বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র-রাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রতিটি বাঁকে এদেশের ছাত্রসমাজের রয়েছে রক্তক্ষয়ী অংশগ্রহণ। ভাষার লড়াইয়ে তরুণ শিক্ষার্থী ও তৎকালীন ছাত্র সংগঠনগুলোর ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, ১৯৭১ এর স্বাধীনতা লড়াইয়ে গণমানুষের আত্মত্যাগের পাশাপাশি ছাত্রসমাজের ত্যাগের মহিমা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ে সম্মুখ থেকে ছাত্ররা ও আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দিয়েছে। ছাত্র রাজনীতির গৌরবের দিক অনেক আছে, আবার কলুষতার দিনও কম নয়, বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারের আমলে দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি বলতে কিছুই ছিলো না, নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ কুক্ষিগত করে রেখেছিলো, তারা কালচারাল ফ্যাসিস্টদের সাথে নিয়ে বিরোধী মতামতকে দমনের সামাজিক বৈধতা উৎপাদন করে অব্যাহতভাবে নির্যাতন চালাতো। শহীদ আবু বকর, শহীদ নোমানী, শহীদ আবরারের মতো মেধাবীরা সন্ত্রাসীদের খুনে পরিণত হয়।

ছাত্র রাজনীতির বিষাদময় ও ভয়াল সময়ে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ স্লোগানটি একটি প্রজন্ম নিজের করে নিয়েছিলো মূলত রাজনীতির নামে রাজনীতিহীনতা, আধিপত্য, দখলবাজ ও সন্ত্রাসীদের ‘হেইট’ করার স্লোগান হিসেবে। ‘আই হেইট পলিটিক্স’ মূলত ‘আই হেইট ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব’, যার প্রমাণ মিলে ২৪ এ ছাত্র-জনতার বিস্ফোরণের মাধ্যমে। বুয়েটে যখন রাজনীতি নিষিদ্ধে দাবি উঠলো, সেটা মূলত ছাত্রলীগ ও তার সহযোগী বামপন্থীদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি। কারণ, শিক্ষার্থীরা তখন রাজনীতি বলতে হলদখল, শিক্ষার্থী নিপীড়ন, ফাও খাওয়া, চাঁদাবাজি ইত্যাদিকে বুঝতো।

ছাত্র রাজনীতিতে সন্ত্রাসবাদের সূচনা হয় ৭০ এর দশকেই। ১৯৭৪ সালে মুজিববাদী ছাত্রলীগ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ খুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের জিএসকে নির্মমভাবে হত্যা এবং এর চূড়ান্ত রুপলাভ করে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের বামপন্থী সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে নৃশংস হামলা ও ৪ খুনের মাধ্যমে।

ছাত্র রাজনীতির সৌন্দর্য তখনই পাওয়া যাবে যখন ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সকল মতামতের সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা নিশ্চিত হবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন জারি থাকলে ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে তাদের অবস্থান হিসেব করতে পারে, অনেক সময় নির্বাচনের জয়লাভের স্বার্থে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিহার করতে বাধ্য হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন হওয়ার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করে, কথা ছিলো ক্যাম্পাসগুলোতেও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা আরো বেগবান হবে। তবে, দুঃখজনক হলেও সত্য - রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রুপান্তর হলেও একে একে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠন নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। মূলত, সরকারী দলের অপকর্মের কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে থাকে, ফলে সংসদ নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হতে থাকে। যে কারণে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আস্তে আস্তে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনই ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, হলদখল, টেন্ডারবাজির সাথে জড়িত হতে। বিগত আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনামলে এই চিত্র ভয়াবহ নির্মমতা ও ফ্যাসিবাদে রুপ নেয়। ক্যাম্পাসে তাদের কালচারাল সহযোগী বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাড়া (তারাও অবশ্য সীমিত কার্যক্রম চালাতে পারতো, কোথাও কোথাও নিপীড়নের শিকারও হয়) অন্যকেউ ক্যাম্পাসে প্রবেশই করতে পারেনি, শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে দেওয়া হয়নি। ছাত্রশিবির বা ছাত্রদলের নামে কেউ প্রবেশ করলে শিক্ষক ও প্রশাসনের সহায়তায় তাদের প্রকাশ্যে নির্যাতন করা হতো, ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সামাজিক হেজেমনি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিলো যেন শিবির হত্যা করা বৈধ, এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনও নীরব ভূমিকা পালন করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহযোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাতে নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য প্রথম বর্ষেই তাদেরকে গেস্টরুমে নির্যাতন করা হতো, শুরুতেই তার কনফিডেন্স ভেঙে দিতো যেন বাকীটা সময় সন্ত্রাসীদের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাটায়।

কিন্তু, অতীত ইতিহাস ও আমাদের পরাজিত না হওয়ার চেতনা আমাদের বারবার জাগিয়ে তুলে। সাধারণ কোটা সংস্কারের মতো ন্যয্য আন্দোলনকে সরকার সহিংস কায়দায় দমন করার প্রচেষ্টা চালায়। পুলিশ, যুবলীগ ও ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ লেলিয়ে দিলে শিক্ষার্থীদের মাঝে জমে থাকা ক্ষোভগুলো স্ফুলিঙ্গের মতো ফুটতে থাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন করে ছাত্র রাজনীতিকে সাজানোর সুযোগ আমাদের সামনে আসে। অবশ্য ছাত্র রাজনীতি কেমন হবে সেটার সাথে জাতীয় রাজনীতির চরিত্রও জড়িত। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্ভর পুরাতন রাজনৈতিক কাঠামো বজায় থাকলে এটির ছায়া ছাত্র রাজনীতিকেও ঢেকে ফেলবে। ফলে জাতীয় রাজনীতির পুরাতন ধারাকে আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে, উদার-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও টেন্টারবাজিকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের যে রাজনীতি রচিত হয় সেটিকে ভেঙে দিতে হবে।

নানান শংঙ্কা ও রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার পাটাতনে আগামীর ছাত্র রাজনীতির আশাবাদ-

ক্যাম্পাসগুলোতে প্রতিবছর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার অংশ হিসেবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধিকে ভয়মুক্ত পরিবেশে বাছাই করবে। এই ধারা প্রতিবছর চালু থাকলে ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনে জয়লাভের স্বার্থে ‘ইতিবাচকতা’ বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালাবে।

য় রাজনৈতিক দলের পকেট সংগঠন বা লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ভূমিকা পালন করবে না। আদর্শিক দিক থেকে জাতীয় রাজনীতি ও বৃহৎ স্বার্থে রাজনৈতিক দলের সাথে সহযোগিতা থাকতে পারে তবে সেটি হবে শিক্ষার্থীদের অধিকারকে সমুন্নত রাখার তাগিদে।

হল দখল ও টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ ‘ক্যাম্পাস

সংঘর্ষে’র ঘটনা ঘটে। সরকার যদি আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে তাহলে অতীতের মতো সংঘর্ষ ও সহিংসতার চিত্র আমাদের দেখতে হবে না।

লেজুড়বৃত্তির নামে দাসের মতো আচরণ, নেতৃত্বপূজা, অর্থের বিনিময়ে কমিটি ইত্যাদি সংস্কৃতি বন্ধ করে ইতিবাচক ধারায় পরিবর্তিত করতে হবে।

পলিসি উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী স্বার্থকে কেন্দ্র করে ছাত্র রাজনীতির গতিপথ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। গতিপথে শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রশ্নটি শুরুতে না থাকলে আবারও আধিপত্যের লড়াইয়ের চক্রেই বন্দী হয়ে যাবে ছাত্র রাজনীতি।

ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসের শিক্ষক ও প্রশাসনের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রশ্নের প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও দ্বিধা করবে না।

শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ছাত্র সংগঠনগুলো কাজ করবে।

আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের জন্য ছাত্র সমাজ বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলোর অতিরিক্ত দায়িত্ব রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনগুলো বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। যেটি ছাত্রসমাজকে আরো দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও রাজনৈতিক অধিকার সচেতন হিসেবে গড়ে তুলবে। ন্যায় ও ইনসাফের লড়াই এবং আমাদের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে, জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে আমাদের যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন সেই স্বপ্ন রাষ্ট্র বাস্তবায়নে ছাত্র সংগঠনগুলো সামনে থেকে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করবে।