধরা পড়ে। চতুর্থত, আইন সংশোধন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, হোর্ডিং-এর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং ডিজিটাল মার্কেট মনিটরিং সিস্টেম চালু করা। এছাড়া, কৃষকদের সরাসরি বিক্রির সুযোগ বাড়ানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং স্বচ্ছতা ছাড়া এসব কৌশল কার্যকর হবে না।

সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন আমদানি বৃদ্ধি এবং শুল্ক হ্রাসের মতো উদ্যোগগুলো বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বন্দরে পণ্য ছাড়াইয়ের বিলম্ব এবং সাম্প্রতিক ধর্মঘটের প্রভাব কমাতে সরকার কাজ করছে। তবে, ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন যে, নির্বাচন পরবর্তী চাহিদা বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের কারণে দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

সার্বিকভাবে, নতুন সরকারের সামনে রমযানের বাজার নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। যদি দাম নিয়ন্ত্রণে সফল হয়, তাহলে জনগণের আস্থা বাড়বে; অন্যথায় অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। সরকার, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব, যাতে রমযানের আনন্দ অর্থনৈতিক চাপের ছায়ায় না পড়ে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।