জুলাই শহীদ এবং আহত জুলাইযোদ্ধাদের রক্তাক্ত ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ ফ্যাসিস্টমুক্ত হতে পেরেছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ জন শহীদ সাংবাদিক ও পাঁচ শতাধিক আহত সাংবাদিকের সাহসী ভূমিকার কথা যেন আমরা ভুলে না যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৪৬জন কুরআনে হাফেজসহ শতাধিক শহীদ ও ১০ সহস্রাধিক আহত আলেম ও মাদ্রাসার ছাত্রদের ঐতিহাসিক অবদান আমাদেরকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ রাখতে হবে, তবেই আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে তাদেরকে সহযোদ্ধা হিসেবে পাব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ দুই শতাধিক শ্রমিকসহ দুই সহস্রাধিক শহীদ ও ৪০ সহস্রাধিক আহত ছাত্র-জনতা এবং চোখ হারানো দুই সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা যারা ফ্যাসিস্টমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়তে রাজপথে জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছেন। তারা আমাদের স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়তে প্রেরণা জোগাবে।

এক. আমি, দেখিনি ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, আমি দেখিনি ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান! আমি, দেখিনি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ! তবে, আমি দেখেছি ২৪-এর গণবিপ্লব; ১৫ই জুলাইয়ে আমার ভাই-বোনদের এবং সাধারণ জনগণের রক্তে-মাখা রাজপথ! আমি দেখেছি মিছিল সেøাগানে কাঁপানো রাজপথ, আমি, দেখেছি ২৪-এর কোটা আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা আমার ভাইদের পড়ে থাকা নিথর রক্তাক্ত দেহ! আমরা চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার। ‘‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার!; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার’’ যে স্লোগান দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সারাদেশকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। যেমন কাপিয়ে তুলেছিল স্বৈরাচারী গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার মসনদ। তরুণ প্রজন্মের এই রুখে দাঁড়ানোর আখ্যানই হলো ‘২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

দুই. ছাত্র-জনতার এক রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, বর্তমানে জুলাই গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত পলাতক আসামি। এশিয়ার দানব খ্যাত কুখ্যাত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের প্রাথমিক কারণ হলো, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলি বর্ষণে শতশত মানুষ হত্যা। এ সময় অন্তত দুই সহস্রাধিক মানুষ নিহত ও ৪০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। তবে এ প্রাথমিক কারণের পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলজুড়ে ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ, বিরোধীদল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও পুলিশি নিপীড়ন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণের নামে ব্যাংক লুণ্ঠন, সরকার ঘনিষ্ঠদের ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থপাচার, সচিবালয় থেকে বিচার বিভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক দলীয়করণ, দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি, ভারতের সঙ্গে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি কারণে সৃষ্ট গভীর জন অসন্তোষ। এইসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জমানো সীমাহীন ক্ষোভ থেকে দেশের সাধারণ জনগণ ছাত্রদের আন্দোলনের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে। ছাত্রদের আন্দোলনের ৯ দফা থেকে ১ দফায় রূপলাভ করে। সমন্বয়কদের সীমাহীন সাহসী ত্যাগ স্বীকার করা ঐতিহাসিক ভূমিকা। ৫ আগস্ট ২০২৪ সোমবার ভোর থেকেই শাহবাগে জমায়েত হয়ে গণভবন অভিমুখে ছাত্র-জনতা মার্চ শুরু করে এবং এরই মধ্যদিয়ে পতন হয় এশিয়ার দানব খ্যাত কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। দেশের ইতিহাসে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর এমন তীব্র গণআন্দোলন আর হয়নি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে রাজধানীর সড়কগুলোয় নামে লাখো মানুষের ঢল। উল্লাসে ফেটে পড়ে দেশের জনগণ। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদ ভবনে ঢুকে পড়ে সাধারণ মানুষ এবং আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ছাদে উঠেও ছাত্র-জনতাকে উল্লাস করতে দেখা যায়। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিত ভোটের মধ্য দিয়ে ফের ক্ষমতায় আসেন তিনি। আর সবশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে এ ডামি মার্কা নির্বাচনও ছিল বিতর্কিত। এরপর মাত্র প্রায় ৭ মাস দীর্ঘ হয় তার শাসনামল।

তিন. এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আমার লেখা ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বইটিতে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের বিবরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২৪-এর গণবিপ্লবের বিবরণের পাশাপাশি কীভাবে ইতিহাসের কুখ্যাত স্বৈরাচার গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা, তার দলীয় সমর্থক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার বিবরণ তুলেধরা হয়েছে। কেউ কেউ শতাধিক রাবার বুলেট শরীরে বহন করে বেড়াচ্ছেন। আমার বইটিতে সচিত্র প্রতিবেদন এবং শহীদ ও আহতদের পরিসংখ্যান এবং বীরত্বগাঁথা জীবনের বর্ণনা করা হয়েছে।

চার. বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনাই একমাত্র স্বৈরাচার সরকারপ্রধান, যিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পরপরই কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়। ৫ আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় ইতিহাসের কুখ্যাত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। এর মধ্যদিয়েই পতন হয়েছে তার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসন। এ সময়কালে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বিরোধী মত দমনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহার, ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া, বার বার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, গুম-খুন, ক্রসফায়ার, হেফাজতের শাপলা চত্বর ও পিলখানা হত্যাকাণ্ড, আয়নাঘর (গুম করা মানুষদের নির্যাতনের স্থান), প্রশ্নবিদ্ধ ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারতকে বিশেষ বিশেষ সুবিধা প্রদান, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। বাধাগ্রস্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সংকটে পড়েছে অর্থনীতি।

পাঁচ. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত সংগঠনটি মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে অসহযোগ গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাসের কুখ্যাত স্বৈরাচার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ২০২৪ সালের ১ জুলাই সংগঠনটি সৃষ্টি হয় এবং সৃষ্টির পরপরই আন্দোলন সফল করার জন্য ৮ জুলাই ২০২৪ সংগঠনটি ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি ঘোষণা করে, যার মধ্যে ২৩ জন সমন্বয়ক ও ৪২ জন সহ-সমন্বয়ক ছিলেন। যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত রশিদ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সারজিস আলম, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আবদুল্লাহ, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের আসিফ মাহমুদ, ভূগোল বিভাগের আবু বাকের মজুমদার, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সাদিক কাইয়ুম, আব্দুল কাদের, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ সোহেল এবং সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদসহ অন্যান্য।

ছয়. ১৪ জুলাই ২০২৪ চীন সফর নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা কোটা পাবে না তো কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’ তার এ বক্তব্যের পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন পায় নতুন মাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল বের হয়, ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার’; ‘কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। পরদিন সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক বক্তব্যে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঔদ্ধত্যের জবাব দেবে ছাত্রলীগ।’ মূলত এরপরই সোমবার ১৫ জুলাই ২০২৪ অহিংস এই আন্দোলন সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমে আন্দোলন প্রতিহত করতে নামেন সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও আওয়ামী হায়েনাদের দলীয় সমর্থকেরা। পরে নামানো হয় পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীকে। একই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের ওপর রড, লাঠি, হকি স্টিক, রামদা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করা হয়। একই সাথে পুলিশও লাঠি, রাবার বুলেট-টিয়ারসেল দিয়ে হামলা করে। এতে সারাদেশে আন্দোলনের প্রথম ক’দিনেই নিহত হন প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-জনতা। আহত ও গ্রেফতার হয় ১১ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী গুন্ডারা। এর প্রতিবাদে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর পরের দিন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ডাক দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে সাড়া দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে পুলিশ গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ পাশবিক ঘটনা দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। যার ফলে গণহত্যাকারী স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের ক্ষমতায় থাকার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০ জুলাই ২০২৪ দেশজুড়ে কারফিউ ঘোষণা করা হয়, মোতায়েন করা হয় সেনাসদস্যদের। এর আগের দিন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বলা হয়, দাবি না মানা পর্যন্ত চলবে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। এরপর থেকেই এ আন্দোলন ধীরে ধীরে গণ-আন্দোলন রূপ নেয়। এর মধ্যে সারাদেশে কয়েক দফা সব ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। আবার দেওয়া হয় কারফিউ, ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি, নিষিদ্ধ করা হয় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি।

সাত. জুলাই বিপ্লবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হন পাঁচ সাংবাদিক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশের ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় মেহেদীর বুক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মেহেদী অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করতেন। সেদিন যাত্রবাড়ীতে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গিয়ে তিনি শহীদ হন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন মেহেদীসহ পাঁচজন সাংবাদিক। তাদের মধ্যে তিনজন শহীদ হয়েছেন রাজধানী ঢাকায়; একজন সিলেটে, আরেকজন হবিগঞ্জে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হন মেহেদী হাসান, উত্তরায় শাকিল হোসেন ও ধানমন্ডিতে তাহির জামান। এ ছাড়া সিলেট শহরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হন সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব আর হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে শহীদ হন সোহেল আখঞ্জী। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সারাদেশে শহীদ হয়েছেন ৮৪৪ জন। এ তালিকায় শহীদ পাঁচ সাংবাদিকের নাম রয়েছে।

আট. ফ্যাসিস্টের পতন ও জুলাই বিপ্লবে শ্রমিকরাও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। কমপক্ষে ২৮৪ জন শ্রমজীবী মানুষ গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয় দুই শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ এবং আহত হয় ১০ সহস্রাধিক শ্রমজীবী মানুষ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাদের ৩৫ শতাংশ শ্রমজীবী, ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, ১৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং ১৩ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ, ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুকের মৃত্যুর পর থেকে আন্দোলন ক্রমশ ঢাকার আশেপাশে শ্রমিক এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন মেনে নিতে পারেনি সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিকরা। নানা মাত্রায়, কায়দায় আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে, সমর্থন জুগিয়েছে শ্রমিকারা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার এ গণ-অভ্যুত্থানে সহিংসতায় অন্তত ১১২ শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

নয়. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসার ছাত্র ও আলেমদের অবদান ঐতিহাসিক। ২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণপ্রতিরোধের প্রতিটি স্তরে স্তরে মাদ্রাসার ছাত্র ও আলেমদের সিগনিফিক্যান্ট স্টোরি, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। আগামীর বাংলাদেশে যেখানে বৈষম্য থাকবে না, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার থাকবে, ইনসাফ ও ন্যায় বিচার থাকবে এবং মানুষের ভোটের অধিকার থাকবে, এমন একটি সুন্দর স্বপ্নে জন্মভূমি গড়তেই অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল হাজার হাজার তরুণ আলেম, হাফেজ এবং আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৪৬ জন আল কুরআনের হাফেজসহ শতাধিক আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী শহীদ হন। বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদমুক্ত করার পটভূমি তৈরি করেছেন রংপুরের বীর শহীদ আবু সাঈদ। ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা ৩৬ দিনে দেখতে পেয়েছি বিভিন্ন বাঁকের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন এগিয়ে গেছে। সেই বাঁকের মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিল ইসলামী দলগুলো, আলেম-উলামা, হাফেজরা এবং আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যাদের কোটার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু দেশকে ইতিহাসের ভয়ংকর নিষ্ঠুর কুখ্যাত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দুঃশাসন থেকে মুক্ত করতে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল এবং রাজপথে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল। যার প্রমাণ আমরা দেখেছি যাত্রাবাড়ী-চিটাগাং রোড, সাভার, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা-রামপুরা, টঙ্গী ও উত্তরাসহ সারাদেশে। আন্দোলনের শুরু থেকেই বন্দুকের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিল মাদ্রাসার ছাত্র, হাফেজ ও আলেমরা। পুলিশ ও ভয়ংকর খুনি শেখ হাসিনাকে চোখ রাঙিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল সারাদেশের মাদ্রাসার ছাত্র ও আলেমরা, যারা বিভিন্ন স্তরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে ও সাহসী ভূমিকা রেখেছে। ইতিহাসের ভয়ংকর নিষ্ঠুর কুখ্যাত খুনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যায়।

দশ. বিভাজনের রাজনীতি জাতির জন্য গোলামি ডেকে আনতে পারে। রাজনীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে নানা মত ও পথ থাকবে। কিন্তু দেশের প্রশ্নে সব মত-পথ একপথে এসে মিলিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। জাতীয় জীবনে বিভাজনের রাজনীতি দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনে। বর্তমান সময়ে একটু ভুলের কারণে গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকেই ফিরে আসার পথ সুগম করে দিতে পারে। ফ্যাসিস্ট গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ কি আদৌ কার্যকর কোনো রাজনৈতিক দল ছিল, এটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন? যে নতুন প্রজন্ম জুলাই অত্যুখানে নেতৃত্ব দিয়েছে, রক্তক্ষয়ী একটি সংঘাতের মধ্য নিয়ে হাজারো শহীদের জীবনের বিনিময়ে ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জাতির ঐক্য ধরে রাখতে পারা। পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি কি জুলাই গণহত্যার বিচার, ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসরদের বিচারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে কাজ করবে? বাংলাদেশ আজ তাকিয়ে আছে সেই উত্তরদাতাদের দিকে। যারা বিভাজন নয়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যতের নকশা আঁকবে। দেশের জন্য জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে ফ্যাসিস্টদের আবর্জনা পরিষ্কার করবে। এটা এখন সারা দেশের মানুষ দেখতে চায়।

এগারো. বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা পরিবর্তন ও উত্থান-পতন চলতেই থাকে। তবে, আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বিশেষত ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ঘটে যাওয়া বিপ্লবের পর, দেশের উন্নয়ন ধারার প্রতি নানান প্রশ্ন উঠেছে এবং সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। এই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের উন্নতির জন্য কিছু মৌলিক সংস্কারের কথা এখন সময়োপযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে, আমরা বাংলাদেশে বিপ্লবোত্তর যে সংস্কার প্রয়োজন কিছু সংস্কারের কথা বলবো, যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, অর্থব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা। দীর্ঘ দিন একটি দেশ নির্বাচনবিহীন থাকলে দেশের উপরে পরাশক্তিগুলো আধিপত্যবাদ বিস্তার করে। এবং পলাকত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা দেশের ভিতরে নানান ষড়যন্ত্রের শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে পারে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ব্যহত করতে পাবে। তাই জুলাই আকাক্সক্ষার আলোকে নতুন বাংলাদেশ গড়তে নির্বাচনের বিকল্প নেই।

সূত্র: ঢাকা টাইমস, দৈনিক যুগান্তর, প্রথমআলো, দৈনিক সংগ্রাম, নয়াদিগন্ত, ভয়েস অফ আমেরিকা, বিবিসি, আল জাজিরা, আজকের পত্রিকা।