১৯৭৭ সালের ১৭ জানুয়ারি ১৩৭, বংশাল থেকে নতুন করে দৈনিক সংগ্রামের পথচলা শুরু। সকল বাধা প্রতিবন্ধকতা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দৈনিক সংগ্রামের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে এবং থাকবে, ইনশাআল্লাহ। কোনো অপশক্তিই দৈনিক সংগ্রামকে থামাতে পারেনি। সংগ্রাম নামের সার্থকতা তার সাহসি ভূমিকায় দীপ্তিমান। সংগ্রাম করে এগিয়ে যাওয়াই যেন তার ভাগ্যলিপি সংগ্রাম বহুবার আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মাথানত করেনি। আরো বেশি উজ্জীবিত হয়েছে কারণ সত্য প্রকাশে বুকভরা হিম্মত আর পবিত্র অঙ্গীকার নিয়ে সংগ্রামের যাত্রা শুরু। এ মহতি উদ্যোগের যারা স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তারা চেয়েছিলেন ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সুখি-সমৃদ্ধ কল্যাণের সমাজ ও রাষ্ট্র বির্ণিমানে অবদান রাখতে। যেখানে থাকবে না হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ, বৈষম্য। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পাবে ন্যায্য সকল অধিকার। থাকবে বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তা-চেতনার অবাধ বিকাশ ও জান-মালের নিশ্চিত সুরক্ষা। ঘুনেধরা সমাজে বিভ্রান্তির সয়লাবে দিশেহারা মানুষ যাতে পথ খুঁজে পায়; সিিঠক সত্যটাকে জানতে পারে তার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী নীতি ও আদর্শ-নিষ্ঠ গণমাধ্যমের। কারণ বিদ্যমান প্রচারমাধ্যমগুলো অপতথ্য পরিবেশন আর অপপ্রচার চালিয়ে মানুষকে দিশেহারা করতে ব্যস্ত থাকায় এক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে পারস্পরিক সুসম্পর্ক, সহমর্হিতা, সৌভ্রাতৃত্ব, সংহতি, সৌজন্যতা ও মানবিকতা, উদারতারÑ উপদানগুলো কাটাবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অপরদিকে অনৈক্য, বিভাজন, বিশৃঙ্খলা, হিংসা-বিদ্বেষ, ভেদ-বৈষম্য, জুলুম-নিপীড়ন, স্বার্থপরতা প্রকটভাবে বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং একটা পুথিগন্ধময় অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

এসবের অবসান হওয়া অনিবার্য। সে কারণে তৎকালে কয়েকজন মহান বিজ্ঞ ব্যক্তি সংগ্রাম পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ নেন। সংগ্রাম তাদেরই স্বপ্নের সোনালি ফসল। সংগ্রামের তুলনা সংগ্রামই। সংগ্রাম একটি আদর্শের নাম। অনুপম ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক। স্বীয় নীতি ও আদর্শে অবিচল থেকে গৌরবগাঁথা নিয়েই পত্রিকাটি বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

১৩৭, বংশাল থেকে সংগ্রামের নবযাত্রা শুরু হয়, এক প্রতিকুল অবস্থার মধ্য দিয়ে। নব চেতনায় উজ্জীবিত, প্রত্যয়দীপ্ত একঝাঁক তরুণ সাংবাদিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে শপথ নেয়। তাদের উদ্দীপনায় সংগ্রাম হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যেতে থাকে। সংগ্রামের সম্পাদক হিসেবে হাল ধরেন প্রখ্যাত পণ্ডিত, লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আক্তার ফারুক। তার খুরধার লেখনিতে প্রতিপক্ষ কুপোকাত হত। পাণ্ডিত্যের অহমিকা তার মধ্যে দেখিনি। ছিলেন সদালাপী, সুরসিক আলোচক, তার অদ্ভুত উচ্চকণ্ঠের হাসি ও বিরামহীন পান খাওয়ার গল্প কেনা জানত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একসময় অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে সংগ্রামে তিনি আর ছিলেন না। সে সময় সংগ্রামে সহকারী সম্পাদক হিসেকে দায়িত্ব পালন করেন তারুণ্যদীপ্ত জনাব আবুল আসাদ। অধ্যাপক আক্তার ফারুকের পর তিনি দীর্ঘকাল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আবুল আসাদ একজন খ্যাতিমান লেখক, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী। সংগ্রামে যোগদানের আগে তার লেখা পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। তিনি বিনয়ী, ভদ্র ও অমায়িক মানুষ। সাংবাদিক মহলে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র। তার লেখা বিখ্যাত সাইমুম সিরিজের পাঠক, ভক্ত, অনুরক্তের সংখ্যা অগণিত। এছাড়াও তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বই লিখেছেন। অপর সহকারী সম্পাদক ছিলেন মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতি। তিনি একজন বিজ্ঞ আলেমই নন, আধুনিক জ্ঞানেও তিনি ছিলেন সমান সমৃদ্ধ। আলেমদের মধ্যে এতবড় সাংবাদিক কজনই বা আছে। থাকলেও কিসমতি সাহেবের খ্যাতি শীর্ষে। তিনি কেবল পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকই ছিলেন না বরং একজন সংগ্রামী পুরুষও ছিলেন। সত্য, ন্যায়কে উচ্চকিত করতে একসময় সরাসরি আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি একজন স্বনামধন্য লেখকও। অনেক পুস্তকের রচচিয়তা। তিনি সহজ-সরল, তবে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন।

আমি সংগ্রামে যোগদান করি ১৯৭৮ সালে। এর আগে মগবাজার শের-ই-বাংলা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছি। স্বাস্থ্যগত কারণে শিক্ষকতায় ইস্তফা দেই। শহীদ কামারুজ্জামান ভাই একদিন বললেন, সাংবাদিকতা করব কিনা। আমি সম্মতি জানালে তিনি পরের দিনই সংগ্রামে জয়েন করতে বললেন এবং যথারীতি যোগদান করলাম। এভাবেই সাংবাদিকতা শুরু। অবশ্য আগে থেকেই এ পেশাটাকে অত্যন্ত সম্মানজনক মনে করতাম এবং এ ব্যাপার আগ্রহীও ছিলাম। শহীদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের কারণে সাংবাদিকতায় আসার সুযোগ পেয়েছি। এজন্য তার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।

আমি যখন যোগদান করি, তখন সংগ্রাম কার্যালয় ছিল ১৩৭, বংশালের বলিয়াদির জমিদার বাড়ি হিসেবে পরিচিত ভবনের সামনের অংশের মূল ফটকের সাথে। উক্ত ভবনে তখন বসবাস করতেন উক্ত জমিদার বংশের একটি পরিবার।

বার্তা কক্ষটি ছিল সামনের দিকেই। বিপরীত দিকে ছিল সম্পাদকীয় বিভাগ। বার্তা কক্ষের ঠিক পেছনের আঙিনায় হাজী শরীতুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়ার কবর। তিনি শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিতই ছিলেন না। অসীম সাহসী লড়াকু যোদ্ধা ছিলেন। সে সময় কালি কাইজ্জাল নামে কুখ্যাত এক অত্যাচারী জমিদার মুসলমানদের সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনে জর্জরিত করেছিল। এমনকী মুসলমানরা দাড়ি রাখলে ট্যাক্স আদায় করত।

পীর দুদুমিয়া তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলে তাকে দীর্ঘকাল কারাবরণ করতে হয়। কিন্তু নতি স্বীকার করেননি। তার পরবর্তী বংশধররা হচ্ছেনÑ পীর বাদশা মিয়া (আবা খালেদ রশীদ উদ্দীন) পীর দুদু মিয়া, দাদন মিয়া, আবু বকর মিয়া। বর্তমান পীর হচ্ছেনÑ মাওলানা হাসান মিয়া।

উক্ত জমিদার বাড়িটি নিয়ে বিবাদ ছিল। আইনি লড়াইয়ে জিতে বাড়িটি দখল বুঝে নেন বাহাদুরপুরের পীর সাহেবরা। ফলে সংগ্রাম সেখান থেকে ২৫, শ্রীসদাস (পুরান ঢাকা) লেনে চলে যায়। কিছুদিন পর সেখান থেকে বর্তমান ঠিকানায় ৪২৩, এলিফ্যান্ট রোড, বড় মগবাজারের আল-ফালাহ ভবনে চলে আসে। বংশালে অফিস থাকাকালে যারা সংগ্রামে কাজ করেছেন তাদের অনেকেই আজ দুনিয়াতে নেই। সংগ্রাম যতদিন থাকবে তাদের অবদানও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংগ্রামে যোগদানের পর যাদের সাথে বসার সুযোগ পেয়েছি তাদের মধ্যে ছিলেনÑ রেজাভাই, কবির ভাই, শেখ এনামুল হক, সালাহ উদ্দীন মো. বাবার, জয়নুল আবেদীন আজাদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আবুল খায়ের চৌধুরী, মাহবুবুল বাসেত, জেবুল আমিন দুলাল, রুহুল আমিন গাজী, আবদুস সামাদ প্রমুখ। এ সময় মফলস্বল সম্পাদক ছিলেন মরহুম অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। রেজা ভাই ও কবির ভাই ছিলেন শিফট ইনচার্জ।

বার্তা সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ হোসেন ভাই। পেশাগতভাবে ছিলেন কঠোর। সবাই বিশেষ করে রিপোর্টাররা তার সামনে দাঁড়াতে বলতে গেলে ভয়ই পেত। কারণ রিপোর্ট হাতে নিয়ে ধমকের সুরে বলতেন, কি লিখেছেন, ঠিক করে নিয়ে আসেন। তার সামনে সামাদ ভাইকে যেভাবে জড়সড়ো হয়ে দাঁড়াতে দেখেছি সত্যিই তা ছিল উপভোগ্য। অথচ এই হোসেন ভাই ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও স্নেহশীল। তাকে সবাই সমীহ, সম্মান ও শ্রদ্ধা করত।

দৈনিক সংগ্রামের বংশালের স্মৃতিময় দিনগুলো নিয়ে লিখে শেষ করা যাবে না। আমরা ছিলাম অটুট বন্ধনে আবদ্ধ একটি পরিবারের মতো। অনেক দুঃখ-দৈন্যের মাঝেও পরিবেশটা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা ছিল। বংশালের মুখরোচক পুরি আর চা ভাগাভাগি করে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। বার্তা কক্ষে ছিল যাদুঘরে রাখার যোগ্য একটি ফ্যান। চালু করলে বিকট আওয়াজে চলতÑ যা ছিল দস্তুর মতো আতঙ্কজনক।

সংগ্রাম বর্তমান ঠিকানায় আসে ১৯৮০ সালে। এখানে আসার পর শিফট ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনÑ মরহুম হাসানুল করিম, মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, আবদুল কাদের মিয়া, শেখ এনামুল হক, কাজী হাফিজ ও সাদাত হোসাইন। মোহাম্মদ হোসেন ভাইয়ের পর বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেনÑ কবির ভাই, আ. কাদের মিয়া ও মাসুদ নিজামী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, জয়নুল আবেদীন আজাদ। কাদের ভাইয়ের পর আমি বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। বর্তমানে এ পদে আছেন শামসুল আরেফিন। আগে তিনি ছিলেন চিফ রিপোর্টার।

তার আগে চিফ রিপোর্টার ছিলেন মরহুম রুহুল আমিন গাজী। আবদুল মান্নান (বিশিষ্ট ব্যাঙ্কার ও ইতিহাসবিদ) এবং সালাহ উদ্দিন মো. বাবরও সংগ্রামের চিফ রিপোর্টার ছিলেন জনাব বাবর, তিনি বর্তমানে দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক।

নাসির উদ্দীন মো. শোয়েব সংগ্রামের বর্তমান চিফ রিপোর্টার। সংগ্রামের অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, সেসব সম্মানিত ব্যক্তি হচ্ছেÑ বিশ্ব মুসলিমের অবিসংবাদিত নেতা মহান ভাষা সৈনিক মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম, অন্যতম বিশ্বসেরা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী মরহুম আব্বাস আলী খাঁন, শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মরহুম মাওলানা একেএম ইউসুফ, মরহুম শামসুর রহমান, মরহুম মাওলানা নুরুল ইসলাম, মরহুম আবদুল খালেক প্রমুখ।

আরো যেসব খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী সংগ্রামে অবদান রেখেছেন, তারা হচ্ছেনÑ প্রখ্যাত মরহুম কবি আল মাহমুদ, মরহুম সালাহউদ্দীন জহুরী, মরহুম ড. রেদোয়ান সিদ্দিকী, মরহুম আবদুল মান্নান তালিব, মরহুম আজিজুল হক বান্না। আরো যাদের নাম বলতে হয়, তারা হচ্ছেনÑ আযম মীর শাহীদুল আহসান (বর্তমানে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক)। মাসুমুর রহমান খলিলি (বর্তমানে নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক), সাজজাদ হোসাইন খান, বাকের হোসাইন, মুজতাহিদ ফারুকী, শহীদুল ইসলাম, খায়রুল বাশার, মরহুম আহমদ আখতার, সাজ্জাদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, আহমদ মতি প্রমুখ। আরো কয়েকজনের নাম উল্লেখ না করলে কার্পণ্য করা হবে। কারণ তাদের প্রচেষ্টায় সংগ্রামের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। তাদের মধ্যে আছেনÑ মরহুম এসএসএইচ হুমায়ন আহমেদ, মরহুম আবদুল খালেক মজুমদার, মরহুম অধ্যাপক ফজলে আযিম, মরহুম নাজির আহমদ, মরহুম আবদুল ওয়াদুদ।

সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবে বরাবরই সংগ্রামের সরব উপস্থিতি ছিল এবং সাংবাদিক ইউনিয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখত। সে কারণে ডিইউজের সংগ্রাম ইউনিটকে সংগ্রামী ইউনিট বলা হয়। ঐক্যবদ্ধ ইউনিয়নে নির্বাচন আসলে সবাই সংগ্রামকে কাছে টানার চেষ্টা করত। কারণ নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে সংগ্রামের প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারত না। মরহুম আনোয়ার জাহিদ, ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মতো নেতারা সংগ্রামে এসে বক্তৃতা করতেন। ইউনিয়নে বরাবরই সংগ্রাম থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হতেন। সাংবাদিক নেতা মরহুম রুহুল আমিন গাজী ডিইউজে ও বিএফইউজের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বার বার। সাংবাদিকদের অধিকার আদায় ও রুটি-রুজির আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে সংগ্রাম।

শহীদ আ. কাদের মোল্লা ছিলেন ডিইউজের ভাইস প্রেসিডেন্ট। শহীদ কামারুজ্জামান ও শহীদ মোল্লা ভাই প্রেস ক্লাবে গেলে যে টেবিলে বসতেন সাংবাদিকরা তাদের ঘিরে বসে যেত এবং আড্ডায় মেতে উঠত। তাদের আলোচনা ও কথায় মজলিশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।

দৈনিক সংগ্রামের ইফতার মাহফিল ছিল অন্যতম আকর্ষণ। দল-মত নির্বিশেষে সব সাংবাদিককে দাওয়াত দেওয়া হত এবং সবাই আগ্রহ নিয়ে আসত। কেউ দাওয়াত না পেলে অনুযোগ করত। প্রকৃতপক্ষে অনুষ্ঠানটি সাংবাদিকদের মিলনমেলায় পরিণত হত। সংবাদের তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সন্তোষ গুপ্তও একবার ইফতার মাহফিলে এসেছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকতেন মরহুম সম্মানিত অধ্যাপক গোলাম আযম, শহীদ মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ।

আগেই বলেছি সংগ্রাম করে করেই দৈনিক সংগ্রাম আজকের অবস্থানে এসেছে। বাধা-প্রতিবন্ধকতা কখনো সংগ্রামের পিছু ছাড়েনি। বিপদ সবসময় লেগেই থাকে ছায়ার মতো।

১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী শাসনামল ছিল একটি ভয়ঙ্কর দুঃসময়। তখন সংগ্রামকে হাতে ও ভাতে মারার প্রয়াস চালানো হয়। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সকল সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে সংগ্রাম কঠিন সংকটে পতিত হয়। বিশাল ভর্তুকি দিয়ে পত্রিকা চালু রাখতে কর্তৃপক্ষ অপারগ হয়ে পড়েন। তখন সাংবাদিক-কর্মচারীরা সংগ্রামের প্রকাশনা চালু রাখার দায়িত্ব নেয়। এটা ছিল একটি দুঃসাহসী কাজ। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেই সাংবাদিক-কর্মচারীরা দৈনিক সংগ্রাম টিকিয়ে রাখে। আওয়ামী সরকারের অবসান ঘটার পর সে যাত্রায় দুর্দিন কেটে যায়। দৈনিক সংগ্রাম আরো একটি বিপদে পড়েছিল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অপতৎপরতার সময়। সে সময় তাদের উস্কানিতে বার বার সংগ্রামের ওপর হামলা চলে। সংগ্রামের নিবেদিত প্রাণ কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা প্রতিহত করে। সে সময় আগুন ও বোমা হামলাও চালানো হয়। সম্পাদনা সহকারী মরহুম আবুল কালাম আজাদ বোমা হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন।

দৈনিক সংগ্রামের সবচেয়ে বিভীষিকাময় দিন ছিলÑ ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর, দ্বিতীয় দফা আওয়ামী শাসনামলে। সেদিন আওয়ামী দুর্বৃত্তরা সংগ্রাম ঘেরাও করে এবং জোরপূর্বক ভেতরে ঢুকে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়ে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে কম্পিউটার, টিভি, টেবিল-চেয়ার সবকিছু নির্দয়ভাবে ভেঙে চুরমার করে এবং কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করে। এরপরও তারা থেমে থাকেনি। তারা একপর্যায়ে সংগ্রামের বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় সম্পাদক জনাব আবুল আসাদের সাথে নির্দয় কসাইয়ের মতো আচরণ করে। এত বড় একজন সম্মানিত ব্যক্তির সাথে তারা যে আচরণ করেছে পরের দিন প্রতিবেদনসহ ছবিতে তা প্রকাশ পেয়েছে এবং দেশবাসী ও দুনিয়াবাসী তা দেখেছে। তারা তার গায়ে হাত তোলার মতো অমার্জনীয় অপরাধ করে।

এখানেই থেমে থাকেনি, তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয় এবং থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং কয়েক বছর তিনি বিনা অপরাধে জেলখানায় বন্দি জীবন কাটান। এ সময় তার বিরুদ্ধে এবং সংগ্রামে চিফ রিপোর্টার জনাব রুহুল আমিন গাজী ও বার্তা সম্পাদক সাদাত হোসাইনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইন ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়।

এ মামলায় জনাব গাজী ও সাদাত হোসাইনও বিনা দোষে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয় যে, ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর আওয়ামী দুর্বৃত্তরা নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সবকিছু চুরমার করে দিলেও সংগ্রামের প্রদীপ্ত আলোটাকে নিভিয়ে দিতে পারেনি। সংগ্রামের অকুতোভয় সাহসি সাংবাদিক-কর্মচারীরা সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিন দৈনিক সংগ্রাম প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। পরের দিন দৈনিক সংগ্রাম আক্রান্ত শিরোনামে সচিত্র প্রতিবেদনসহ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। সেদিন পত্রিকাটি প্রকাশ করা না গেলে হয়ত সমূহ বিপদ হয়ে যেত।

১৯২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে জালিমের তখত তাউস ভেঙে খান খান হয়ে পড়ে। বিপ্লবের মহাপ্লাবনে ভেসে যায় স্বৈরাচারের ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার সমস্ত আয়োজন, স্বপ্নসাধ।

প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণের মুখে ৫ আগস্ট লেডি ফেরাউন হাসিনা সপরিবারের দেশ ছেড়ে পালান। আওয়ামী বিভীষিকাময় জাহেলি শামনের অবসান ঘটায় গোটা দেশবাসীর সাথে দৈনিক সংগ্রাম মুক্তি, শান্তি ও স্বস্থির স্বাদ গ্রহণের সুযোগ লাভ করে।

বর্তমান পরিবেশে সংগ্রাম অনেকটাই নিঃশঙ্ক। তবে সংকট এখনো আছে। নিবেদিত প্রাণ সাংবাদিক-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে সংগ্রাম তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে। অন্ধকারের কালো পর্দা ভেদ করে নবসূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত হবেই ইনশাআল্লাহ।