সাঈদী সাহেবের সাক্ষীকে যদি ভারতে পাওয়া যায়, সালাহ উদ্দীন সাহেবকে যদি ভারতে পাওয়া যায়, আমার ভাই ইলিয়াস আলীর লাশ যদি সাগরে ভেসে যায়, আমার ভাই আবরার যদি দিল্লীর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে শহীদ হয়ে যায়, আমার বোন ফেলানীর লাশ যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকে। তাহলে আমাদের স্বাধীনতা আছে, সার্বভৌমত্ব আছে কে বললো ? সুতরাং আমাদের লড়াই সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার লড়াই, যেই বাংলাদেশের সীমান্ত, স্বাধীনতা, যেই বাংলদেশের সমস্ত সিদ্ধান্ত একক কোন রাজনৈতিক দল নয়, কোন বিদেশী বন্ধু নয়—- সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বাংলাদেশের জনগণ। এবং সেই লড়াইয়ের রাজনীতি-ই ওসমান হাদির রাজনীতি, বাংলাদেশের রাজনীতি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার সুবাদে আবারো যখন শহীদ ওসমান হাদির এই বক্তব্য শুনছিলাম তখন শহীদ ইলিয়াস আলীর একটি বক্তব্য সামনে আসে। আর তার হলো বক্তব্য টা ছিল এরকম—। আর এই করিডোর বাস্তবায়িত হলেই ভারতের গাড়ি যাবে আমাদের ওপর দিয়ে। শুধু গাড়ি যাবে না, তাদের সাধারণ জিনিসপত্র যাবে না, মালামাল যাবে না। এই রাস্তা দিয়ে তাদের আর্মস যাবে। গোলাবারদ যাবে, তাদের সোর্জাররা যাবে। আমার দেশের ওপর দিয়ে রাস্তা দেওয়ার পর তাদের সোর্জার আর গোলাবারদ যদি যায়। ভারতের মতো বিশাল রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মত ছোট রাষ্ট্রের কোন স্বাধীন অস্তিত্ব থাকবে বলেন?
এইতো গেল দুই শহীদের বক্তব্য। এবার আপনাদের মনে করে দিবো শহীদ আবরার কি লিখেছিলেন, আবরার জীবনের সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন— প্রথমত, “৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো।
বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে”। দ্বিতীয়ত— কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব। তৃতীয়ত —- কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব। হয়তো এ সুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
এতো গেল তিন বিপ্লবীর কথা। তারা জনমনে বিপ্লবের ঝড় তুলেছিলেন। অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের শহীদ করা হয়েছে জুলাই বিপ্লবে ঝড় তুলেছিল শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুদ্ধ, ওয়াসীমসহ নাম না জানা আরও কত শত শহীদ। হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। গুমখুনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য। হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে গেছেন দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদরা। গুরুতর আহত হয়ে আজও জিন্দা শহীদ হয়ে আছেন বহুসংখ্যক জুলাইযোদ্ধা।
এর আগে দেখা গেল দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় কথা বলতে গিয়ে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ মাওলানা নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা, সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী। আল্লামা সাঈদীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার জন্য কি নাটকটা না করা হলো। সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে নিখোঁজ করে সীমানার ওপারে ফেলে দেওয়া হলো।
সুখরঞ্জন বলেন, ‘আমাকে জোর করে বিএসএফ-এর কাছে দিয়ে আসে। এ সময় আমি দেখতে পাই গাড়িতে ৬-৭ জন সবুজ পোশাকের পুলিশের সাথে দু’জন বিজিবি সদস্য আছেন। তখন আমি বুঝতে পারি গাড়ি থামিয়ে যাদের নেওয়া হয় তারাই বিজিবি।’ ‘আমি যেতে না চাইলে জোর করে তারা আমাকে ধরে বিএসএফ সদস্যদের হাতে তুলে দেয়। বিএসএফ কিছু জিজ্ঞেস না করেই আমাকে প্রচণ্ড মারপিট শুরু করে। একপর্যায়ে বিএসএফ মোটা দড়ি দিয়ে পেছন দিক দিয়ে আমার হাত বেঁধে ফেলে।’ এরপর বশিরহাট জেলে আমাকে বাইশ দিন রাখা হয়। সেখানে একদিন আমাকে কোর্টেও নেওয়া হয়। এরপর আসা হয় দমদম জেলে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে ৫ বছর জেল খেটে আমি মুক্ত হয়ে দেশে ফেরত আসতে পারি।’
এবার আসি শরিফ ওসমান হাদির কথায়। তিনি বলেছেন, আমাদের লড়াই সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার লড়াই। বিজয়ের ৫৪ বছর পর ২০২৪ সালে মানুষ প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনতা সার্বভৌত্বের জন্য রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু কিছুদিন পরই সেই লক্ষ্য যেন চ্যুত হয়ে পড়েছিল। হাদি সেই লড়াইটা টিকিয়ে রাখার জন্য ইনকিলাবমঞ্চ বানিয়েছিল। তার কথা ছিল যেই বাংলাদেশের সীমান্ত, স্বাধীনতা, যেই বাংলদেশের সমস্ত সিদ্ধান্ত একক কোন রাজনৈতিক দল নয়, কোন বিদেশী বন্ধু নয়—- সিদ্ধন্ত গ্রহণ করবে বাংলাদেশের জনগণ।
বাংলাদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নিবে এমন পরিবেশ আজও আমার দেশে আসেনি। সেই পরিবেশ আপনাআপনি আসবেও না। যেন কোনদিন না আসে, সেজন্যই হাদিকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। একাজ করে সম্ভবত এটাই জানান দেওয়া হয়েছে আর কোন মা-বাবা যেন হাদি আবরারদের জন্ম না দেয়। কিন্তু আমরা কি দেখলাম। আবরার হাদিদের সরিয়ে দেওয়ার পর হাজার হাজার আবরার হাদির জন্ম হলো এই বাংলায়। থেমে যায়নি হাদি আবরারের স্বপ্ন। জুলাই যোদ্ধাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আজ ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার ধ্বনি, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার, ইনসাফ কায়েমের জয়গান। সব ষড়যন্ত্র উতরে গিয়ে শহীদদের রক্তের বদলা নেওয়ার নেশা।
দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যারাই কণ্ঠকে উচ্চকিত করতে চেয়েছেন তাদেরকেই পরপারে চলে যেতে হয়েছে। শহীদ হতে হয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ বিপ্লবী শহীদ শরিফ বিন আব্দুল হাদি। তাদের হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে হৈ চৈ শুরু হলেও পরে একটা সময় সেই প্রতিবাদ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আর এদের হত্যার বিচারের বাণি নিভৃতে কাদে যুগের পর যুগ। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের আন্দোলন এবং বিপ্লবটাও হয়েছে দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষেই। চরম সত্য হলো- এই জুলাইয়ের স্পিরিটটাকেও ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য স্বার্থান্বেষী শক্তিশালী পক্ষ বিপ্লবের পর থেকেই নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সেই প্রচেষ্টা অনেকাংশে সফলতার দিকে যাচ্ছিল। তাদের সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য শহীদ শরিফ বিন আব্দুুল হাদি জেগে উঠেছিল। ইনকিলাম মঞ্চ নামের প্লাফর্মের মাধ্যমে তার আওয়াজ দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল। হাদির ক্ষুরধার আলোচনা, বক্তব্য এবং অবস্থানের কারণে দেশের স্বাধীনতা সার্বোভৌম্বত্বের পক্ষে মানুষ জেগে উঠছিল। সম্ভবত এই হাদির সাথে ষড়যন্ত্রকারীরা পেরে উঠছিল না। তাই হাদিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওই শক্তিশালী মহল। এবং নির্বাচনী প্রচারণার জন্য যাওয়ার পথে তাকে গুলি করে হত্যা করে।
বাস্তবতা হলো— হাদিকে শহীদ করে দিয়ে যে আগুন নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করিছিল ষড়যন্ত্রকারীরা ; এবার সেই আগুন আরও দাউ দ্উা করে জ¦লে উঠলো তারুণ্যের মধ্যে। তারুণ্য থেকে তা ছড়িয়ে পড়লো নারী পুরুষ নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধের মাঝেও। মাঠ-ঘাটসহ বিভিন্ন প্রান্তর পেরিয়ে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার-হাজার লাখ-লাখ কণ্ঠে আজ আওয়াজ উঠেছে—- তুমি কে ? আমি কে ? হাদি- হাদি। ‘আমরা সবাই হাদি হবো, গুলির মুখে কথা কবো’। আমরা সবাই হাদি হবো, হাজার বছর লড়ে যাবো। এই আওয়াজে, এই স্লোগানে আজ কোটি তরুণ হাদি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, হাদির দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। হাদির মতো রাজপথ কাঁপাতে প্রস্তুত, হাদির মতো বিপ্লবী হতে প্রস্তুত।
হাদির বিপ্লবের দায় কাঁধে তুলে নিয়েছে তারুণ্য। যেহেতু তারা বুঝে গেছে দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় হাদির পথ-ই সঠিক পথ, সেহেতু তাদের এবার দমন করা মনে হয় এতোটা সহজ হবে না।