কোনোরকম বাধা বিপত্তি এবং ভীতি ব্যতীত যখন নিজ এবং সকলের মত প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত হয় তখনই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পূর্ব শর্ত হচ্ছে ভীতি থেকে স্বাধীনতা (Freedom from Fear)। মতামত যাই হোক না কেন তা যেমন সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিষ্টের জন্য ব্যবহৃত হতে পারবে না, তেমনি প্রকাশিত স্বাভাবিক মতামতের জন্য কেউ শাস্তি ভোগ করবে না। এটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অনিবার্য অংশ। পৃথিবীর দেশে দেশে সাংবিধানিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা স্বীকৃত। আবার অপ্রিয় সত্য এই যে পৃথিবীর কোথাও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নমুনা হিসাবে প্রচার করা হয়। সেখানে কিছু রীতিনীতি, নিয়ম-কানুন ও সভ্যতা-ভব্যতা তৈরি হয়েছে, যা সহজে অতিক্রম্য নয়। সেখানে লিখিত ও অলিখিতভাবে বেশকিছু বিষয় আছে যা গণমাধ্যম নীতিগতভাবে মেনে চলে। যে বিষয়াবলী গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলতে হবে তা হচ্ছে: ক) অন্যায়ের জন্য উসকানি, খ) রাষ্ট্রদ্রোহীতা, গ) কুৎসা রটনা, ঘ) ধর্মনিন্দা, ঙ) ঘৃণা ছড়ানো এবং ষড়যন্ত্র। তারপরও দেখা যায় বিবিসি নামক গণমাধ্যম শাস্তি ভোগ করছে। ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এভাবে অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব না করে, অন্যের স্বার্থকে ব্যাহত না করে এবং আদর্শিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে পশ্চিমা দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকছে। Oxford Dictionary of Political Science অবশেষে গণমাধ্যমকে গণতন্ত্র এবং স্বৈরাচার প্রতিরোধের বাহন হিসাবে বর্ণনা করছে এভাবে: ‘A free interchange of ideas is seen as an essential ingredient of democracy and resistance to tyranny’. যেসব দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন রয়েছে সেসব দেশের রাজনৈতিক উন্নয়ন নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগিয়ে গেছে। গণমাধ্যম প্রতিবাদের ভাষাকে তুলে ধরে। প্রকাশনা, প্রচারণা, লেখালেখি, অনুষ্ঠানাদি এবং প্রযুক্তি নির্ভর কার্যাবলী গণমাধ্যমের অন্তর্গত বিষয়। সুতরাং যখনই আমরা গণমাধ্যমের কথা বলবো, স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া- উভয় মাধ্যমকেই উল্লেখ করব।

বাংলাদেশের দূর্ভাগ্য এই যে, আমাদের গণমাধ্যম উপর্যুক্ত গুণাবলীর আলোকে সেই পরিপূর্ণতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেনি। সৌভাগ্য এই যে, অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই দেশে ২০২৪ সালে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শতভাগ নিশ্চিত করেছে। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশের ৩৯ অনুচ্ছেদের (২) এর ক ও খ ধারায় বলা হয়েছে, “প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইলো”। কিন্তু যারা এটা লিখেছিলো তারাই ১৯৭৩ সালে প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারি করে বাক ও বিবেকের স্বাধীনতা অধীনস্ত করেছিলো। বিগত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যে, যে আওয়ামী চক্র গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অধীনস্ত করেছিলো, ২০০৯ সালে তারাই আবার এই স্বাধীনতাকে সমুলে উৎখাত করেছিলো। সুতরাং বোঝা যায় যে, কোনো একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন ও সাংবিধানিক অবস্থান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গ্যারান্টি নয়। সেক্ষেত্রে যে বিষয়াবলী প্রাসঙ্গিক সেগুলো হচ্ছে: ১) রাষ্ট্র তথা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, ২) আমলাতন্ত্রের কার্যব্যবস্থা, ৩) সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য, ৪) গণমাধ্যম কর্মীদের মানসিক অবস্থান, ৫) মালিক পক্ষের ভূমিকা। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে সবসময় রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে ‘প্রশস্তি’ এর গণমাধ্যম তৈরি করা। এসব দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি দুর্বল ও দূর্নীতিবাজ হয় তাহলে আমলাতন্ত্র জেকে বসে। তখন সুশীল সমাজ স্ব-ইচ্ছায় সমর্পণ করে। গণমাধ্যমের কর্মীরা প্রশংসা ও প্রশস্তির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। মালিক পক্ষ যখন তখন হস্তক্ষেপ ও হয়রানির সুযোগ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই গণমাধ্যম নিগ্রহের শিকার হয়ে আসছে। আগেই বলা হয়েছে সরকার সংবিধান অস্বীকার করে সংবাদপত্রের উপর কালো কানুন আরোপ করে। গণকন্ঠ নামের বিরোধী দলীয় দৈনিকটি তছনছ করা হয়। এর সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে জেলে পাঠানো হয়। এর নির্বাহী সম্পাদক আফতাব আহমেদকে নিগ্রহের শিকার হতে হয়। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক হলিডের খ্যাতিমান সাংবাদিক এ জেড এম এনায়েত উল্লাহ খানকে গ্রেফতার করা হয়। মাওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’ বন্ধ হয়ে যায়। সম্পাদক এরফানুল বারীকেও কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এসব করেও যখন গণমাধ্যমকে অবদমিত করা যায়নি, তখন ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ বলে সকল সংবাদপত্র বেআইনী ঘোষিত হয়। কেবলমাত্র ৪ টি সংবাদপত্র বহাল রাখা হয়। তাও আবার সরকারি মালিকানায়। বাকশালের ২১ বছর পরে ১৯৯৬ সালে যখন তারা জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ইসলামী শক্তিকে বিভাজিত করে ক্ষমতায় আসে তখনও তারা একই ধারা অব্যাহত রাখে। সরকারি মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রকাশনার মালিক হয়ে দাঁড়ান শেখ রেহানা। দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সাল থেকে আবারও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। এবারও তারা সংবাদপত্র দলন তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার বেপরোয়া পায়তাড়ায় লিপ্ত হয়। ২০১০ সালের ১ জুন আমারদেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শত শত পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য পত্রিকা অফিস ভাংচুর করে। সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে নয়াদিগন্ত পত্রিকায় হামলা, অগ্নি সংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শাহবাগীদের নির্দেশে আমারদেশের চট্টগ্রাম অফিসে আক্রমণ, ভাংচুর, লুটপাট এবং সাংবাদিকদের নির্যাতন করা হয়। ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আমারদেশের ছাপাখানা এবং অফিসে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযান চালানো হয়। আবারও সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়। প্রেসের যন্ত্রপাতি ও মালামাল ধ্বংস এবং লুটপাট করা হয়। ১৯১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্তরে গণহত্যার সংবাদ প্রচারের অপরাধে দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর আমারদেশ অফিসে এক রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে কম্পিউটার, সার্ভার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভস্মীভূত হয়। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার দাবি করেছিলো যে, আমারদেশ কর্তৃপক্ষই ইন্সুরেন্সের টাকা পাওয়ার জন্য অফিসে আগুন দিয়েছিলো। অথচ আমারদেশ অফিসের কোনো ইন্সুরেন্সই ছিলো না। তখন আমারদেশ সম্পাদক জেলে আটক ছিলেন। ২০১৮ সালের ১১ জুলাই কুষ্টিয়ার আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে আমারদেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান রক্তাক্ত হামলার শিকার হন। পুলিশের যোগসাজশে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালায়। তার চিকিৎসা নেওয়ার অধিকারও হরণ করা হয়। ২০১৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক সংগ্রাম অফিসে পুলিশ প্রহরায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক প্রবীণ লেখক আবুল আসাদকে শারীরিকভাবে অপদস্থ করা হয়। দীর্ঘকাল জেল খাটার পর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্ত হন।

১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল এর এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের গণমাধ্যম বিরোধী কার্যক্রম তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়েছিলো গণমাধ্যম তথা এক শ্রেনীর সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়। বাংলাদেশে একসময় একটি ধারার সাংবাদিকদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিলো। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত এই বাম ধারার সাংবাদিক তথা লেখক-সাহিত্যিকরা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ১৯৬৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যতই শক্তিশালী হয়েছে, ততই এই বাম ধারার সাংবাদিকদের প্রভাব ক্রমহ্রাসমান হয়েছে। ১৯৭১ সালের পরে বাম ধারার সাংবাদিকদের গরিষ্ঠ অংশ আওয়ামীলীগ সরকারের প্রশংসা প্রশস্তিতে নিমগ্ন হয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে বাম ধারার রাজনীতির বাস্তবতা তিরোহিত হলে সাংবাদিক মহলেও তার প্রভাব অনুভুত হয়। খোদ কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়। বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগে যোগদান করে। অধিকাংশ বাম ধারার সাংবাদিকরা সে পথ অনুসরণ করেন।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী ধারার বিপরীতে জাতীয়তাবাদী তথা ইসলামী ভাবধারার প্রকাশ ঘটে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই ভাবধারার উৎস এবং প্রতিষ্ঠাতা। প্রাথমিক অবস্থায় বাম ধারা এবং পিকিং পন্থীদের একটি বড় অংশ জিয়াউর রহমানের প্রতি সমর্থণ জানায়। ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে বুদ্ধিজীবীদের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি এবং প্রফেসর মুজাফফর আহমদের ন্যাপ জিয়াউর রহমান আহুত গণভোটকে সমর্থন জানায়। পরে বাম ধারার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা যখন ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি জিয়ার চূড়ান্ত সমর্থন লক্ষ্য করেন তখন মানে মানে বাম ধারার বুদ্ধিজীবীরা কেটে পরেন। জিয়াউর রহমানের শাসনকালে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থণ শক্তভাবে অনুভুত হয়। এর প্রভাব সাংবাদিক মহলেও পরিদৃষ্ট হয়। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের সময় পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে। বিএনপি জামায়াত জোট (১৯৯১-১৯৯৬, ২০০১-২০০৬) সময়কালে এই ভাবধারা আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হয়। বাম ধারার বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকেরা এই সময়কালে প্রগতির নামে তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে থাকেন। ১/১১’র ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এই ভাবধারার একটি বিরাট উলম্ফন লক্ষ্য করা যায়। ছলে-বলে-কলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ঐ বামধারার বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী নাম ধারণ করেন। সাংবাদিকরা জোড় করে প্রেসক্লাব দখন করেন। আইনজীবীরা আওয়ামী স্টাইলে বার সমিতিগুলো দখল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শুধু সমিতি দখল করেই ক্ষান্ত হননি, বরং গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে আওয়ামী দলতন্ত্রের অধীনে স্থাপন করেন। গণমাধ্যম দলনের ঘঠনাবলী ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। গণমাধ্যম ক্রমশ ক্রমশ স্বৈরাচারের বন্দনায় লিপ্ত হয়। চ্যানেলগুলো বন্দনা বাক্সে পরিণত হয়। সেখানে প্রতিদিন আওয়ামী কুশিলবদের বন্দনা শোনা যায়। নতুন নতুন পত্রিকা ও চ্যানেলের মালিক হয়ে দাড়ায় আওয়ামী মাফিয়া চক্র। আকারে প্রকারে এদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাড়ায় বিরোধীদের দমন। প্রশাসন যেমন বিরোধীদের হামলা, মামলা, গুম ও খুন দিয়ে মোকাবেলা করে, গণমাধ্যম তথা চ্যানেল তথা ভাষ্যকররা সেই নগ্ন হামলার প্লট তৈরি করে। টকশো তে গিয়ে বিরূপ কথা বলায় মামলা ও গ্রেফতারের মুখোমুখি হন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। অপদস্ত হন বিশিষ্ট্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী। একজন নিকৃষ্ট বিচারক ৭ রাজার ধন মানিক এর কাছে অপমানিত হন উপস্থাপক। টকশোর এরকম হাজারও উদাহরণ রয়েছে।

গণমাধ্যমের কোন অংশই আওয়ামী আক্রোশ থেকে নিরাপদ ছিলোনা। ফেসবুকে বিরূপ পোস্ট করায় ১৪ বছরের কিশোর ধৃত হয়েছে। একজন খাদিজা শুধুমাত্র একটি মন্তব্যের জন জেল খেটেছে কয়েক বছর। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো অমানবিক আচরণ পেয়েছে। একজন চির প্রতিবাদী শহিদুল ইসলাম অনেক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন। এভাবে যে বা যারাই গণমাধ্যমে একটু আতটু টু-টা করেছেন, তাদের সবাইকেই তার বিরূপ ফল ভোগ করতে হয়েছে। ফেসবুকের পোস্টের সূত্র ধরে আয়নাঘরে গেছে এরকম উদাহরণও রয়েছে। এই যখন গণমাধ্যমের নির্মম বাস্তবতা, তখন তথাকথিত বাম ধারার গণমাধ্যম ও প্রগতিশীলতার সোল এজেন্ট দাবিকারী পত্র পত্রিকা ও আওয়ামী স্বেচ্ছাচারের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে। এক্ষেত্রে তারা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। তারা উপরি উপরি স্বৈরাচারের বৈরী প্রমাণ প্রমাণ করার চেষ্টা করে। গ্রেফতার নাটকেরও অবতারণা হয় দু-একবার। অবশেষে তা কিছুই ঘটেনি। সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের লোকেরা স্বৈরাচার সময়কালে ইনিয়ে-বিনিয়ে বিরোধী গণআন্দোলনের বিপক্ষে কাজ করে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করে কার্টুন ছাপে। প্রধান বিরোধী নেতা নেত্রীদের বিরুদ্ধে কূৎসা রটণা করে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তারা ভোল পাল্টে ফেলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা যখন এসব বাম ধারার বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের বিপরীতরূপে প্রতিভাত হয় তখন তারা অভিনব কৌশলে এসব চেতনা ও ভাবাদর্শের বিপক্ষে কাজ করে। দৃশ্যমানভাবে তারা অভ্যুত্থানের স্বপক্ষ শক্তি বলে নিজেদেরকে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, অপরদিকে কৌশলে স্বকীয় ভাবধারা প্রচারে সচেষ্ট হয়। আগেই বলা হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে এক ধরনের বাম বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী ঘরানার ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদকে ধারণ করে। জিয়াউর রহমানের সময়কালে তারা ঘাপটি মেরে থাকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতাসীন হলে এরা নড়েচড়ে বসে। ১/১১’র মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম সৃষ্টি করে তারা তাদের অনুসৃত ভাবধারাকে ফিরিয়ে আনতে চায়। তথাকথিত সামরিক সমর্থিত সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়সৃষ্ট সামান্য ঘটনাকে তারা অসামান্য করে তোলে। আধা সামরিক সরকারকে সারাদেশে কারফিউ জারি করে অবশেষে রক্ষা পেতে হয়। পাশ্চাত্য ও প্রতিবেশীর সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের ফলে আওয়ামীলীগ ক্ষমতাসীন হয়। আওয়ামী ও বাম ধারার বুদ্ধিজীবীরা মুজিব বন্দনায় তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এভাবে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করার অবাধ সুযোগ পান এই বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিরা। গণমাধ্যমে ক্রমাগত হামলা, বিশেষত সাগর রুনির হত্যাকান্ড নিয়ে যখন তোলপাড় শুরু হয় তখন সাংবাদিকদের ঐক্য প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। লজ্জার কথা গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের দুই শীর্ষ নেতা এই সময়ে ক্ষমতা ও লোভে বশীভুত হন। একজন ক্ষমতা ও আরেকজন সম্পদ লাভ করেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি স্বৈরাচারেরই পতন ঘটেনি, বরং সেই সাথে তাদের অনুসৃত আদর্শের কবর রচিত হয়েছে। বাংলাদেশে ভাবধারার সংঘাত চিরায়ত। একটি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সমর্থনপুষ্ট ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, অপরটি ইসলামী মূল্যবোধ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের উচ্চারিত স্লোগান, কর্মসূচি ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে একটি মধ্য ধারার সূচনা করতে চেয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, জীবনবোধ ও আদর্শ দ্বারা এই ভাবধারা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। সঙ্গতভাবেই তাদেরকে হিসাব নিকেশ করে কথা বলতে হয়েছে। অপরদিকে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে রাজপথে স্লোগান দিয়েছে, তাদের কোন ব্যাকরণ ছিলো না। তারা অনায়াসেই উচ্চারণ করতে পেরেছে, ‘নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর’। কেউ তাদের মূর্তিগুলো উৎপাটনের আদেশ দেয়নি। অথচ অনেক কষ্টসাধ্য কাজটি তারা তাদের শ্রম ও ঈমান দ্বারা সম্পন্ন করেছে। এই উচ্চারিত অথবা অনুচ্চারিত ভাবধারা দ্বারা পরিচালিত হতে হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। সরকার প্রধানকে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনে এই ভাবধারার অনুকূলে উচ্চারণ করতে হয়েছে। সরকার যখন সংস্কারের কথা বলেছে তখনও এই ভাবধারার বিপরীতে কোন কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো একরকম নিরঙ্কুশভাবে এই ভাবধারার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছে।

সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রে যখন একটি ইসলামী মূল্যবোধ পুষ্ট ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন পরগাছা বামধারার লোকেরা নিজেদেরকে বিপন্ন মনে করেছে। যখনই তাদের সামনে সময় ও সুযোগ এসেছে তখন মানবিকতার নামে, নারী প্রগতির নামে ও অসাম্প্রদায়িকতার নামে তারা বিবৃতি যুদ্ধে নেমেছে। প্রধান দুটো পত্র পত্রিকার বিরুদ্ধে আদর্শিক বৈপরীত্যের যে অভিযোগ উঠেছে, তা অসত্য নয়। তবে তার বিপরীতে অশোভন ও অসামাজিক কিছু করা অথবা আক্রমনের মতো আচরণকে মেনে নেয়া যায় না। হাদীর শাহাদাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের আসল চেতনাটি প্রকাশিত ও প্রমাণিত হয়েছে। এটি যে অলঙ্ঘনীয়ভাবে ইসলাম, পরবর্তী ঘটনাবলী কি তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়?

২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গোটা জাতির যে চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্খা ও প্রতিজ্ঞা-প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছে তা স্পষ্ট। অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার যে, বাংলাদেশের তথাকথিত বাম বুদ্ধিজীবী ও কোন কোন সংবাদপত্র সেই শাস্বত আদর্শকে ধারণ তো দূরের কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসকে যদি তারা ধারণ, লালন ও পালন করতে না পারেন, তাহলে সেটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা। এটা সত্য যে এক সময় মার্কস ধর্মকে আফিমসম বলেছিলেন। পরে এই পৃথিবীর ভলগা, নীল, গঙ্গা ও মেঘনায় অনেক পানি প্রবাহিত হয়েছে। এই প্রবাহের সাথে একাত্ম হয়ে একজন মাওলানা ভাসানী জীবন শেষে ‘রবুবিয়াত’ এর কথা বলেছেন। প্রফেসর মুজাফফর আহমদ ধর্ম, কর্ম, সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়েছেন। এই বাংলায় ধর্ম তথা ইসলাম যে কতটা অনিবার্য, ইতিহাসের পাতায় পাতায় তা প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তা আরেকবার আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং গণমাধ্যমকে গণঅভ্যুত্থানের সেই শাস্বত ধারায় ধারণ করতে হবে, এর বিকল্প নেই।