ওসমান হাদীকে বোঝা মানে কেবল একজন ব্যক্তিমানুষকে বোঝা নয়; বরং আধিপত্য ও প্রতিরোধের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বকে পাঠ করা। তিনি কোনো ঘটনাচক্রে আবির্ভূত চরিত্র ননÑ হাসিনার জুলুমতন্ত্রের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা ইতিহাসের সেই অনিবার্য সত্তা, যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের মুহূর্তে প্রান্তের নৈতিকতাকে উচ্চারণ করেন। হাদী তাই একজন মানুষ হওয়ার আগে একটি অবস্থান-একটি epistemic stance, যা আধিপত্যবাদী বয়ানের ভেতরে দাঁড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করে। যিনি একাধারে ভারতীয় আধিপত্যবাদ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও শাহবাগী কালচারাল গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন আমৃত্যু। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষে প্রতিষ্ঠা করেছেন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ।

ওসমান হাদী জন্মগ্রহণ করেন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায়, এক ধর্মপরায়ণ মুসলিম পরিবারে। তার বাবা ছিলেন একজন মাদরাসা শিক্ষক ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম- যার জীবনচর্চা, নৈতিক দৃঢ়তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা হাদীর মানসগঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হাদী শৈশব থেকেই দেখেছেন শাসন নয়, দায়িত্বের উদাহরণ; ক্ষমতা নয়, নৈতিকতার অনুশীলন। হাদীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের শুরু নলছিটির একটি মাদরাসায়। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর তিনি চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন ঝালকাঠি এন. এস. কামিল মাদরাসায়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবন নিয়ে প্রশ্ন করার বোধ তার মধ্যে ক্রমশ গড়ে ওঠে সেখানে। আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর সেই প্রশ্নবোধ তাকে নিয়ে যায় উচ্চতর শিক্ষার ভিন্ন এক পরিসরেÑঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। এখানেই তার চিন্তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়; রাষ্ট্র, ক্ষমতা, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক ন্যায়ের ধারণা হয়ে ওঠে তার মননচর্চার কেন্দ্রে।

জুলাই আন্দোলনের সময় ওসমান হাদী কেবল দর্শক ছিলেন না; তিনি স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এবং রামপুরা এলাকার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। রাজপথ, সংগঠন ও মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণÑএই তিনের সম্মিলনেই তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন। তার কাছে আন্দোলন মানে ছিল দায়িত্ব নেওয়া, আর নেতৃত্ব মানে ছিল সামনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকি বহন করা। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলনেরও অগ্রসেনানী ছিলেন তিনি। ওই আন্দোলনে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’কে “ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি” ব্যানারের অধীন সংগঠনগুলোর একটি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে হাদীর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও দৃশ্যমান। এটি তার রাজনৈতিক সক্রিয়তার এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হয়।

তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন-মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত-থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। শরিফ ওসমান হাদী নামে দেওয়া সেই ঘোষণার ভাষাও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে এলাকাবাসীর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের আহ্বান জানান এবং রাজনীতিকে জনতার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস হিসেবে আয়োজনের কথা বলেন-“চা-সিঙ্গারা, মুড়ি-বাতাসা, কলা-পাউরুটি’র আড্ডা। নির্বাচনী এলাকা ঘুরে বেড়ান ভ্যানে চড়ে। প্রতিদিন ফজরের পর দাঁড়িয়ে যান কোনো এক মসজিদের গেইটে কিংবা বিকেলে পার্কের প্রবেশমুখে- কথা বলেন সাধারণ মানুষের সাথে, হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলির মাঝে কখন যে সাধারণ মানুষ তার পকেটে টাকা গুঁজে দেয় বুঝা মুশকিল। ভালোবাসার এই নিদর্শন স্থানীয় গণমাধ্যমে আলোচিত হয় এবং রাজনীতিকে অভিজাত পরিসর থেকে টেনে এনে সাধারণ মানুষের উঠোনে দাঁড় করানোর এক প্রতীকী প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত হয়। ওসমান হাদীর জীবনপথ তাই কেবল ব্যক্তিগত উত্তরণের গল্প নয়; এটি শিক্ষা, আন্দোলন ও জনসংযোগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক রাজনৈতিক চেতনার বিবর্তনÑযেখানে শিকড় গ্রামে, শিক্ষা নগরে, আর অবস্থান মানুষের পাশে। তার নির্বাচনী মেনিফেস্টো ছিল- ইনসাফ, সততা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। দোয়া-দরুদ আর মিলাদ পড়ে তার নির্বাচনী ‘বিসমিল্লাহ’ ছিল ব্যতিক্রমী আকর্ষণ।

আধিপত্যবাদ মূলত একটি দার্শনিক কাঠামোÑযেখানে ক্ষমতা নিজেকে স্বাভাবিক, অনিবার্য ও ন্যায়সঙ্গত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এটি কেবল বাহ্যিক শাসন নয়; এটি চিন্তার ওপর শাসন, ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতির ওপর দখল। আধিপত্যবাদ সত্যকে উৎপাদন করে, ইতিহাসকে বাছাই করে, আর নীরবতাকে শৃঙ্খলা হিসেবে উপস্থাপন করে। এই কাঠামোর ভেতরে ওসমান হাদী হয়ে ওঠেন এক ব্যতিক্রমী চেতনাÑযিনি এই ‘স্বাভাবিকতা’র ভেতরেই অস্বাভাবিক প্রশ্নটি ছুড়ে দেন: কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কার পক্ষে, আর কাদের বাদ দিয়ে? যারা বাংলাদেশে বসবাস করে বাংলাদেশ বিরোধী বয়ান উৎপাদনে অগ্রগামী, যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদকে চিন্তায়, ভাষায়, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে নরমালাইজ করার আপ্রাণ চেষ্টা গত দেড়যুগ ধরে করে আসছে তাদের অপরাজনীতির বিপরীতে হাদী বাংলাদেশপন্থী- শির দাঁড়া করে আলিফের মত দাঁড়িয়ে থাকা এক বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। তাইতো ক্ষেপে যায় শাহাবাগী কালচারাল ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী। তাকে হত্যাযোগ্য করার নানা অপকৌশল টকশোতে হাজির করে এই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী গোষ্ঠী। এটা তাদের পুরোনো খেল। সেই ২০১৩ সালে ‘রাজাকার রাজাকার’ ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে এই দেশের ইসলামপন্থীদের হত্যাযোগ্য করে তোলার নিকৃষ্ট মব ছিল ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে শাহবাগের আন্দোলন। যেটা হাসিনার ফ্যাসিবাদকে প্রলম্বিত করতে উস্কানি দিয়েছে। দেশে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের বৈধতা উৎপাদন করেছে। আর ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ সুগম করেছে। পরবর্তীতে যারাই এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছে প্রত্যেককেই কোনো না কোনো ভাবেই হত্যা করেছে এই দানব গোষ্ঠী। আবরার ফাহাদের পর এই সিলসিলার অন্যতম বীর শহীদ ওসমান হাদী।

হাদীর প্রতিবাদ ছিল কোনো আবেগী উচ্চারণ নয়; এটি ছিল এক ধরনের নৈতিক যুক্তিবাদ। তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র সহিংসতা নয়Ñবরং সম্মতি। মানুষ যখন আধিপত্যকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তখনই শাসন পূর্ণতা পায়। পথ খুলে যায় ফ্যাসিবাদের। হাদীর সংগ্রাম ছিল এই সম্মতির বিরুদ্ধে-এই manufactured consentভাঙার লড়াই। তিনি দেখিয়েছেন, প্রশ্ন তোলাই প্রথম রাজনৈতিক কাজ, আর প্রশ্নহীনতা হলো শাসনের আদর্শ অবস্থা। তার অবস্থান দর্শনগতভাবে স্পষ্ট, তিনি মানুষের মর্যাদাকে রাষ্ট্রের সুবিধার নিচে নামতে দেননি। তার কাছে রাজনীতি মানে ছিল না কেবল ক্ষমতার বণ্টন; রাজনীতি ছিল নৈতিকতার প্রয়োগক্ষেত্র। এই কারণে তার প্রতিবাদ কখনোই কৌশলগত নীরবতায় পর্যবসিত হয়নি। তিনি জানতেন, নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ নয়Ñনীরবতা প্রায়শই শক্তির পক্ষে দাঁড়ায়। তাই তার ভাষা ছিল উচ্চারণমুখর, কিন্তু দায়িত্বশীল; তীক্ষè, কিন্তু যুক্তিনির্ভর।

দার্শনিক অর্থে ওসমান হাদী ছিলেন আধিপত্যবাদী বয়ানের বিরুদ্ধ-ডিসকোর্স নির্মাতা। যেখানে শাসন একক সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, হাদী সেখানে বহুস্বরের দাবি তুলেছেন। যেখানে ইতিহাসকে বিজয়ীদের স্মারক হিসেবে নির্মাণ করে শুধু, তিনি সেখানে পরাজিতদের স্মৃতিকে রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এই স্মৃতি-রাজনীতিই তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল ক্ষমতার চোখেÑকারণ স্মৃতি প্রশ্ন তোলে, আর প্রশ্ন ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে। তিনি মনে করেন প্রতিরোধ মানে কেবল প্রত্যাখ্যান নয়; প্রতিরোধ মানে বিকল্প কল্পনার নির্মাণ। তিনি জানতেন, আধিপত্যবাদ মানুষের কল্পনাশক্তিকেও শাসন করতে চায়Ñযাতে মানুষ অন্য কোনো সম্ভাবনা কল্পনা করতে না পারে। হাদী সেই কল্পনাকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। তার প্রতিরোধ ছিল তাই ontological-মানুষ কীভাবে নিজেকে মানুষ হিসেবে কল্পনা করবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।

সময় অনেককে আপস করতে শেখায়, কারণ সময় ক্ষমতার পক্ষেই কাজ করে। কিন্তু ওসমান হাদী সময়ের সঙ্গে নয়, নীতির সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন। দর্শনগতভাবে এটি এক ধরনের ethical absolutism-যেখানে কিছু সত্য আপেক্ষিক নয়, কিছু অন্যায় কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। এই অনমনীয়তা তাকে জনপ্রিয়তার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য করেছে, সুবিধার চেয়ে প্রাসঙ্গিক করেছে। আধিপত্যবাদ যখন আবারও নতুন নতুন ভাষা ধার করবেÑউন্নয়ন, নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থÑওসমান হাদীর দর্শন তখনো সমান প্রযোজ্য হবে। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, যে কোনো বয়ানকে তার ফল দিয়ে বিচার করতে হয়, কে লাভবান হচ্ছে, কে নীরব হয়ে যাচ্ছে, কে অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। এই প্রশ্নগুলোই হাদীর উত্তরাধিকার। ওসমান হাদী তাই কেবল একজন প্রতিরোধক নন; তিনি একটি দার্শনিক চ্যালেঞ্জ। যতদিন ক্ষমতা নিজেকে প্রশ্নহীন করতে চাইবে, ততদিন হাদী ফিরে ফিরে আসবেন-একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হিসেবে, একটি অনমনীয় অবস্থান হিসেবে, আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনার এক অবিনাশী আইকন হয়ে।