বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংগ্রাম নিজেই সংগ্রামের মধ্যে লিপ্ত এবং সংগ্রাম এই ধরনের একটি গণমাধ্যম। আমার দেখা মতে তার জন্ম থেকে শুরু করে এ যাবৎকাল সংগ্রাম চেষ্টা করেছে সত্য এবং সুন্দরকে তুলে ধরতে, অসত্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। যেটা সংবাদপত্রের ভাষায় বলা হয়, কালোকে কালো বলা, সাদাকে সাদা বলা, সেই কাজটা সংগ্রাম করে এসেছে। এই কাজ করতে গিয়ে সংগ্রামের পথচলা আমাদের দেখা অনুযায়ী খুব মসৃণ ছিল না। তিনি বলেন, আমরা ৫১ বছরের মাথায় এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সংগ্রামকে বাংলাদেশ মিডিয়া জগতের একটা পিলার হিসেবে দেখতে চাই। একটা মজবুত পিলার হিসেবে সংগ্রাম যেন নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করতে পারে। সত্য সন্ধানী পাঠকদের পিপাসা নিবারণের একটা ঠিকানা হিসেবে দেখতে চাই।
দৈনিক সংগ্রাম এর ৫১ বছর পূর্তি উপলক্ষে মগবাজারস্থ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি ৫১ বছরে সংগ্রামের পথচলা নিয়ে মূল্যায়ণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা, আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে তার স্বপ্নের কথা তিনি তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, দৈনিক সংগ্রামের বার্তা সম্পাদক সামছুল আরেফীন।
দৈনিক সংগ্রাম : দৈনিক সংগ্রাম-এর ৫১ বছর পূর্ণ হলো। দৈনিক সংগ্রামের অবদানকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
ডা. শফিকুর রহমান : আলহামদুলিল্লাহ, বাংলাদেশে যে কয়টা প্রাচীন গণমাধ্যম আছে এর মাঝে সংগ্রামকে বলতে হবে লিডিং পজিশনে।
সংগ্রামের আগেও ছিলো কিছু পত্রিকা পরেও জন্ম হয়েছে অনেকের কিন্তু অনেক পত্রিকা সারভাইভ করে নাই। সময়ের ব্যবধানে অনেক পত্রিকা উধাও হয়ে গেছে। টিকতে পারেনি তারা। আবার দুই একটা পত্রিকা যারা টিকে আছে তারা অনেক সংগ্রাম করেই টিকে আছে। সংগ্রাম নিজেই সংগ্রামের মধ্যে লিপ্ত এবং সংগ্রাম এই ধরনের একটি গণমাধ্যম।
আমার দেখা মতে তার জন্ম থেকে শুরু করে এ যাবৎকাল সংগ্রাম চেষ্টা করেছে সত্য এবং সুন্দরকে তুলে ধরতে, অসত্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে।
যেটা সংবাদপত্রের ভাষায় বলা হয়, কালোকে কালো বলা, সাদাকে সাদা বলা, সেই কাজটা সংগ্রাম করে এসেছে। এই কাজ করতে গিয়ে সংগ্রামের পথচলা আমাদের দেখা অনুযায়ী খুব মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন সময় সংগ্রামের উপরে আঘাত এসেছে, বিশেষ করে রাষ্ট্র যন্ত্রের পক্ষ থেকে, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যে সমস্ত ব্যাড এলিমেন্ট আছে তাদের পক্ষ থেকে। যেটা আমরা বিগত সরকারের আমলে কঠিনভাবে লক্ষ্য করেছি। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, বাংলাদেশের সবচাইতে প্রবীণ সম্পাদক জনাব আবুল আসাদ সাহেব, তার সাথে যে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়েছে, একটা মিডিয়া হাউসে ঢুকে তার রুমে গিয়ে এটা আসলে ক্ষমার যোগ্য না। তবে যারা এই কাজ করেছে ইতিমধ্যে তারা তাদের কিছু প্রাপ্তি পেয়ে গেছে। বাকিটা কি হবে আল্লাহ ভালো জানেন। কিন্তু সংগ্রাম তার অবস্থান থেকে এক চুল পরিমাণ নড়ে নি। ওই দিন তারা চেয়েছিল গায়ের জোরে সংগ্রামকে বন্ধ করে দিতে কিন্তু পারেনি।
সংগ্রাম তার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিল শত চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে। এই যে সত্যের উপর অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এটাই তো সংবাদপত্রের চরিত্র হওয়ার কথা। আনফরচুনেটলি অনেক গণমাধ্যমেই এই চরিত্রটা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে নি। বরঞ্চ সময় বদলানোর সাথে সাথে নিজেরা বদলে যায়। সংগ্রাম তার অবস্থানে সুদৃঢ় আছে। এবং জাতিকে তার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ টা দিয়ে যাচ্ছে।
সংগ্রামের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যে পাঠক প্রিয়তার দিকে মনতো দিবেনই, তার চাইতে বেশি সত্যনির্ভর হয়ে চলার অবিচল শপথ নিয়ে সংগ্রামকে টিকে থাকতে হবে এবং এর মাধ্যমে পাঠক যা পাবে এটাই হবে অথেন্টিক।
পাঠকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ এমন চটকদার সংবাদমাধ্যম আছে, যারা সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশ্রণ করে ফেলে, গুলিয়ে ফেলে। আপনি সেই গণমাধ্যমে গেলে পুরা সত্যটা হয়তো পাবেন না। কিন্তু আমরা আশা করি, সংগ্রাম থেকে কোন নিউজ যদি কেউ পায়, কোন তথ্য যদি পায় সেটা সত্যনির্ভর হবে।
জাতির প্রতি সংগ্রামের যেমন একটা দায়বোধ আছে, ঠিক এই সংগ্রামকে ভালোবাসার একটা জায়গা পাঠকের মনে তৈরি হোক সেটা আমরা চাই। এভাবে যদি সত্যসন্ধানী গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করা হয়, তাহলে নতুন নতুন আরো এই ধরনের ভালো গণমাধ্যম দেশে তৈরি হবে। তবে সংগ্রামের প্রতি এটাও আমাদের প্রত্যাশা যে, সংগ্রাম তার মানকে অব্যাহত ভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
দৈনিক সংগ্রাম : আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পনা কী?
ডা. শফিকুর রহমান : ইনশাল্লাহ পরিকল্পনা তো আমরা আমাদের শুধু বক্তব্যে না, আমাদের আচরণেই জাতির সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
কার্যত আমাদের জাতি এখন সবচাইতে বড় যে সমস্যায় ভুগছে সেটি হল আস্থার অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। একটা আরেকটার সাথে জড়িত। আস্থার অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব যে কারণে সেই কারণটা হচ্ছে রাজনীতিতে দুর্নীতির ব্যবসা। কিছু লোক রাজনীতিকে নিজেদের ব্যবসার পণ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এজন্য তারা মানবিক মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে এমন কিছু কর্মকাণ্ড করেন, যাতে গোটা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসা করতে গিয়ে তারা সাধারণ মানুষের টাকা নয় ছয় করেন।
সে টাকাগুলো আবার দেশের বাইরে তারা অন্যায় ভাবে অবৈধ পথে পাঠিয়ে দেয়। এর দ্বারা উন্নত দেশগুলো লাভবান হচ্ছে কিন্তু আমাদের মত একটা স্বল্পোন্নত দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পলিটিক্যাল কালচারের জায়গাটা আমরা পরিবর্তন করে দায়বোধ সম্পন্ন রাজনীতির ধারা বাংলাদেশে চালু করতে চাই।
রাজনৈতিক পক্ষের সমস্ত কমিটমেন্ট অবশ্যই ফুলফিল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে এবং জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। এখন সেই দায়বদ্ধতার জায়গাটা নেই। ফ্যাসিবাদ বিদায় নেই, ফ্যাসিবাদের একটা অংশ বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের অনেক আলামত এখনো সমাজে রয়ে গেছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, বিচারকে প্রভাবিত করা, বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাস কায়েম করা, বিভিন্নস্থানে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, ভয়ভীতি দেখানো; সবইতো বিদ্যমান রয়ে গেছে।
আমরা এইগুলো নির্মূল করতে চাই। আমরা চাই মানুষের জীবন, সম্পদ এবং সম্মানের নিরাপত্তা বিধান করতে, আমরা চাই মানুষের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, তাদের দক্ষতা এবং দক্ষতা দিয়ে জাতি গঠনে অবদান যেমন রাখবে বিশ্বের দরবারে যেখানেই যাবে সেখানেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
আমরা আমাদের জাতির একজন মানুষকে আর আনস্কিল দেখতে চাই না। কিন্তু এটা ঠিক যে এটা একদিনে হয়ে যাবে না। এই প্রক্রিয়া শুরু করলে একটা সময় গিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছা যাবে। আমরা এই কাজটা শুরু করতে চাই। দক্ষতার সাথে নৈতিকতা মিশিয়ে বাংলাদেশের জন্য আমরা সম্ভাবনাময় নাগরিক তৈরি করতে চাই। যারা নিজ হাতে এই দেশটাকে গড়বেন। এখানে নারী-পুরুষ সকলেরই অংশগ্রহণ থাকবে।
কারণ একটা সমাজ নারী-পুরুষের সম্মিলনে গড়ে ওঠে। এখানে কাউকে বাদ দিয়ে বা ছোট করে কোন সমাজ টেকসই হবে না। আমরা শিক্ষার এই জায়গাটা, দক্ষতা তৈরির এই জায়গাটা, নৈতিকতার এই জায়গাটা, মানুষের কর্মসংস্থানের এই জায়গাটা সম্মানের সাথে মানুষের হাতে আমরা তুলে দিতে চাই। আমরা বেকার ভাতা প্রচলনেরও পক্ষে নই। কারণ বেকার ভাতা মানুষকে আরো বেকার বানানোর দিকে উৎসাহিত করবে।
আমরা তো বেকার দেখতে চাই না। আমাদের প্রত্যেকটা যুবককে সম্মানের জায়গায় কাজ দেখতে পাই এবং আমরা এই জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে আমাদের যুবসমাজকে আমরা ধারণ করব, সে ছেলে হোক মেয়ে হোক তার যোগ্যতা অনুযায়ী সে যেন তার কাজটা পেয়ে যায় এবং সম্মানের সাথে জাতি গঠনে সে যেন অবদান রাখতে পারে।
সামনে নির্বাচন। দোয়া করেন, -এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটা দুয়ার উন্মুক্ত হোক, যাতে জাতির সামনে নতুন মুক্তির আলো দেখা দেয়।
দৈনিক সংগ্রাম : দৈনিক সংগ্রাম ৫১ বছর পূর্তিতে আপনার প্রত্যাশা কী?
ডা. শফিকুর রহমান : আমরা ৫১ বছরের মাথায় এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংগ্রামকে বাংলাদেশ মিডিয়া জগতের একটা পিলার হিসেবে দেখতে চাই। একটা মজবুত পিলার হিসেবে সংগ্রাম যেন নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করতে পারে। সত্য সন্ধানী পাঠকদের পিপাসা নিবারণের একটা ঠিকানা হিসেবে দেখতে চাই। সর্বশেষ তথ্যটি যত তড়িৎ সম্ভব অফলাইন অনলাইন দুটোতেই সংগ্রাম পরিবেশন করবে, পাঠককে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য এটা আমরা প্রত্যাশা করছি।
সংগ্রাম এবং সংগ্রাম সংশ্লিষ্ট যারা আছেন সংগ্রাম পরিবারের সবাইকে আমরা এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অগ্রীম অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং সংগ্রামের পাঠকদের কে আমরা মোবারকবাদ জানাচ্ছি।
দৈনিক সংগ্রাম : ব্যস্ততার মধ্যেও দৈনিক সংগ্রামকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ডা. শফিকুর রহমান : আপনি এবং আপনার টিমকে ধন্যবাদ।