যুগে যুগে বিপ্লব জাতিকে সাহসী ও শক্তিমান করে তুলেছে। পৃথিবী তার উজ্জ্বল সাক্ষী। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাঙালি জাতির জন্য একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘ ১৬ টি বছর জাতির ঘাড়ে অন্যায়ভাবে চেপে বসা স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা দেশকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিমজ্জিত করে। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জুলুম নির্যাতন অত্যাচারের অবসান ঘটে। আমাদের জানা রয়েছে ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাত হেরোডোটাস কয়েক হাজার বছর আগে বলে গেছেন, “রাজনৈতিক অনিয়ম যখন সবচেয়ে বড় নিয়ম হয়ে যায়, তখন সভ্যতাকে রক্ষার দায়িত্ব প্রকৃতির ওপর বর্তায়। প্রকৃতি সময় মতো তার কর্তৃত্বকে বিস্তার করে শাসকের শোষিত বন্দিশালায় আগুন জ্বালায়। পরাশক্তির হাত থেকে দেশমাতৃকাকে উদ্ধার করে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য করে। সর্বোপরি যুগে যুগে ছাত্রদের বহমান বিভিন্ন বিপ্লব পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। জুলাই বিপ্লব সেই পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক দালিলিক নিদর্শন। ১৯৬৮ সালের চেকোস্লাভিয়ায় প্রাগ বসন্ত কিংবা আরব দেশে আরবদের স্বৈরাচারী সরকারদের বিরুদ্ধে আরব বসন্ত জানান দেয় ছাত্রদের ভূমিকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ইতিহাসের সাক্ষী ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত শক্তির বহিঃপ্রকাশ। একের পর এক দুর্নীতি, গুম, খুন, রাহাজানি, বিচার বহির্ভূত হত্যা, কিডনাফ, আয়নাঘরের আবিষ্কার, গণহত্যা ও কর্তৃত্ববাদী শাসকের জনবিচ্ছিন্নতার কারণে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার আসন থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে। মানুষের মাঝে বছরের পর বছর ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকা অসন্তোষের কালো মেঘ ঝরে গেছে। কোনো বহিরাগত শত্রুর সাথে যুদ্ধ নয়, অভ্যন্তরীণ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমেই ঝরে পড়ে ফ্যাসিবাদের সেই কালো মেঘ। এই মেঘ নিকষ কালো হয়ে স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে কালবৈশাখীর রূপ নেয়। পরে কালবৈশাখী লণ্ডভণ্ড করে দেয় দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া শাসকদের অস্ত্র। অত্যাচারী সেই শাসককে ক্ষমতা থেকে পর্যবসিত করে দেশান্তরিত হতে বাধ্য করে জুলাই বিপ্লবের উন্মাদনা ও চেতনা। তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন স্বৈরাচারী শাসকদের বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল জনগণের সম্পদে গড়ে তোলা অত্যাচারী শাসকের সিংহাসন চিরস্থায়ী নয়। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে না পারলে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। ফ্যাসিবাদী চরিত্র কখনো জাতিকে কল্যাণের পথ দেখাতে পারে না। তাই জুলাই বিপ্লব জাতির জন্য অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং এ বিপ্লবের মাধ্যমে ৫ আগস্ট ২০২৪ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পলায়নের মাধ্যমে জাতি নতুনভাবে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের সাহসী যোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদীর রক্তদানের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে জাতির জন্য আরো একটি বিপ্লব অপেক্ষা করছে।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতে গেলে দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী সরকারের হামলার শিকার হতে হয়। অকাতরে জীবন দিয়েছে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-শিশু-জনতা। দাবি আদায়ে রাস্তায় নামার কারণে কয়েক দিনের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এরপর বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিছুদিনের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণ-আন্দোলনে। ছাত্র-জনতা ঐ গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব অপ্রাপ্তিকে পূর্ণ করতে চেয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসককে বিতাড়িত করতে বাধ্য করেছে। ছাত্র-তরুণদের এ আন্দোলন শুধু বাংলাদেশের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকেনি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রতিবাদের ভাষা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল আরব বসন্তে। ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, ওয়ার্ড প্রেস, মাইস্পেস, ইউটিউব থেকে শুরু করে নানা মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষা পায়। শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকা আর লাগাতার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়তা একের পর এক স্বৈরাচার শাসকদের অপকর্ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রকাশ পেতে থাকে। দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার দিবাকর সূর্যাস্তের নিশানা দেখতে থাকে। এভাবে তরুণদের অক্ষয় শক্তির মাধ্যমে নতুন করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে। তারপর পাদ প্রদীপে উজ্জ্বল আলোক রশ্মিতে ভরপুর হয়ে ওঠে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ আমার আপনার সকলের গর্ব।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করেছে তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য, গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার নিমিত্তে, বিচার ও রাজনৈতিক সংস্কার নিশ্চিত করতে, ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেদের অধিকারকে বাস্তবায়ন করতে পারলেও বাংলাদেশের মানুষের অধিকাংশ সময় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কবলে থাকতে হয়েছে। ক্ষমতার হাত বদলালেও বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচন কিংবা এর পরে ৯০-এর নির্বাচনগুলো ক্ষমতার মোহে আকৃষ্ট থাকার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ্য বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের এক তরফা ও ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসক স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হয়েও জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীনতা পায়নি। আমার মনে হয়, এ দেশে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা করা বড় দায়। আমাদের একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন যে সংগঠনটির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তি পাবে, সুষ্ঠু নির্বাচন নামক আলোর দিশারি নিশ্চিত করতে পারবে।

গণমাধ্যমকে বলা হয় একটি রাষ্ট্রের দর্পণ। দর্পণের মাধ্যমে একটি দেশ তার সত্যিকার চেহারা দেখতে পায়। তাই একটি দেশ গণমাধ্যমের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা কামনা করে থাকে। কিন্তু স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার আমলে তা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে নরওয়ে ও সুইডেনের মতো দেশে কত চমৎকার শাসন পদ্ধতি রয়েছে। সরকারের সমালোচনা কিংবা দুর্নীতি প্রকাশ করলেও কখনো বাধার সম্মুখীন হতে হয় না গণমাধ্যমকে। অথচ বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন।

স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে গেলে ঐ গণমাধ্যমের কপাল পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলতে গেলে দৈনিক সংগ্রাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যবধি সত্য ন্যায় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেই চলেছে। বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী সরকার বারবার এটির গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে উপমহাদেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক দৈনিক সংগ্রামের তৎকালীন সম্পাদক আবুল আসাদকে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও এ পত্রিকার ভূমিকা ছিল সাহসী ও নির্ভীক।

একটি দেশের শাসনব্যবস্থা জনবান্ধন করতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই।যার বাস্তব উদাহরণ দেখা যায় জার্মানিতে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের অন্যতম মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে নাগরিকদের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়ে থাকে। এ জন্য প্রধান বিচারপতিকে কোনো রাজনৈতিক দলের বাইরে গিয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবার বিচারপতি হতে হয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ বিচারপতি সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে। বিচারপতি খায়রুল হাসান তার বড় উদাহরণ। কিছু সংখ্যক কর্তৃত্ববাদী দুর্নীতি করার মাধ্যমে দেশের অধিকাংশ টাকা নিজেদের কবলে আয়ত্ত করে নিয়েছে এবং বিদেশে পাচার করেছে। যার ফলে বাংলাদেশ ঘরোয়া ও বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো নিয়ে বোঝা বহন করতে হচ্ছে। এমনকি আজকে যে শিশুটি জন্ম গ্রহণ করছে, তাকেও বড় ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পৃথিবীর মুখ দেখতে হচ্ছে।

বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সমতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন অনস্বীকার্য। কিন্তু এরশাদের আমল থেকে শুরু করে সকল দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচারী আমলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠদান করতে মাঝে মধ্যে ব্যাকফুটে থাকতে হয়। যার জন্য তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এ সেক্টরে বাজেটের অপ্রতুলতা, যা প্রায় বাজেটের ২ শতাংশের চেয়েও কম। যার ফলে এ খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা খাতে অতিসত্বর বাজেট বাড়ানো অপরিহার্য। এ ছাড়া স্কুল-করেজের প্রধান ও অধ্যক্ষগণ কেউ কেউ রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এ কারণে নেতৃত্ব গুণের অভাবে শিক্ষার স্বাভাবিক ও সৃজনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না। যে জন্য রাজনীতিমুক্ত দক্ষ ও যোগ্য লোককে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান করা জরুরি। তবে যেসব অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত নন, এমন অনেক অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদেরকে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সময়ে তার রাজনৈতিক দোসর অসভ্য গভর্নিংবডি কর্তৃক মিথ্যা রাজনৈতিক তকমা দিয়ে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বিরত রাখা হয়েছে। এসব সম্মানিত অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের অনতিবিলম্বে স্বপদে বহাল করতে হবে। আওয়ামী দোসরদের ও তাদের সহযোগী যারা বর্তমান কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছে তাদেরকে কমিটি থেকে অপসারণ করতে হবে। তাহলেই জুলাই বিপ্লবের সত্যিকার চেতনা সার্থকতা লাভ করবে।

পরিশেষে বলতে চাই, একটি বৈপ্লবিক আন্দোলনই পারে দেশের ইতিহাসের মোড় বদলে দিতে। তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে ছাত্র-জনতা সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় অনেক রক্তের বিনিময়ে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয় দফা স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং ফ্যাসিবাদি শাসক শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে। তাই জুলাই বিপ্লব জাতির জন্য একটি গৌরবময় অধ্যায়। এমতাবস্থায়, কোনো বিভেদপূর্ণ অশুভ শক্তির পদচারণা এবং পার্শ্ববর্তী কোনো রাষ্ট্রের মোড়লিপনার চাপে যাতে আগামী দিনে একটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে এ গৌরব ও বিপ্লবকে কেউ নস্যাৎ করতে না পারে সে জন্য রাজনৈতিক দলসমূহ এবং দেশবাসীকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে-একটি কল্যাণমূলক দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়তে এটিই জাতির প্রত্যাশা।