গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়; এটি একটি জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর। যে সমাজে সত্য উচ্চারণের সাহস নেই, সে সমাজ ধীরে ধীরে ন্যায়বিচার ও মানবিকতা হারিয়ে ফেলে। সাংবাদিকতা এক সাহসের নামÑ যেখানে ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা হয়, যেখানে নির্যাতিত মানুষের কান্না শব্দ হয়ে জনসমক্ষে পৌঁছে যায়, আর যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কাগজের অক্ষরেই শুরু হয়ে যায়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, কারণ আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের কার্যক্রম জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখার প্রধান দায়িত্ব এই মাধ্যমের ওপরই ন্যস্ত। নাগরিকেরা রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে তখনই, যখন তারা সঠিক, পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তথ্য পায়। স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকলে শাসকগোষ্ঠী জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে যায় এবং গণতন্ত্র কেবলই ভোটের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
গণমাধ্যম শুধু খবর পরিবেশন করে না, এটি সমাজের মনন ও মানসিকতা গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। একটি সাহসী প্রতিবেদন মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করতে পারে, আবার একটি দায়িত্বহীন সংবাদ পুরো সমাজে বিভ্রান্তি ও ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি নিহিত থাকে এর নৈতিকতায়। সত্য যাচাই, নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং মানবিক দায়িত্ববোধ বজায় রাখার দায় আছে সাংবাদিকদের। এ কারণেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো সংকটের সময়ে গণমাধ্যম হয়ে ওঠে জাতির দিশারি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সামাজিক উত্তেজনার মুহূর্তে মানুষ কী বিশ্বাস করবে, কোন্ পথে যাবেÑতার অনেকটাই নির্ভর করে সাংবাদিকদের তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর। গুজব ও অপপ্রচারের যুগে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই ভয় ও বিভ্রান্তির অন্ধকার ভেদ করে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিতে পারে।
বলা হয়ে থাকে যে, “কলম তরবারির চেয়েও শক্তিশালী”। কিন্তু এই এতক্ষণ যা বললাম কিংবা যে প্রবাদটি উদ্ধৃত করলাম- এটাই কি বর্তমান সময়ের বাস্তবতা? সম্ভবত আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে উপজীব্য বিষয়টি নতুনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর অবস্থানও এখন নড়বড়ে। পৃথিবীর অনেক নামকরা গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে গিয়েছে আবার যারা টিকে আছে তাদেরকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব মেনে নিয়েই নতুন করে কাঠামো পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। আর নতুন করে আসা গণমাধ্যমগুলো তা হোক ইলেকট্রনিক কিংবা প্রিন্ট- সবাই ডিজিটাল সংস্করণকেই অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসলেও তাদের আচরণ ও কার্যক্রম অনেকটা মূলধারার সংবিধিবদ্ধ শৃংখলার ভেতরেই হচ্ছে। অনলাইন বা ডিজিটাল সংস্করণেও তারা যথাসম্ভব সংবাদের যথার্থতা যাচাই করেন, তথ্য বাছবিচার করেন। তারা অন্তত দায়িত্বশীলতার সাথে সংবাদ পরিবেশন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যদিও সম্প্রতি মূল ধারার কিছু সংবাদপত্রের বিরুদ্ধেও সাম্প্রতিক সময়ে কপি করে নিউজ ছাপানো বা চ্যাট জিপিটি ব্যবহারের অভিযোগ আসছে; তবে মোটাদাগে তাদের কার্যক্রমে অনেকটা পেশাদারিত্ব এখনো বিদ্যমান। কিন্তু যারা সংবাদপত্রের এই কাঠামো বা বিদ্যমান আইনকে সেভাবে ধারণ করেন না; যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ভর করেই সাংবাদিক আদলে কাজ করছেন- তাদের কারণে সমস্যা ও সংকট বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। এই সংকটগুলো তৈরি হচ্ছে রাজনীতি সংক্রান্ত খবরের ক্ষেত্রে, কিংবা খেলাধুলায় অথবা বিনোদন জগতে। সবখানেই এই সংকটগুলো দেখা দিচ্ছে এবং এগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের আলোচনাও হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই প্ল্যাটফর্মগুলো অসংখ্য তথাকথিত “ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর”-এর জন্ম দিয়েছে, যারা কোনো আনুষ্ঠানিক জবাবদিহিতার আওতায় না থেকেও সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন। তারা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবীদ বা নীতি নির্ধারক অনেকের কাছেই অবলীলায় পৌঁছে যাচ্ছেন। আর নীতি নির্ধারকেরাও মূল গণমাধ্যম আর ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট নির্মাতাদের পার্থক্য নিরূপণ করতে না পারায় তাদেরকে সহজেই একসেস দিচ্ছেন। অনেকক্ষেত্রে তারা ভিউ বা সাবসক্রাইবার দেখে এই ফাঁদে পড়ছেন। ফলত, নানা সময়ে সম্মানিত অনেককেই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতার দায় না থাকায় এই ধরনের কনটেন্ট নির্মাতারা কেবল ভিউ বাড়ানোর জন্যই কাজ করেন। এ কারণে চারপাশে অনেক ইতিবাচক ঘটনা বা দৃষ্টান্ত থাকলেও তারা সমাজের দুর্বলতা ও নেতিবাচকতা নিয়েই বেশি কাজ করেন। প্রশ্নের মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে বিব্রত করাকে তারা সফলতা মনে করেন।
একটি মতের লোকদের সাথে বিপরীত মতের সমর্থকদের তারা বিরোধ লাগিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। এমনটা তারা করেন আলোচনায় থাকার জন্য কিংবা বেশি সংখ্যক দর্শককে আকৃষ্ট করার জন্য। আর এভাবে সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে তারা বিদ্যমান বিভাজনকে আরো বেশি গভীরতর করা ও বিরোধকে প্রকট পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সচেতনভাবে হোক কিংবা অসচেতনভাবে, তারা প্রায়ই মিথ্যার সঙ্গে অর্ধসত্য মিশিয়ে, তথ্য বিকৃত করে, অন্যদের ভুলভাবে উদ্ধৃত করে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে সুবিধাজনক তথ্য বেছে নিয়ে প্রচার করেন বা করছেন।
কনটেন্ট নির্মাতাদের এই ট্রেন্ডগুলো বর্তমানে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, মানুষ দেখছে। অনেক বছর সাংবাদিকতা করেও যেখানে একজন মানুষ পর্যাপ্ত ফোকাস বা প্রোমোশন পাচ্ছেন না; সেখানে অল্প কয়েকদিন কাজ করেই কিংবা আলোচিত কিছু কনটেন্ট তৈরি করেই অথবা বিস্ফোরক কিছু তথ্য দিয়েই এই কনটেন্ট নির্মাতারা পরিচিত হয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সংস্থা ও প্লাটফর্ম কিংবা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এই আগুনে আরো যেন ঘি ঢালছেন। বর্নাঢ্য সব আয়োজন করে তাদেরকে পুরস্কৃত করছেন। রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা তাদের স্বীকৃতি প্রদান করছেন। কর্তা ব্যক্তিদের সাথে ছবি তুলে এবং সেগুলো প্রচার করে এই ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট নির্মাতারা আগের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। আর এখানে সবচেয়ে বড়ো যে সংকট বা চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে তাহলো, পেশাদার সাংবাদিকতা ও ইনফ্লুয়েন্সার/ কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে পার্থক্যের সীমাটি ক্রমশ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এই নির্মম বাস্তবতা চলমান ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পেশাদার সাংবাদিক ও আত্মপ্রচারক ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে না পারায় সমাজের প্রভাবশালী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবাই হরহামেশাই প্রতারণার ভিকটিম হচ্ছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে লোকজন জড়ো করে একটি সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগও কারো কারো বিরুদ্ধে এসেছে। এই অভিযোগ সত্য কিনা তা যাচাই করা যেতে পারে। তবে বিভিন্ন কনটেন্টের নীচে মানুষের কমেন্ট পড়লে বোঝা যায় এগুলো মানুষকে উত্তেজিত করছে। আমরা হরহামেশাই সমাজের স্থিতিশীলতার সংকট, সামাজিক কাঠামোগুলো ভেঙে পড়া এবং মানুষের মধ্যকার সহমর্মিতা কমে যাওয়া নিয়ে আফসোস করি। কিন্তু এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার নেপথ্যে যে, এরকম কিছু অসহিষ্ণু কনটেন্টের প্রভাব আছে তা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করি না। এমনকি শুধু রাজনৈতিক কনটেন্ট দিয়েই নয়; বরং ধর্মীয় অপব্যাখ্যা করেও অনেক মানুষকে উত্তেজিত করা হয়। আবার অপব্যাখ্যা বা বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে অনেক ধার্মিক মানুষকে প্রথাগত ধর্মীয় অনুশীলন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে নিয়মিতই।
যেমনটা আগেও বলেছি; সংবাদপত্র ও সম্প্রচার মাধ্যমে কর্মরত পেশাদার সাংবাদিকরাÑযারা পরিশ্রম করে তথ্য যাচাই করেন, সম্পাদকীয় বিচক্ষণতা প্রয়োগ করেন, ও পেশাগত নীতিশাস্ত্র মেনে চলেনÑ তারা তথ্য নিয়ে চলমান এই যুদ্ধে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন। বিপরীতে, ইনফ্লুয়েন্সাররা জনপ্রিয়তা, লাইক ও কনটেন্ট-নির্ভর আয়ের অতৃপ্ত ক্ষুধায় চালিত হয়ে প্রায়ই তথ্য বিকৃত করেন বা নিজেদের এজেন্ডা অনুযায়ী মিথ্যা ছড়িয়ে আলোচনায় থেকে যাচ্ছেন। সম্প্রতি আরেকটি ট্রেন্ডও দেখা দিচ্ছে। অনেক পরিচিত সাংবাদিকও নানা কারণে মূলধারার গণমাধ্যমে টিকে থাকতে না পেরে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে যোগ দিচ্ছেন। এটি দোষনীয় বা অপ্রত্যাশিত নয়। তাছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার ও স্বাধীনতা সবারই থাকা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন জাগে তখন যখন দেখি, সাংবাদিকতায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অনেকেই কেবলমাত্র সস্তা জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা চরিতার্থ করার জন্য এত বছর ধরে শিখে আসা নৈতিকতার মানদণ্ড বিসর্জন দিয়ে ফেলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অনেকক্ষেত্রেই তারা নিজেদের স্ট্যান্ডার্ড কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের থেকেও নীচে নামিয়ে ফেলেন।
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মিডিয়া সম্পর্কে ধারনা এখনো ততটা উন্নত নয়। ফলে হিংসা বিদ্বেষ ও ঘৃণার চাষাবাদ করা এখানে বেশ সহজ। এর ফলে, রাজনীতিবিদ, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই অনলাইন হয়রানির ঝুঁকিতে পড়ে গেছেন। গঠনমূলক বিতর্ক বা পাল্টা যুক্তি উপস্থাপনের পরিবর্তে এখন প্রতিপক্ষকে অবমাননাকর উপাধিতে ডাকা, তথ্য বিকৃত করা, কিংবা অশালীন ভাষায় আক্রমণ করার প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা যায়। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় “রাজাকার” ট্যাগ দিয়ে অনেককে কোনঠাসা করা হয়েছিল। মিডিয়া কারো কারো জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে তুলতে পারে তা আমরা আওয়ামী আমলে দেখেছি। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে আবার ফিরে আসুক তা মোটেও কাম্য নয়।
সম্প্রতি আমরা এমন অনেক উদ্বেগজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, এর মধ্যে কিছু ঘটনা একদমই অপ্রত্যাশিত। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে নিয়েও এসব তথাকথিত সামাজিক গণমাধ্যমে ধুম্রজাল তৈরি করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্ক্া করেন, অরাজকতা তৈরি ও নির্বাচনী রূপরেখা বানচাল করার জন্যও এমনটা করা হতে পারে। আরেকটি বিষয় নিয়েও অনেকে শংকায় আছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মিডিয়াগুলো একপেশেভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে নেমে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষদের নানাভাবে বিতর্কিত করতে তারা দেশজুড়ে ক্যাম্পেইন চালিয়েছিল। এবার ধারনা করা হচ্ছে, মূল ধারার মিডিয়ার পাশাপাশি তথাকথিত ইউটিউবার বা ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনের আগে এরকম পক্ষপাতমূলক কার্যক্রমে নেমে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ফেসবুক ও ইউটিউব ডিজিটাল লড়াইয়ের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। আর বৈশ্বিকভাবে এ ভূমিকা পালন করছে এক্স (সাবেক টুইটার)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা শুধু বাংলাদেশের জন্যই হুমকি নয়। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের তদন্তে দেখা যায়, এই প্ল্যাটফর্মগুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিতে সহায়তা করেছিল, যা অনেকের মতে একপ্রকার গণহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২১ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটা-র বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
অবশ্য সামাজিকভাবে লজ্জা দেওয়া বা “সোশ্যাল শেমিং” নতুন কিছু নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যাদের সবচেয়ে বেশি টার্গেট করা হয় তারা কালোবাজারি, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকার বা ভেজাল খাদ্য ব্যবসায়ী নন; বরং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও জনপরিচিত ব্যক্তিরাই এই সমন্বিত আক্রমণের শিকার হন। আওয়ামী লীগ যেমন বিগত সাড়ে ১৫ বছরে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্মূল করার অভিপ্রায়ে রীতিমতো ফ্যাসিবাদী দলে পরিণত হয়েছিল, এখনও কারো কারো কন্ঠে প্রতিপক্ষকে নির্মুল করার সেই আওয়াজ আবারও যেন শোনা যাচ্ছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে, সহিংসতা বাড়বে, এবং আসন্ন নির্বাচন শংকার মুখে পড়বে।
এই অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতিক্রিয়া একেবারেই সন্তোষজনক নয়। কিছু সমালোচক এমনও অভিযোগ করেন যে, সরকার নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত হয়ে যান। বিষয়টি এরকমই কিনা তা আমাদের পক্ষে মুল্যায়ন করা কঠিন। তবে এখন আর নিষ্ক্রিয় থাকারও তো কোনো সুযোগ নেই। সময়ের চাহিদাকে মুল্যায়ন করতেই হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকৃত সাংবাদিকতার চর্চা হয় না; এই যুক্তিতে কোনো প্লাটফর্ম বন্ধ করা সমীচীন নয়। শেখ হাসিনা যেভাবে ইন্টারনেট শাটডাউন করেছিলেন তেমনটাও বাংলাদেশে আর কখনো হোক তাও প্রত্যাশিত নয়। তবে সরকারের কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক ও সোচ্চার হওয়া উচিত। পাশাপাশি, এই কনটেন্ট নির্মাতাদের একটি কাঠামোর আওতায় এনে তাদেরকে সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও সামাজিক ও নৈতিক মুল্যবোধ সম্পর্কে ধারনা দেয়া উচিত বলে মনে করি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ নয়; বরং এই প্রক্রিয়াকে সমাজকে প্রতারণা, বিভাজন ও সহিংসতা থেকে রক্ষা করার পথে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।