সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্বাস শব্দটি বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে খানিকটা আলাদা অর্থ বহন করতে পারে; তাই জ্ঞান, সত্য ইত্যাদির মত বিশ্বাসেরও কোনো একটি সর্বজনসম্মত সংজ্ঞা নেই বলেই অধিকাংশ মনীষী মনে করেন । কোনো বিষয় সত্য না মিথ্যা তা বিচার করে-সত্য মনে হলে তা ‘বিশ্বাস করা’ অথবা মিথ্যা মনে হলে অবিশ্বাস করা আর মিথ্যা হবার সম্ভাবনা বেশি মনে হলে সন্দেহ করা হয় । বিশ্বাস মানে হতে পারে আস্থা; ভরসা। বিশ্বাসের দৃঢ়তা খুব বেশি হলে তা ভক্তি আবেগের রূপ নেয়। আর যুক্তিহীন বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাসরূপে পরিগণিত হয়।
মূলত, ‘বিশ্বাস’ শুধু জীবনের চালিকাশক্তিই নয় বরং সভ্যতারও নিয়ামক। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই সভ্যতার প্রাসাদ রচিত হয়েছে। মূলত বিশ্বাসই মানবজীবনকে ছন্দময়, প্রাণবন্ত ও গতিশীল করে তোলে। সর্বোপরি ব্যক্তির সকল সাফল্য-ব্যর্থতার ভিত্তিই হলো এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই। ধর্মের মর্মকথাও শ্রষ্টা ও সৃষ্টি সংশ্লিষ্ট সকল কিছুর প্রতি অকৃত্রিম আস্থা এবং মহান স্বত্ত্বার প্রতি শর্তহীন আনুগত্য। তাই বিশ্বাসই মানব জীবনের প্রাণশক্তি; বিশ্বাসই জীবনের ভিত্তি। বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।
বিশ্বাস ও আস্থার ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতাকে সর্বেসর্বা মনে করা যায় না। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে যুক্তি ও দর্শনের উপযোগীতাকেও অপ্রাসঙ্গিক ও অসার মনে করা হয়। একথা খুবই স্পষ্ট যে, সভ্যতাই বিশ্বাস; আর বিশ্বাসই সভ্যতা। একে অপরের পরিপূরক। একটিকে অস্বীকার করে আরেকটির অস্তিত্বও কল্পনা করা যায় না। মহাকবি জন মিল্টনের মতে, ‘বিশ্বাস জীবনকে গতিময় করে, আর অবিশ্বাস জীবনকে করে দুর্বিসহ’। মূলত, এটিই বাস্তবসম্মত ও সর্বজন গ্রাহ্য।
তবে এক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও অস্বীকার করা যাবে না। মূলত বিশ্বাসের পরিধি শর্তহীন ও অবারিত নয় বরং তা সংবিধিবদ্ধ ও সুনিয়ন্ত্রিত। আর ধর্মীয় বিশ্বাস তো রীতিমত বৃত্তাবদ্ধ। প্রত্যেক ধর্মেই শ্রষ্টাকে অসীম ও আর সৃষ্টিকে সমীম মনে করা হয়। সাধারণভাবে বিশ্বাস বলতে পারিপার্শ্বিক বিষয়-বস্তুরাজি ও জগৎ সম্পর্কে কোনো সত্ত্বার স্থায়ী-অস্থায়ী ধারণাগত উপলব্ধি বা জ্ঞানের উপর আস্থাকে বোঝানো হয় । সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে খানিকটা আলাদা অর্থও বহন করে।
মূলত, বিশ্বাস হচ্ছে কোন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ অনুভুতির সচেতন অনুধাবন। কোনো ‘তথ্য’ বোধগম্য হওয়া এবং যথাযথভাবে যাচাই করার পর সেই বোধের নিশ্চয়তা সম্বন্ধে প্রত্যয় সৃষ্টি হলে তাকে ‘জ্ঞান’ বলে। জ্ঞানের বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য হলো শুধু পূর্বলব্ধ অভিজ্ঞতাই নয় বরং ভবিষ্যৎ ও অজ্ঞাত পরিস্থিতি সম্বন্ধেও ভবিষ্যৎবাণী করা। আর জ্ঞানের পরিশীলিত অবয়বই হচ্ছে ‘বিজ্ঞান’। বলা হয় বিজ্ঞানে অন্ধবিশ্বাসের কোন সুযোগ নেই। একই সাথে এও দাবি করা হয় যে, ইন্দ্রিয়গাহ্য নয় এমন কিছুর অস্তিত্বও নেই। আর সে সূত্রধরেই বস্তুবাদী ধারণায় বিবর্তনবাদীরা শ্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে আসছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানেও বিস্তর মতবিরোধ রয়েছে। এ বিষয়ে মনীষী ফ্রান্সিস বেকনের বক্তব্য খুবই চমকপ্রদ ও হৃদছগ্রাহী। তার ভাষায়, ‘ যে বিজ্ঞানকে অল্প জানবে সে নাস্তিক হবে, আর যে ভালোভাবে বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করবে সে অবশ্যই ঈশ্বরে বিশ্বাসী হবে’। তবে নাস্তিক হওয়াও একপ্রকার বিশ্বাসের ফলশ্রুতি।
মূলত, বিশ্বাস ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য না হলেও যুক্তিগ্রাহ্য হওয়া বাঞ্চনীয়। অবশ্য পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তিবিদ্যাকে একটি প্রথাগত শৃঙ্খলা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং দর্শন এর মধ্যে একটি মৌলিক অবস্থানও স্পষ্ট করে দিয়েছেন এরিস্টটল। প্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তিবিজ্ঞান বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বিদের দ্বারা উন্নত হয়েছিল। অপ্রথাগত যুক্তিবিজ্ঞান হলো সাধারণ ভাষায় করা যুক্তিতর্কের গবেষণা। অতিতুচ্ছ বিষয়ে যেসব যুক্তিতর্ক করা হয় তার চর্চা করা অপ্রথাগত যুক্তিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। দার্শনিক প্লেটোর কিছু উদ্ধৃতি এ যুক্তিবিজ্ঞানের উপযুক্ত উদাহরণ।
একথা স্পষ্ট যে, বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সভ্যতার সৌধ রচিত হয়েছে এবং এর ক্রমবিবর্তনও ঘটছে। তাই বিশ্বাস ও আস্থা মানবজীবনের অপরিহার্য অনুসঙ্গ। কিন্তু একথা মনে রাখা দরকার যে, কারো বিশ্বাস অপর কারো জন্য অনিষ্টের কারণ না হয়। তাই বিশ্বাসটাতে নিজের বৃত্তের মধ্যেই আবদ্ধ রাখা জরুরি। আর বিশ্বাসে-বিশ্বাসে যখন সংঘাত দেখা দেয় সেক্ষেত্রে যুক্তি, দর্শন ও ন্যায়নিষ্ঠতারই প্রাধান্য থাকা উচিত। মূলত এক জনের বিশ্বাস আরেক জনের বিশ্বাসের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়ার মধ্যে কল্যাণ নেই। আর এক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে সভ্যতার সংঘাতটা রীতিমত অনিবার্য হয়ে পড়ে। মূলত বিশ্বাসের সংঘাতটাই গোটা বিশ্ব পরিস্থিতিকে অস্থির ও অশান্ত করে তুলেছে। নিজের বিশ্বাস অপরের ওপর চাপিয়ে দেয়ার একটা অশুভ প্রবণতা শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক বিশ্বে। ফলে সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, উগ্রবাদের মত চরমপন্থার প্রসার ঘটছে। বাবরী মসজিদ ও রামমন্দির বিষয়ক ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের রায় তার প্রকৃত উদাহরণ। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এতদসংক্রান্ত রায়ে বলেছে, ‘জমির স্বত্ব ধর্মীয় ভাবনার ভিত্তিতে দেওয়া যায় না। হিন্দুরা ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বাস করে, অযোধ্যা রামের জন্মভূমি। তাই তাদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখিয়েই বিতর্কিত জমির মালিকানা হিন্দুদের অনুকূলেই সমর্পন করা হলো’।
মূলত, এ রায়ের ক্ষেত্রে যুক্তি, প্রামাণ্য দলিল-পত্র, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সত্যতা কোন কিছুই বিবেচনায় আনা হয়নি। বিবেচনায় এসেছে বিবাদমান পক্ষ বিশেষের নিছক বিশ্বাস ও অন্ধত্বকে।
আর এ বিশ্বাসকে ‘অপবিশ্বাস’ বলার সুযোগও রয়ে গেছে। কথিত ‘বিশ্বাস’কে সম্মান দিতে গিয়ে আরেক পক্ষের বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন ও জলাঞ্জলী দেয়া হয়েছে। কারণ, সংক্ষুব্ধ মুসলমানরাও বিশ্বাস করেন যে, ‘এ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলস্থিত সবকিছুই সে মহান স্বত্ত্বা আল্লাহর। সেখানে রামের কোন অস্তিত্ব নেই’। তাই বিশ্বাসের কথা বলে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট এক ধরনের ‘বিচারিক চৌর্যবৃত্তি’র আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে দেশেরই সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কাছে এর কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রাচীনকালে এ বিশ্বচরাচর সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের পরিধি ছিল খুবই সীমিত। দর্শনই ছিল আদিজ্ঞানের মূল উৎস। কালক্রমে মানুষের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সনাতনী দার্শনিক চিন্তা বাস্তব জীবনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তার স্থানে অধিকতর সঠিক সমাধানসূত্র আবিষ্কার হয়। আগের দিনে প্রকৃতি, পদার্থ, সমাজ, চেতনা, যুক্তি, অর্থনীতি, ধর্ম সবই দর্শনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে এসবের এক একটি ভিন্ন বিজ্ঞান বা আলোচনার শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে দর্শন বলতে কেবলমাত্র কল্পনা নির্ভর কোনো বিষয় আর অবশিষ্ট নেই।
দর্শন যেমন মানুষের আদি জ্ঞানভাণ্ডার, তেমনি তার ইতিহাস জ্ঞানের যে কোনো শাখার চেয়ে প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিস, ভারত ও চীনে দর্শনের বিস্ময়কর বিকাশের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। মানুষের চিন্তা তার সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। সঙ্গত কারণেই মানুষের সমাজ অর্থনীতি বিকাশের যে প্রধান পর্যায়গুলী অতিক্রম করে এসেছে দর্শনের বিবর্তনেও পর্যায়গুলির প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। এজন্য দর্শনের ইতিহাসকে গ্রিক, ভারতীয়, চৈনিক, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য বা ইউরোপীয়, কিংবা হিন্দু, ইসলামি, বৌদ্ধ প্রভৃতি হিসেবে বিভক্ত না করে দাস সমাজের দর্শন, সামন্তবাদী সমাজের দর্শন, পুঁজিবাদী সমাজের এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজের দর্শন হিসাবে বিশ্লেষণ করা শ্রেয়।
জীবন ও জগতের যে কোনো সমস্যাই গোড়াতে দর্শনের আওতাভুক্ত থাকলেও দর্শনের মূল প্রশ্ন হিসেবে বিশ্বসত্তার প্রকৃতি, মানুষের জ্ঞানের ক্ষমতা অক্ষমতার প্রশ্ন, বস্তু ও ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক, মানুষের চিন্তা প্রকাশের প্রকৃষ্ট উপায় বা যুক্তি এবং মানুষের ন্যায়-অন্যায় বোধের ভিত্তি ও তার বিকাশের প্রশ্নগুলো প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত দর্শনের নিজস্ব আলোচনার বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। প্রাচীনকালের বিশ্বকোষিক এরিস্টটলের আলোচনারাজিকে ফিজিক্স, মেটাফিজিক্স, লজিক, এথিক্স, পলিটিক্স পোয়েটিক্স, রেটোরিক্স প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত করা হয়।
কিন্তু মানুষের চিন্তা-দর্শন যে কখনোই ত্রুটিমুক্ত ছিল না বা এখনও নয় তা প্রতিনিয়তই প্রমাণিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাস, যুক্তি ও দর্শনের বিপরীতে আবেগের আশ্রয় নেয়া হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। আর দর্শনে দর্শনে সংঘাতও শুরু হয়েছে বেশ আগে থেকেই। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল চিন্তা-দর্শনের ভিন্নতার কারণেই। তরুণদের ভুলপথে চালিত করা, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং দুর্নীতিকে প্রশয় দেওয়ার মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল দর্শনের এই কিংবদন্তীর বিরুদ্ধে। বিচারে শেষ পর্যন্ত তাকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত ও তা কার্যকরও করা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ২৪১৫ বছর পরে গ্রিসের একটি আদালত জানিয়েছেন, সক্রেটিস নির্দোষ ছিলেন। অথচ সক্রেটিস এমন এক দার্শনিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছিলেন, যা দীর্ঘ ২০০০ বছর ধরে পশ্চিমী সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রিসের শাসকরা সক্রেটিসের তত্ত্বগুলিকে মানতে চায়নি।
এথেন্সের তৎকালীন আরাধ্য দেবতাদের নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সক্রেটিস। তার বিরুদ্ধে অত্যাচারী শাসকদের সমর্থনেরও অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাছাড়া, তরুণদের বিপথে নিয়ে যাওয়া, নতুন দেবদেবীদের সম্পর্কে প্রচার করা-সহ সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে আদালতে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ বিচারপর্বে তুলে ধরা যায়নি বলেই অভিযোগ ওঠে। তারপরও তাকে চিন্তা ও দর্শনের ভিন্নতার কারণে চরম পরিণতি বরণ করতে হয়েছে।
সক্রেটিসের হয়ে এ মামলায় ফ্রান্সের এক বিখ্যাত আইনজীবী আদালতে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেছিলেন। অপর পক্ষে গ্রিস-সহ বেশ কয়েকটি দেশের আইনজীবীরা সক্রেটিসের বিরোধিতা করেন। এই মামলার বিচারের জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিচারকদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। দীর্ঘ বাদানুবাদের পরে সক্রেটিসের আইনজীবীর যুক্তিতেই সিলমোহর দেন বিচারকরা। শুধু দার্শনিক সক্রেটিসই যে এ ধরনের বিচারিক দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিলেন এমন নয় বরং এ ধারা একবিংশ শতাব্দীতেও অব্যাহত আছে। কথিত বিচারে এখনও মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়ার ঘটনা ঘটছে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। হয়তো ভবিষ্যতে তারাও একদিন দার্শনিক সক্রেটিসের মত নির্দোশ প্রমাণ হবেন। সে আশা সকল আত্মসচেতন বিশ্ববাসীর।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতে যা সঠিক মনে করা হয়েছিল পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আবার এর ঠিক বিপরীত ধর্মী ঘটনা ঘটেছে ইতিহাসে সে প্রমাণও রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাস, যুক্তি ও দর্শনের বিচ্যুতি ঘটানো হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই। এমনই একটি দুঃখজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাসায়নিক অস্ত্র মজুদের অভিযোগে ইরাকে আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা শুধু মিথ্যা নয় বরং প্রতারণা বলেই প্রমাণিত হয়েছে। যা বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের আরেক কলঙ্কতিলক।
খোদ মার্কিন কর্তৃপক্ষই পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এ চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে পাঁচ হাজারেরও বেশি আমেরিকান এবং অসংখ্য ইরাকি ওই যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এর জের ধরেই এখনো অশান্ত পরিস্থিতিতে রয়েছে ইরাক। ওই হামলা না হলে বর্তমানের আইএসআইএসের উত্থানও হতো না বলে অনেকেই তা মনে করে। কিন্তু যা হবার তো হয়েই গেছে। এই অন্যায় যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এখন পুরো বিশ্ব পরিস্থিতিকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
মূলত, ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে-এমন অভিযোগে ২০০৩ সালে ইরাকি হামলা চালিয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। তিনি জানতেন, ওই ধরনের কোনো অস্ত্র ইরাকে নেই। কিন্তু তবুও তিনি হামলাটি চালিয়েছিলেন। এখন বেশির ভাগ রিপাবলিকান মনে করেন, তার ওই সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। এমনকি সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনীর নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান চালানোর সময় যেসব ‘ভুল’ হয়েছিল, তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ওই যুদ্ধের পরিণামেই জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান হয় বলে তিনি স্বীকার করেন।
বস্তুত, বিশ্বাস, যুক্তি ও দার্শনিক বিচ্যুতির কারণেই মানবসভ্যতায় দুষ্টক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তি, গোষ্ঠি ও জাতি বিশেষের আত্মপুঁজা ও আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই এসব অতিমানবীয় অনুসঙ্গগুলোর অপব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস, যুক্তি ও দার্শনিক ভিত্তিকেই পদদলিত করা হচ্ছে। যেমনটি হয়েছে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের বাবরী মসজিদ বিষয়ক রায়, দার্শনিক সক্রেটিসের প্রাণদন্ড ও ইরাক আক্রমেণের ক্ষেত্রে। সক্রেটিসের প্রাণদন্ড ও ইরাক আক্রমনের যৌক্তিকতা ইতোমধ্যেই ভুল ও দার্শনিক বিচ্যুতি বলে প্রমাণিত হয়েছে।
যে দুর্বল ও ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর বাবরী মসজিদের জমি রাম মন্দিরের অনুকূলে দেয়া হয়েছে তাও একদিন বিচারিক বিচ্যুতি বলেই প্রমাণিত হবে। কিন্তু এসব ঘটনার মাধ্যমে মানবসভ্যতায় যে কালিমা লেপন করা হয়েছে তার আর কোন ভাবেই মোচন করা সম্ভব হবে না। মনীষী টার্মস টমাসের ভাষায়, ‘ নরম কাঁদা একবার পুড়ে যদি ইট হয়ে যায়, তারপর যতই পানি ঢালা হোক না কেন, তা আর গলে না বরং আরও শক্তি শালী হয়’। তাই বিশ্বাস, যুক্তি ও দার্শনিকতার ছদ্মাবরণে আবেগ নির্ভরতাকে কোন ভাবেই প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ নেই। আর এসব ক্ষেত্রে আবেগহীনতা, সত্যনিষ্ঠা এবং অকাট্য যুক্তি-প্রমাণকেই বিচারিক মানদণ্ড হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় মানবসভ্যতার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে।