পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন ছিল এর মৌলিক চালিকাশক্তি। তৎকালীন পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের বেশিরভাগই হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে, বিশেষ করে পাটের মাধ্যমে। কিন্তু রপ্তানি আয়ে সিংহভাগ অবদান রাখা সত্ত্বেও, পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে শোষিত, আর্থিকভাবে অবহেলিত এবং কাঠামোগতভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। বাজেটে বৈষম্যমূলক বরাদ্দ, অসম শিল্প উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর সীমিত নিয়ন্ত্রণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং অনুন্নয়নে জর্জরিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাই অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিতে পথে নেমে আসে, যা এক সময় চূড়ান্ত স্বাধীনতার দাবিতে রুপান্তরিত হয়। যার ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয়।

এই তো গত ১৬ ডিসেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদা এবং উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আমরা ৫৪তম মহান বিজয় দিবস উদযাপন করলাম। গত ৫৪ বছরে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে টেকসই জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানব উন্নয়ন সূচকের উন্নতি। তবে, এই অর্জনগুলি সত্ত্বেও, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণ যে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম এবং ত্যাগ স্বীকার করেছিল, তা আমরা এখনও সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করতে পারিনি। আমরা দেখছি অর্থনৈতিক সুযোগের অসম প্রবেশাধিকার, সম্পত্তি ও শ্রম অধিকারের সুরক্ষা ব্যবস্থায় সীমাহিন দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মাধ্যমে সৃষ্ট প্রতিবন্ধক্তা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ফলে জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারেনি এবং মহান সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারেনি।

বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) আমরা দৃশ্যমান অবকাঠামো সম্প্রসারণ দেখেছি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প শুনেছি। কিন্তু এই কাগজ-কলমের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ নাগরিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছেনি। অর্থনৈতিক সুযোগগুলি ক্রমশ রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। সরকারি চুক্তি, ব্যাংক ঋণ, লাইসেন্স, জমি এবং ব্যবসায়িক সুরক্ষা শুধু তারাই পেতো যারা রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্যশীল ছিল বা সম্পৃক্ত ছিল। এভাবে মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং উদ্যোক্তার শক্তিকে সমুলে ধংস করে দেয়ার মাধ্যমে ক্রোনি পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। এর ফলে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে হতে শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন দেশটি অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি এমন একটি সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত, যেখানে নির্ধারিত হবে দেশ কি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্য ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে চলমান প্রবৃদ্ধির পথেই থাকবে, নাকি ন্যায়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের ওপর প্রতিষ্ঠিত নতুন অর্থনৈতিক পথে যাত্রা শুরু করবে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি কি বাস্তব অর্থে অর্থনৈতিক মুক্তিতে রূপ নেবে, যেখানে মানুষ ভয় ও পক্ষপাতের বাইরে থেকে কাজ, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের সুযোগ পাবে, নাকি অর্থনৈতিক অস্বাধীনতা সমাজের আস্থা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে তুলবে।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেখবো মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক কালে গৃহীত ‘মাদানী’ অর্থনৈতিক মডেল বাংলাদেশে অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিতকল্পে কতটুকু তাৎপর্য বহন করতে পারে।

ড. আনোয়ার ইব্রাহিম, পিপলস জাস্টিস পার্টির সভাপতি এবং পাকাতান হারাপান জোটের চেয়ারম্যান, মালয়েশিয়ার ১০ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০২২ সালে। পাশাপাশি তিনি দেশটির অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি মালয়েশিয়ার জন্য মাদানী অর্থনীতির একটি ধারণা প্রবর্তন করেন। যা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং উচ্চ-মূল্যবান অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, জাতীয় প্রতিযোগিতামূলকতা বৃদ্ধি করতে এবং ন্যায়সঙ্গত সম্পদ বণ্টন নিশ্চিত করতে চায় ।

MADANI (মাদানী) শব্দটির অর্থ হল: M= মাম্পান (স্থায়িত্ব); A= আমানাহ (ট্রাস্ট); D= দায়া সিপ্তা (উদ্ভাবন); A=আমান (করুণা/যত্ন); N=নেগারা (জাতি - প্রায়শই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নিহিত); এবং I= ইহসান (যত্ন ও করুণা/দয়া) । যে ৫টি বিষয়ে মাদানী অর্থনীতি জোর দেয় তা হচ্ছে:

১) আর্থিক সংস্কার: করের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং তেল রাজস্বের উপর নির্ভরতা হ্রাস করা।

২) ডিজিটাল রূপান্তর: প্রযুক্তি গ্রহণকে উৎসাহিত করা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য।

৩) সবুজ প্রবৃদ্ধি: নবায়নযোগ্য শক্তি এবং টেকসই অনুশীলনে বিনিয়োগ (NETR)।

৪) মানব মূলধন: অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি করা, মজুরি উন্নত করা (প্রগতিশীল মজুরি মডেল), এবং দক্ষতা বৃদ্ধি।

৫) শাসনব্যবস্থা: স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা।

মালয়েশিয়ায়, মাদানী অর্থনীতি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় জ্বালানি পরিবর্তন রোডম্যাপ (NETR), নতুন শিল্প মাস্টার প্ল্যান ২০৩০ এবং দ্বাদশ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা মধ্য-মেয়াদী পর্যালোচনা, যা পরবর্তী দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মধ্য-মেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেকারত্বের হার, দারিদ্র্যের স্তর, মুদ্রাস্ফীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং দেশের আর্থিক অবস্থা সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মাধ্যমে মাদানী অর্থনীতি কাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হলে দেখা যায় এই সূচকগুলিতে এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করেছে। বেকারত্বের হার ৩.২% এ স্থিতিশীল এবং দারিদ্র্যের হার ইতিমধ্যে ৮% হ্রাস পেয়ছে। মোট দেশজ উৎপাদন ৫.১% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি ১.৮% হ্রাস পেয়েছে এবং মোট বাণিজ্য ৯.২% বৃদ্ধি পেয়ে ২.৯ ট্রিলিয়ন MYR (৬৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) হয়েছে। অনুমোদিত বিনিয়োগের মোট পরিমাণও ১৪.৯% বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭৮.৫ বিলিয়ন MYR হয়েছে, যা ২০৭,০০০ এরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। এই ইতিবাচক ফলাফলগুলি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়ন মাদানী অর্থনৈতিক মডেলের সফলতা তুলে ধরে।

উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল প্রেরণা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। নিজস্ব সম্পদের ওপর অধিকার, ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও, সেই মৌলিক অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে। বৈষম্যমূলক সুযোগ কাঠামো, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি জনগণের বৃহৎ অংশকে স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত করেছে। বিশেষত ২০০৯–২০২৪ সময়কালে দৃশ্যমান উন্নয়নের আড়ালে ক্রোনি পুঁজিবাদের বিস্তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে আরও সংকুচিত করেছে, যার পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং অর্থনৈতিক মুক্তি পুনরুদ্ধারের একটি নির্ধারণী সুযোগ।

মালয়েশিয়ার মাদানী অর্থনৈতিক মডেল দেখায় যে নৈতিকতা, অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন ও মানবিক মূল্যবোধকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে স্থাপন করলে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ন্যায় ও স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশ যদি এই শিক্ষা আত্মস্থ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানবকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে অগ্রসর হতে পারে, তবেই একাত্তরের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা রক্ষা হবে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির অসমাপ্ত অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নেবে।