ইতিহাস পর্যালোচনায় যে সত্যটি অবধারিত হয়ে ওঠে তা হচ্ছে স্বেচ্ছাচারী জাতি বা স্বৈরাচারী ক্ষমতাশীলদের ধ্বংস অনিবার্য। আর এই ধ্বংসের আরবি শব্দ হচ্ছে “বুরা” যার আভিধানিক অর্থ পতন, নিপাত, নাশ, স্খলন, অবনতি ইত্যাদি। আল কুরআনে সূরা ফাতাহ’র ১২ নাম্বার আয়াতে সে কথাই বলা হয়েছে এভাবে :”বরং তোমরা তো মনে করেছিলে রাসূল সা: এবং মোমিনরা আর কখনো তাদের পরিবার বর্গের কাছে ফিরে আসতে পারবে না। এই ধারণা তোমাদের অন্তরে চমৎকার মনে হয়েছিল। তোমরা চরম নিকৃষ্ট ধারণা করেছিলে। আসলে তোমরা একটি বুরা( অর্থাৎ ধ্বংসমুখী) কওম।” এই আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে ধ্বংসমুখী অর্থাৎ বুরা কওমরা যারা সত্যের পথে থাকে তাদের বিরুদ্ধে সব সময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। বরং এভাবে কিন্তু তারা নিজেদেরই অধঃপতন ডেকে আনে। এ ধরনের চরম বিধ্বংসী শক্তি বা গোষ্ঠীকেই বলা হয় ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিবাদ। যার অর্থ নিপীড়ক, অসহিষ্ণু, অরাজকতাবাদী, গণহত্যাকারী, স্বৈরাচারী। আরবি ভাষায় ফেতনা সৃষ্টি করাই ফ্যাসিস্ট অর্থাৎ যারা ফেতনা কারী তারাই ফ্যাসিবাদী।এ সম্পর্কে আল কুরআন বলছে, “ ফেতনা সৃষ্টি করা হত্যার চাইতেও গুরুতর অপরাধ (২:১৯১)” আসলে ফেতনা সৃষ্টি করা ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ঐতিহাসিক ইয়ানক কেরশোর এর মতে, “ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা জেলীকে পেরেক দেয়ার চেষ্টা করার মতই! “ অর্থাৎ এদের চক্রান্ত বিভিন্ন মুখী-বিভিন্ন ধরনের,একই সময়ে একই সংজ্ঞায় যা নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু যুগে যুগে এই ফ্যাসিবাদীরা বিভিন্ন ছুতায় বা উসিলায় যেভাবেই সত্যপন্থীদেরকে আক্রমণ করে ধ্বংস করার পায়তারা করুক না কেন তাদেরও যে পতন অনিবার্য হয়ে যায়, জেলীর মতোই খন্ড বিখন্ড হয়ে পড়ে তাদের চক্রান্ত কিন্তু তা তাদের বোধগম্যে নেই।

কিন্তু তার জন্য অর্থাৎ ধ্বংসের জন্য আল্লাহতা’লার মেপে দেয়া একটা সময় আছে।যখনি কোন সম্প্রদায় বা কোন জাতি অন্যায়- অশ্লীলতার চরম সীমায় পৌঁছে, পৌঁছে সত্যপন্থীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে , তখনি ঘটে তাদের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি৷ অথচ আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা।শেষ সীমারেখায় আসা পর্যন্ত তার অপেক্ষা করার কোনই প্রয়োজন থাকতে পারেনা, তিনি ইচ্ছা করলে শুরুতেই বা মাঝ পথেই শেষ করে দিতে পারেন। মজলুম বা নির্যাতিতের পক্ষে থেকে আল্লাহ পূর্বেই ঘটিয়ে দিতে পারেন ধ্বংস বা পতন। যুগে যুগে ধ্বংসপ্রাপ্ত এসব জাতির সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন; “কতো যে জনপদ আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি।কারণ সেগুলোর অধিবাসীরা ছিল জালিম। সেসব জনপদ তাদের ঘরের ছাদসহ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। কতো যে কূপ পরিত্যাক্ত হয়েছিল, আরো কত যে সূদৃঢ় প্রাসাদ। ( সুরা আল হজ্জঃ৪৫), পরের আয়াতেই আবার বলেছেন, তারা কি জমিনের বুকে পরিভ্রমন করেনা? আর তাদের যদি আকল ওয়ালা কলব থাকতো এবং শোনার মত কান থাকতো! আর তাদের চোখ তো অন্ধ নয়,মূলতঃ অন্ধ হলো তাদের বুকের মধ্যেকার কলব। আবার বলেছেন৪৮ নং আয়াতে;”কতো যে জালিম জনপদকে আমি অবকাশ দিয়েছি, তারপর তাদের পাকড়াও করেনি। আমার কাছেই হবে তাদের শেষ প্রত্যাবর্তন। আবার একটু পিছিয়ে যদি ঐ সুরাতেই আমরা খুঁজি তাহলে ধ্বংসপ্রাপ্ত সে সব জাতির একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নামও পেয়ে যাব। যেমনঃ ৪২,৪৩,৪৪ নং আয়াতে যথাক্রমে নূহ, সামুদ, আদ, ইব্রাহিম, লুত, মাদায়ীনবাসী, মুসার জাতি অর্থাৎ ফেরাউনের পরিণতি সংক্রান্ত কথা।৪৪নং আয়াতের শেষাংশে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ বলছেনঃ “আমরা কাফিরদের অবকাশ দিয়েছি, তারপর পাকড়াও করেছি। কেমন অসহনীয় ছিল আমার শাস্তি!” এই আয়াতটিই প্রমাণ করে জুলুম নির্যাতনের শেষ সীমায় না পৌঁছা পর্যন্ত আল্লাহ অত্যাচারীকে পাকড়াও করেন না। মূলত: আল কুরআন সে বর্ণনাগুলোই দিয়েছে যুগে যুগে বুরা সম্প্রদায়ের কাহিনী তুলে ধরে, যার মধ্যে একটি রাজনৈতিক শক্তিও প্রচ্ছন্নভাবে কার্যকর । যেমনঃ

( ১) নমরূদ: যখন তৎকালীন মূর্তিপূজকরা ইব্রাহীম আঃকে একত্ববাদের প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারছিল না, এমন কি অসাড়, অক্ষম প্রতিমার ভাস্কর্য নির্মানের সমালোচনা থেকে তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারছিল না, তখন তাঁর আপন পিতাও নমরুদের সাথেই হাত মেলায় ক্ষমতা ও আভিজাত্যের দম্ভে৷ নমরূদ বাহিনী তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে উদ্ধ্যত হলে। আল কুরআনের ভাষায়ঃ “তখন তারা বললো,’’ তোমরা যদি কিছু করতে চাও, তবে একে আগুনে পোড়াও এবং তোমাদের দেব দেবীদের সাহায্য করো। পরের আয়াতেই আল্লাহ বলছেনঃ” আমরা আগুনকে বললাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য সুশীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও৷(সুরাআম্বীয়াঃ৬৮, ৬৯)৷ আল্লাহ কি তাদের এই চক্রান্তের কথা জানতেন না? তিনি কি ইচ্ছে করলে ইব্রাহিমকে আগুনে নিক্ষেপ করার আগেই ঐ আগুন নিভিয়ে দিতে পারতেন না? কিন্তু তিনি তাদেরে অবকাশ দিলেন যদি বা ন্যূনতম বোধোদয় ঘটে নমরূদের পর্ষদের মধ্যেকার কোন একজনের হলেও। কিন্তু না! তারা হয়ে পড়েছিল বিবেকশূন্য।তারা বিশাল গর্তখুড়লো, তাতে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করলো, সে আগুনকে উত্তপ্ত করলো একটা জীবন্ত মানুষকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলার মত করেই নিশ্চিন্ত হয়ে! উপরুন্তু তা জনসমক্ষে চাক্ষুস দেখানোর ব্যবস্থাও করেছিল নিশ্চিত বিশ্বাসে। পৃথিবীর ক্ষমতাধর শাসকদের মধ্যে নমরূদ অন্যতম একজন। তার আয়োজন কি আর রাজকীয় না হয়ে পারে? কিন্তু আল্লাহর বান্দাহকেতো আল্লাহ কিভাবে বাঁচাবেন তা তার পরিকল্পনাতেই ছিল।আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন ইব্রাহিমকে তার দিনের প্রচার-প্রসারের কাজে সমৃদ্ধ করতে। পক্ষান্তরে দাম্ভিক, ঔদ্ধ্যত নাফরমান নমরূদ রাজার মৃত্যু ঘটলো সামান্য একটি মশার আক্রমনে চাকরের জুতা পেটা খেয়ে। সে ইতিহাস কত মর্মান্তিক!

এ ইতিহাস আমাদেরে কী শেখায়? এমন দুর্বৃত্ত স্বৈরাচার যেনো কাল কিয়ামতের দিন আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ না পায়, সে জন্যেই একেবারে ইব্রাহীমকে আগুনে ফেলে দেয়া পর্যন্ত আল্লাহ ধৈর্য ধরেছিলেন। নমরূদ যেনো বলতে না পারে’ আমিতো মনস্থঃ করেছিলাম মাত্র, কার্যতঃ করিনি।সে সুযোগ আর র’লো না।মহান আল্লাহ বলছেনঃ” আমরা যখন কোন জনপদকে বুরা বা হালাক করে দেয়ার এরাদা করি, তখন সেখানকার সীমালংঘনকারীদের ক্ষমতায় বসাই। ফলে তারা সীমালংঘন ও পাপাচারে মত্ত হয়ে ওঠে।তখন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ফায়সালা বাস্তব সম্মত হয়ে যায়। ফলে আমরা সেই জনপদকে ধ্বংস ও বিরান করে দেই।(সুরা বনিইসরাইলঃ১৬) —এটিই হলো আল্লাহর রীতি৷

(২) সামুদ জাতির দিকে তাকালে আমরা তা ই দেখবো। তাদের নবী ছিল হিজর অঞ্চলের সালেহ আলাইহিস সালাম । সামুদ জাতি ছিল খুবই বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী একটি জাতি। তারা পাথর কেটে কেটে বিরাট অট্রালিকা, প্রাসাদ ও বসত বাড়ী বানাতো। তাদের ক্ষমতার আস্ফালন এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, তারা সৃষ্টিকর্তা যে একজন আছেন তাও ভুলে গিয়েছিল। এমন কি নবী সালেহ আঃ এর দাওয়াত দানকে রীতিমত প্রত্যাখ্যান করছিল।সালেহ আঃ বলেছিলেন, “ তোমরাতো দক্ষতার সাথে(যা আল্লাহর দান) পাহাড় কেটে আবাস নির্মান করছো।অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার(নবীর) আনুগত্য করো। সীমালঙ্ঘনকারীদের হুকুম মত চলো ন্এারা দেশে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে এবং কোন প্রকার সংশোধনের কাজ করছে না। (সুরা আশ শোয়ারাঃ১৪৯—১৫২) কিন্তু তাদের গোয়ার্তুমি ও হটকারিতা এক পর্যায়ে নবী সালেহ আঃকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে নিয়ে এলো।তারা দাবী করলো একটা আসমানী প্রমান নিয়ে আসার।নবীজী আল্লাহর কাছে চেয়ে সত্যিই একটি নিদর্শন এনে দিলেন; ‘একটি বেহেশতী উট৷ স্বভাবতঃই তিনি শর্ত দিলেন যা আলকোরআনে বর্ণিতঃ “ তখন সে বলেছিল,” প্রমাণ হলো এই লাল উটনী। কুয়োর পানি পানে এর জন্যও পালা থাকবে।তোমাদের জন্যও পালা থাকবে নির্দিষ্ট দিনে। এর ক্ষতি করার উদ্দেশ্য তোমরা একে স্পর্শও করোনা, করলে তোমাদেরে পাকড়াও করবে এক মহাদিবসের আযাব।(সুরা আশ শোয়ারাঃ১৫৫-১৫৬)” কিন্তু সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার কারী দাম্ভিক সে সম্প্রদায় উন্মত্ত হয়ে উঠলো আল্লাহর সে নিদর্শনকে অস্বীকার করতে।বিশেষ করে তাদের যে নেতা ছিল সে একরকম চ্যালেঞ্জেই নেমে পড়লো। আলকোরআনের বর্ণনা মতেঃ” সেই শহরে ছিল নয় ব্যক্তি (নেতা) যারা দেশে ফাসাদ সৃষ্টি করতো এবং সংশোধন হতো না। তারা বলেছিল, তোমরা নিজেদের মধ্যে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলো; আমরা অবশ্যি রাতের বেলায় তাকে(সালেহকে) এবং তার পরিবারবর্গকে আক্রমন করে হত্যা করবো, তারপর তার অলিকে বলবো, তার পরিবার বর্গকে হত্যা কারা করেছে তা আমরা দেখিনি।আমরা অবশ্যি সত্যবাদী।তারা এই জঘন্য চক্রান্ত করছিল, আর এদিকে আমরাও করেছি একটি কৌশল যা তারা টেরই পায়নি।অতঃপর লক্ষ্য করে দেখ! তাদের চক্রান্তের পরিণতী কী হয়েছে? আমরা তাদেরকে তাদের গোটা জাতি সহ ধ্বংস করে দিয়েছি।ঐতো তাদের ঘরবাড়ি বিরাণ হয়ে আছে তাদের যুলুমের পরিণতিতে।নিশ্চয়ই এতে রয়েছে একটি নিদর্শন জ্ঞানী লোকদের জন্যে।আমরা সেই অশুভ পরিণতি থেকে নাজাত দিয়েছিলাম তাদেরকে যারা ঈমান এনেছিল এবংঅবলম্বন করেছিল তাকওয়া।( সুরা আননামলঃ৪৮—৫৩)”

মূলতঃ সালেহ আঃ এর ক্রমাগত নিষেধ ও সতর্ক বার্তাকে উপেক্ষা করেই ঐ দাম্ভিক, পাপী ব্যক্তিটি সদলবলে সালেহ আঃ এর নবুওয়াতীর নিদর্শন স্বরূপ প্রেরিত উটনীটিকে হত্যা করে ফেললো। অথচ তারাই সত্য প্রমাণের অযুহাত দিয়ে , সালেহ আঃর নবুওয়াতীর প্রমান দর্শন স্বরূপ এই বেহেশতী নিদর্শন উটনীটিকে আনিয়েছিল। কিন্তু মিথ্যা ও হটকারিতা তাদেরে এতটাই অন্ধ করে ফেলেছিল যে তাদের ভেতরে আল্লাহ সম্পর্কে ভয়ের লেশ মাত্র ছিল না।পাঠক! আল্লাহ কি ঠেকাতে পারতেন না এই অন্যায় হত্যা? কিন্তু না। তিনি ছেড়ে দিলেন তার অর্থাৎ সেই দুষ্ট লোকটির সর্বশেষ শক্তিটি প্রোয়োগ করার সুযোগ দিয়ে।কিন্তু আল্লাহ ছাড় দিয়েছিলেন ছেড়ে দেননি। আল্লাহর ওয়াদামত প্রচন্ড এক ভূমিকম্প যাতে ছিল প্রকট এক শব্দ বা ভয়ংকর এক যাকে ইতিহাসের ভাষায় বলা হয় সাঈহা। তা ই তাদেরে নিঃসাড় করে দিল, পৃথিবীর বুক থেকে তারা চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল । আলকোরআনের ভাষায়ঃ “কিন্তু তারা রাসূলকে অস্বীকার করলো এবং হত্যা করলো উটনীকে।ফলে তাদের প্রভূ তাদের উপর চাপিয়ে দিলেন চরম ধ্বংস তাদের অপরাধের কারণে এবং ধ্বংস স্তুপের মধ্যে সমান করে রেখে দিলেন তাদেরে।( সুরা আশশামসঃ১৪)” আরো বলেছেন সুরা আশশোয়ারার ১৫৮,নং আয়াতেও। আর তাদের গ্রাস করলো আযাব। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে একটি নিদর্শন, আর তাদের অধিকাংশই মুমিন ছিল না।“ এ ঘটনার বিশ্লেষণে আমরা বুঝতে পারি অন্যায় কারীরা সব সময়ই দূষ্কৃতিকারী, ষড়যন্ত্রকারী , চক্রান্তকারী ও দাম্ভিক, ঔদ্ধ্যত হয়ে থাকে৷ তারা কখনো সত্যাশ্রয়ী ও অনুগত অর্থাৎ মোমিন হয় ন্ াআর আল্লাহ সুবহানুতা’লা মুমিনদেরকে পাকড়াও করেন না বরং হেফাজাত করে থাকেন নিজ কৌশলে৷

(৩) ফেরাউনের পরিণতি সম্পর্কে কে না জানে। দাম্ভিক ফেরাউন ফ্যাসিবাদের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল তার ঔদ্ধত ও অহংকারে। ফলে আপন স্ত্রী সহ প্রাণের সন্তানদেরকেও কঠিন শাস্তি দিয়ে অমানুসিক ভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি। একটাই দাবি সেই একমাত্র ক্ষমতাধর। তার উপর আর কেউ নেই।এজন্য আল্লাহ কে অস্বীকার করতেও সে কুণ্ঠিত নয়। আর এজন্যই সত্য পথের দিশারী মুসা আলাই সালাম এর পেছনে সে লেগে গেল। আল কুরআনের আলোকে ফেরাউন কেন হযরত মূসা (আ.)–এর বিরোধিতা করেছিল, তার মূল কারণগুলো ছিল: ফেরাউন নিজেকে মিসরের সর্বময় শাসক মনে করত।

মূসা (আ.) যখন আল্লাহর একত্ববাদ ও ন্যায়ের দাওয়াত নিয়ে এলেন, তখন ফেরাউন আশঙ্কা করল এতে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্তৃত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। সে বলল, “আমি কি মিসরের রাজত্বের মালিক নই?”সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১।অর্থাৎ, সে আল্লাহর হুকুম নয় নিজের ক্ষমতাকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করত। ফেরাউনের সবচেয়ে বড় রোগ ছিল অহংকার। সে আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেকে বড় ভাবত এবং সত্য মেনে নিতে অস্বীকার করত। “নিশ্চয়ই ফেরাউন জমিনে অহংকার করেছিল।” সূরা ইউনুস ১০:৭৫।এই অহংকারই তাকে সত্য অস্বীকারে ঠেলে দেয়। উপরন্তু ফেরাউন শুধু শাসকই নয়, বরং নিজেকে উপাস্য বা ইলাহ হিসেবেও দাবি করে বসে। ফলে সে মুসা আসলাম কে সহ্য করতে পারেনি কারণ মূসা (আ.)–এর তাওহীদের দাওয়াত ছিল তার এই ভ্রান্ত দাবির সরাসরি বিরোধী। প্রমাণ সূরা আন নাযিয়াত এর ২৪নং আয়াত। যেখানে উদ্ধৃত আছে, “আমি তোমাদের সর্বোচ্চ প্রভু।” মূসা (আ.) এসেছিলেন বনী ইসরাইলকে দাসত্ব ও নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে। ফেরাউন চেয়েছিল তাদের দমন করে রাখতে, “তুমি কি আমাদেরকে পূর্বপুরুষদের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে এসেছ” সূরা ত্বা-হা ২০:৬। কেননা সে বুঝেছিল, এই দাওয়াত সফল হলে তার শোষণব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ফেরাউন আল্লাহর নিদর্শনগুলো দেখেও সেগুলোকে অস্বীকার করে জাদু বলে চালিয়ে দেয়। সে বলে, “এ তো এক সুস্পষ্ট জাদুকর।” সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৩৪।কারণ সত্য স্বীকার করলে তাকে নিজের ভুল মানতে হতো যা অহংকারের কারণে সে পারেনি। ফেরাউন দীর্ঘদিন ধরে জুলুম করে আসছিল৷ যেমন:শিশু হত্যা, নারীদের জীবিত রাখা,জনগণকে শ্রেণিভেদে বিভক্ত করা। সমাজে উঁচু-নিচু শ্রেণী তৈরি করা। ফলে আল কুরআন বলছে, “নিশ্চয়ই সে সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সূরা আল-কাসাস ২৮:৪”৷ মূলত:এই জুলুমের জীবনধারা তাকে হিদায়াত থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ফেরাউনের এই ধরনের অত্যাচার, নিপিড়ন, দাম্ভিকতা শেষ পর্যন্ত তাকে মুসা আ: এর পিছু ধাওয়া করে নীলনদ পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু পরিণতি কি হলো? দেখা গেল মুসা আ: সঙ্গীদেরকে নিয়ে মহান আল্লাহর অসীম কৃপায় মাঝ দরিয়ার মধ্য দিয়েই কুদরতি রাস্তা দিয়ে পার হয়ে যেতে পারলেন পক্ষান্তরে ফেরাউন তার সমস্ত বাহিনী নিয়ে ডুবে মরল সেই দরিয়াতেই। সে সময় সে তওবা করতেও চেষ্টা করেছিল কিন্তু আল্লাহর ফেরেশতারা তাকে আর সে সুযোগ দেয়নি অর্থাৎ তার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটিয়ে ছাড়লেন মহান প্রভু। একের পর এক সুযোগ দিয়ে ধৈর্য ধরে মহান আল্লাহ এভাবেই তার করুন পরিণতি ঘটিয়ে দিলেন।

এরকম আরো অনেক ঘটনা অর্থাৎ বুরা৷ সম্প্রদায়ের কাহিনী আল-কুরআনে বর্ণিত আছে। এখানে মাত্র এ ক’টি ঘটনা তুলে ধরা হলো যা থেকে বেশ কিছু শিক্ষনীয় দিক তুলে ধরা যায়।

১. আল্লাহ সবচেয়ে তুচ্ছ সৃষ্টির মাধ্যমেও জালিমকে ধ্বংস করতে পারেন

তাফসির অনুযায়ী, নমরুদকে ধ্বংস করা হয়েছিল একটি ক্ষুদ্র মশার মাধ্যমে।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মশা বা তার চেয়েও তুচ্ছ কিছুর উদাহরণ দিতে লজ্জাবোধ করেন না।”

— সূরা আল-বাকারা:২৬

২.সত্যের যুক্তি শেষ পর্যন্ত মিথ্যাকে পরাজিত করে।

ইবরাহীম (আ.) যখন সূর্য ওঠানামার যুক্তি দিলেন, নমরুদ নিরুত্তর হয়ে গেল।

“তখন কাফির হতবাক হয়ে গেল।”

— সূরা আল-বাকারা :২৫৮

৩.ইতিহাসে জালিমদের নাম ঘৃণার সাথে উচ্চারিত হয় আজ নমরুদের নাম উচ্চারিত হয় উদাহরণ হিসেবে নয় অহংকার এর প্রতীক হিসেবে।

এভাবেই আমরা জালিমদের পরিণতি সম্পন্ন করি।”

— সূরা কাসাস :৪০

৪. আল্লাহর নিদর্শন অবহেলা করলে ধ্বংস অনিবার্য

উটনী ছিল স্পষ্ট মু‘জিযা, তবুও তারা অবহেলা ও বিদ্রূপ করেছিল।

তারা নিদর্শনগুলো অস্বীকার করেছিল।”

— সূরা আশ-শামস:১৪

৫. শক্তি, প্রযুক্তি ও সভ্যতা আল্লাহর আযাব ঠেকাতে পারে না।

পাহাড় কেটে ঘর বানানো সত্ত্বেও তারা (সামুদ জাতি) রক্ষা পায়নি।

“ তোমরা পাহাড়ে নিরাপদে ঘর নির্মাণ কর।”

— সূরা আল-হিজর :৮২

৬. নবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চরম পরিণতি ডেকে আনে

তারা সালিহ (আ.)– কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল।

তারা কৌশল করেছিল, আর আমিও কৌশল করলাম।” — সূরা নামল :৫০

৭. পাপের সিদ্ধান্তে অংশীদারী সবার পরিণতিই এক।

উটনী হত্যা একজন করলেও পুরো জাতি শাস্তি পেয়েছে।

“তারা( সমাজের ক্ষমতাধর নয় জন ) উটনীকে হত্যা করল।”

— সূরা আশ-শামস :১৪

৮. সতর্কবার্তা উপেক্ষা করলে আর সুযোগ থাকে না

তাদেরকে তিন দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল, তবুও তারা তাওবা করেনি।

“ তোমরা তোমাদের ঘরে তিন দিন উপভোগ কর।” — সূরা হূদ :৬৫

৯. অহংকার মানুষকে সত্য থেকে অন্ধ করে দেয় ফলে সে আর হেদায়েতের পথ পায় না।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।” — সূরা নাহল :২৩

১০. ক্ষমতা ও নেতৃত্ব আল্লাহর আমানত, তাই করতে হবে ন্যায় বিচার।

ফেরাউন ক্ষমতাকে নিজের বলে মনে করেছিল, তাই জুলুম করেছে।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের সফল করেন না।” — সূরা আন‘আম :২১

১১. সত্যকে অস্বীকার করা দাম্ভিকতার প্রকাশ।

ফেরাউন মূসা (আ.)এর মুজিযাকে “জাদু” বলেছিল।

“তারা জুলুম ও অহংকারবশত: তা অস্বীকার করেছিল।” — সূরা নামল :১৪

১২. আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যশীল মুমিনদের সাথেই থাকে।

বনী ইসরাইল দুর্বল ছিল, কিন্তু আল্লাহ তাদের সাহায্য করেছেন।

“নিশ্চয়ই পৃথিবীর উত্তরাধিকার আমার সৎ বান্দারাই পাবে।”

— সূরা আম্বিয়া :১০৫

১৩. জুলুমের সময়সীমা আছে

ফেরাউন দীর্ঘদিন জুলুম করেছিল, কিন্তু শেষ রক্ষা পায়নি।

“তোমার রব যখন জনপদগুলোকে পাকড়াও করেনতা অত্যন্ত কঠোর।”

— সূরা হূদ:১০২

১৪. মৃত্যুর মুহূর্তের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়

ফেরাউন ডুবে যাওয়ার সময় ঈমানের দাবি করেছিল, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি।

“এখন? অথচ পূর্বে তুমি অবাধ্যতা করেছিলে!”

— সূরা ইউনুস :৯১

১৫. তাওহীদই সব সংঘাতের মূল সত্য এবং মিথ্যা কর্তৃত্ব দূরীভূত করণের হাতিয়ার।

ফেরাউন বনাম মূসা (আ.)–এর মূল দ্বন্দ্ব ছিল—

কে প্রভু? মানুষ না আল্লাহ?

“নিশ্চয়ই তোমাদের ইলাহ এক আল্লাহ। “

—-সূরা তো-হা :৯৮

এই সবগুলো বৈশিষ্ট্যকে এক করে যদি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে দেখি, তবে দেখা যাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে এই পর্যন্ত এদেশেও ছিল ফ্যাসিবাদ তথা স্বৈরাচারের আস্তানা। এবং তাদের পরিণতি কী হয়েছিল তাও জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। সম্প্রতি খুবই করুন ভাবে ঘটে গেল ৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের অকল্পনীয় কাহিনী। কিন্তু এরপরেও যদি সেই একই বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরো কোন জাতি বা সম্প্রদায় বা দল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে তবে তার পরিণতিয় হবে তথৈবচ। একথা স্মরণে রেখেই আবারও আমাদের মনে রাখতে হবে :—

১/ ফ্যাসিবাদীরা সব সময় ক্ষমতা হারানোর ভয়ে কম্পিত থাকে।

২/ তারা চরম অহংকারী ও ঔদ্ধত স্বভাবী হয়ে থাকে।

৩/ তারা আল্লাহর ক্ষমতার কথা ভুলে যায়, নিজেকেই সর্বময় ক্ষমতাধারী মনে করে।

৪/ শোষণ ব্যবস্থা জিইয়ে রাখার জন্য যেকোনো অজুহাত খোঁজে।

৫/ সদাই সত্য অস্বীকারের প্রচেষ্টা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে থাকে।

৬/ যেকোনো দুর্বৃত্তায়নে তারা লাগামহীন হয়ে পড়ে।

“দুর্ভাগ্য! তারপরেও এদের বোধয় হবে না! তারা ক্ষমতার লোভে নতুন শক্তি অর্জনের চক্রান্তে বিদেশি শক্তির সাথে হাত মেলাতেও দ্বিধাবোধ করবে না। তাতে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব থাকুক কি না থাকুক! অথচ অন্যায়ের পতন অবশ্যম্ভাবী এ কথা তারা ভুলেই বসে আছে।”—-জাতি আর এমন চিত্র দেখতে চায় না। চায়না বুরা সম্প্রদায়ের খেতাব পেতে।