স্বাধীনতা শব্দটি যেমনি মধুর এর ভাব তেমনি উন্নত, জীবনে এর বাস্তবতা সুখকর ও আনন্দদায়ক। প্রতিটি প্রাণীর জীবনে স্বাধীনতা তার কাম্য। যে পাখিটি খাঁচায় আবদ্ধ, তাকে মুক্তি দিলে পায়ের সেনার শিকল ছিড়ে নিজ পাখায় ভর দিয়ে বাতাবরণে নিজকে হারিয়ে ফেলে। নীলাকাশের কোলে যে সবুজ চারাটিকে ঘরের কোণে টবের মধ্যে বাড়তে দেওয়া হয় সেটি বাতাবরণের ফাঁকÑফোঁকর দিয়ে রবির কিরণে নিজকে স্নাত করার জন্য থাকে উন্মুখ। জড়ের নেই মুক্ত বিহঙ্গ বা রঙিন পতঙ্গের মত ওড়ার তাগিদ। জড়ও চলে, তবে সে চলা অন্যের অধীন হয়ে, মহাকর্ষণ বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে।
জড় অধীন , জীব স্বাধীনতা প্রিয়। মানুষ জীবশ্রেষ্ঠ। তার রয়েছে ইচ্ছা ,জ্ঞানÑবিবেক। বনিআদম চায় না অন্যের বিবেক ও ইচ্ছায় পরিচালিত হতে, চলতে। কিন্তু যদি তাকে ঐ অবস্থায় চলতে হয় তবে সে চলা অধীন হয়ে। যখন মানুষ নিজ আত্মার অনুশাসনে চলে তখন সে স্বাধীন।
“স্বাধীন” শব্দটির মূল স্ব+অধীন। অর্থাৎ নিজের অধীন তথা নিজের জ্ঞান ও বিবেকের অধীনে চলার নামই স্বাধীনতা। জন্মগত ভাবে মানুষকে স্বাধীনতা প্রদান করেই পাঠান হয়েছে এই পৃথিবীতে।কুরআনে বলা হয়েছে,“ ফিতরাতাল্লাহিল্লাতি ফাতারান্নাসা আলইইহা”Ñ তা ই আল্লাহর ফিতরাত যার উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ স্বাধীন, স্বাধীন তাঁর সত্তা , এখতিয়ার ও সর্ব ক্ষেত্রে। ন্যায়পরায়নতা, সাম্য, যথাযোগ্য ব্যবহার , জ্ঞান সুলভ সৃষ্টি প্রণালী ইত্যাদি তার ফিতরাত। এসব ফিতরাত মানুষের মাঝে সৃষ্টি হোক এটা অল্লাহর কাম্য। তাই তিনি মানুষকে স্বাধীন চেতনাবোধ দিয়ে পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“ প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের উপর জন্ম গ্রহণ করে । পরে তার পিতা মাতা তাকে ইহুদী, খ্রিস্টান ও অগ্নি উপাসক করে।” এ হাদিস শিক্ষা দেয় মানুষ চিন্তা ও ইচ্ছা উভয় ক্ষেত্রে স্বাধীন। রুচিরক্ষেত্রেও নেই তার কোন বাধা বন্ধন। নিজস্ব চিন্তা, রুচি ও অভ্যাসে তৃপ্ত থাকাই মানুষের স্বভাব। “ কুল্লুহিজবিম্ বিমা লাদাইহিম ফারেহুনÑপ্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত।” কুরআন)
মানুষের মুক্তির চেতনাবোধ মানুষকে উন্নতির চূড়ায় তুলতে সাহয্য করে। কিন্তু সে যদি স্বাধীনতার পবিত্র মূল্যবোধকে হত্যা করে উচ্ছৃঙ্খলতায় মানব হৃদয়ে পশুত্ব যায়গা করে দেয়, তখন সে কোনান ডয়লের বিখ্যাত গল্প ‘হাউন্ড অফদি ব্যাক্সারভিলস’Ñএর ‘গ্রীম্পেন মায়ার ’ Ñএর মতো ভ্রান্তির পঙ্কে আটকে পড়ে।
স্বাধীনতার মাঝেই রয়েছে অধীনতা বা বন্ধনের বীজ। আত্মার অধীনতা, বিবেক ও জীবনের অধীনতা , নিয়ম শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মুক্তির স্বাদ। ঘুড়ি মুক্তভাবে আকাশে উড়তে চায়। চায় মেঘমালার বাধা ডিঙিয়ে সুদূর গগনে মিশে যেতে। ঘুড়ির পেছনে সূতার টান আছে বলে সে আকাশে উড়তে পারে। সূতার টান ছিন্ন হলে সে আর শূন্যে টিকে থাকতে পারে না, জমিনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বীণার তারে বাঁধন আছে বলেই কোমল করতল স্পর্শে সে ঝংকৃত হয়ে সুর ছড়ায়। পাইপের ভেতর দিয়ে পানি ছুটে চলে কলের মুখ দিকে। পাইপের অধীনতা বা নিয়ন্ত্রণ তার মাঝে পানির চলার বেগ, চাপ ,গতি সৃষ্টি করে পানিকেকলের মুখে পৌঁছতে সাহায্য করে। যদি পানি পাইপের বন্ধন বা অধীনতাকে না মানে, তবে পানি চলার পথে বালুর শেষণে হারা হয়ে যাবে। প্রকৃতির ফুলের হাসি, ফলের পরিপক্কতা, নদীর গতি সব কিছুর মঝে রয়েছে নিয়মÑশৃঙ্খলা। এই যে মানুষের সৃষ্টি,তার গোড়ায়ও রয়েছে শৃঙ্খলার জাল ছড়িয়ে। যে শুক্রাণুগুলি ডিম্বাণুর আধারে নিজদেরকে আবদ্ধ রাখতে পারে না , বরং ছুটে চলে স্বাধীনভাবে সেগুলি তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। যেটি নিয়ম নিগড়ে নিজকে সোপর্দ করল সেটিই একটি সুন্দর ও কোমল অবয়বে প্রাণ জুড়ান হাসি মাখা অধরে মাত্রকোড়ে আনন্দের ঢেউ তুলতে সক্ষম হয়। আল্লাহ প্রদত্ত নিয়মের অধীনতা তাকে মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনে সহায়তা করে। তাই বলা চলে, নিয়ম নিগড়ের অধীনতা মেনে নেওয়াই স্বাধীনতা। নিয়ম নিগড় মানুষকে অত্যাচার করে না; বরং তাকে লালন করে প্রকৃত মানুষের স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। নীতি নিয়মের আনুগত্যহীন স্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে উচ্ছৃঙ্খলতা যা মানব সমাজকে শান্তি Ñস্বস্তি দিতে ব্যর্থ।
আমরা স্বাধীন বাঙালী শান্তির অন্বেষায় ঘুরে মরছি। আমরা বার বার স্বাধীনতা লাভ করলাম; কিন্তু তার পরেও আমাদের সেই স্বাধীনতা আমাদেরকে শান্তি দিতে পারল না। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে। এক দার্শনিক বলেছেন, কহড়ি ঃযুংবষভ ; আত্মনং চিদ্ধিÑনিজকে চেনার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
এ দেশের মুসলমানরা ছিলেন দীর্ঘ বছর ধরে শাসক Ñশাসন পোষনের মালিক। শাসনÑ পোষণের মালিকদেরকে যে ধরনের ফেতরতের অধিকারী হওয়া উচিত ছিল তা মুসলমান শাসকগণ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেললেন। ফলে প্রকৃতির নিয়ম মোতাবেক তাঁদের উপরে ইংরেজ প্রভুত্ব চেপে বসল। তাদের পাশে সহায়তায় এগিয়ে এল হিন্দু সম্প্রদায়।
রবীন্দ্রনাথের কথায়Ñ
বঙ্গতারে আপনার গঙ্গোদকে অভিষিক্ত করি
নিল চুপে চুপেÑ
বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল পোহালে শর্বরী
রাজদণ্ড রূপে।
এই ইংরেজ রাজদণ্ড মুসলমানদেরকে করল অমুসলিম পুঁজিপতির অর্থনৈতিক গোলামীতে লিপ্ত। ইংরেজদের গোলামী ও তাদের সৃষ্ট দরিদ্রের পরিবেশে মুসলমানদের কাছে নৈতিকতার গুরুত্ব, জাতীয় কৃষ্টি ও তমদ্দুনের মর্যাদা কমে গেল। মুসলমান হতে চলল সর্বক্ষেত্রে দেউলিয়া। কিন্তু ইংরেজদের অধীনতাকে হিন্দুরা মাথা পেতে গ্রহণ করে নিতে স্বাগতম জানাল। লেখা হলো কত কথা কত গান। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেনÑ
চিরকাল হয় যেন বৃটিশের জয়।
বৃটিশের রাজলক্ষী স্থির যেন রয়।
এমন সুখের রাজ্য আর নাহি হয়।
শাস্ত্রমতে এই রাজ্য রাম রাজ্য কয়।
কবি রবীন্দ্রনাথ তাদেরকে ভাগ্য বিধাতা হিসেবে তাদের জয়গান গাইলেন। তিনি লিখলেনÑ
রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব উদয় গিরিভালে
গাহে বিহঙ্গম, পূণ্য সমীরণ নব জীবনরস ঢালে।
তব করুণা রূপ রাগে নিদ্রিত ভারত জাগে
তব চরণে নত মাথা ।
জয় জয় জয়হে,জয় রাজেশ্ব ভাগ্য বিধাতা।
জয়হে জয়হে জয়হে জয় জয়, জয় হে।
কিন্তু স্বাধীনতার ফিতরাতে পয়দা মুসলিম জাতি এই অধীনতাকে কোন সময় ও অবস্থাতে মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিতে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছিল গৈাড়া থেকেই। সেই চেষ্টার প্রথম প্রকাশ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। এর পর থেকে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন নেতার নেতৃত্বে বভিন্ন আন্দোলন। স্বাধীনতার মানসপুত্র দুই সেনানী ভারতের দুই প্রান্তে গর্জে উঠেছিলেন বজ্র নাদে। প্রাচ্যের কবি নজরুল ইসলাম লিখলেন,
তরুণ সাবাস! নব শক্তিতে জাগিয়ে তোল।
করুণার নয়Ñ ভয়ঙ্করীর দুয়ার খোল।
নাগিনীÑদশনা রণরঙিনী শাস্ত্রকর
তোর দেশ মাতা, তাহারি পতাকা তুলিয়া ধর। অপর প্রান্তে আআল্লামা ইকবাল দেশবাসীকে স্বাধীনতা মন্ত্রে উদ্ধুদ্ধ করতে লিখলেন-
ইয়ে খামুশী কাঁহাতক, লজ্জতে ফরিয়াদ পয়দাকর
যমীঁ মে তুহো আওর তেরী সদা হো আসমানো মেঁ।
নাহ সম্জোগী তু মিট যাওগী আয় হিন্দুস্তা ওয়ালো।
তোমহারী দাস্তাঁ তকভী নাহ হোগী-দাস্তানোমেঁ।
অর্থাৎÑ কতকাল আর নীরব থাকিবে? ফরিয়াদ নিয়ে দাঁড়াও সব,
মাটিতে থাকিয়া বিপুল শূন্যে প্রেরণ করগো তোমার রব,
এখনো যদি না বুঝিয়া থাক হে স্বদেশবাসী, শোনগো তবে,
আগামী দিনের ইতিহাস মাঝে নামটুকু তব নাইক রবে। (অনুবাদ-আবু তাহের সিদ্দিকী)
এ গান এ আন্দোলন বৃথা গেল না। এর ফলে ভারতের বুকে জন্ম নিল পাকিস্তান নামে একটি মুসলিম রাষ্ট্র। মুসলমানরা ভেবেছিল স্বাধীনতা নামের রক্ষা কবচটি নতুন দেশটিতে শান্তি দেবে, দেশে ইনসাফ কায়েম হবে। কিন্তু না, শাসকগোষ্ঠী দেশে ইনসাফ কায়েম করতে পারেনি। বাংলাদেশের জনতা ভাবল বিদেশীদের হাত থেকে মুক্তি পেলে পেয়ে যাবে বেহেশতী খাবার মান্নাÑ সালওয়া। দেশে বইবে জান্নাতী নহর। তাদের সে খোয়াব ভেঙ্গে গেল। এক সময় দেশটির পশ্চিম অংশের জনতাদের সাথে পূর্বাংশের জনতাদের বনিবনা হল না। বাঙালীদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। সৃষ্টি হলো দুই অংশে বৈষম্য । জুলুম চেপে বসল বাঙালীদের ওপর। জুলুম থেকে বাঁচার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে দেশের এ অংশ থেকে হটাতে বাঙালী ঝাপিয়ে পড়ল পশ্চিম পাকিস্তনীদের থেকে আলাদা হওয়ার যুদ্ধে- মুক্তি যুদ্ধে। চারিদিকে ধ্বনি উঠল, ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলদেশ স্বাধীন কর’। অবশেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, মাÑবোনদের এক সাগর কান্নার বিনিময়ে বাংলাদেশ মুক্ত হল পশ্চিম পাকিস্তানীদের থাবা থেকে,এল প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা ।
আজ বাংলাদেশের শাসকÑপোষক বাঙালী মুসলমান। এক সময় দেশটির ক্ষমতায় এক দল এল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাাহ Ñ নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’ ধ্বনি তুলে,আবার কেউ এসেছে,‘ধানের শীষে তুই আল্লাহ’ শ্লোগান দিয়ে।
আবার কেউ বা তিমির রাত্রে ক্ষমতার মসনদে চেপে বসল অস্ত্রের শক্তিতে,প্রভাতে বের হলো হলের ফলা নিয়ে শান্তির বুলি ঠোটে নিয়ে। এদেশের সরল মানুষ ভেবেছিল নৌকার মাঝি মাল্লারা আল্লাহর পক্ষের হবে,আবার যারা ধানের শীষে আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছে নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ভক্ত হবে। কিন্তু জনতার এ ধারণায় ছিল গলদ। সে কারণে বাংলার আকাশে শন্তির পায়রা উড়ছে না, বইছে না সুখের ঝর্না । দেশে বাঙালী শাসনের পরেও বাংলার নিরীহ সন্তানেরা রাস্তার ধারে রক্তের স্রোতে হামাগুড়ি দিতে দেতে শাহাদতের পেয়ালা মুখে তুলে নিচ্ছ। আজও স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র চাই গণতন্ত্র চাই বলে চিৎকার দিয়ে বুক পেতে গুলি নিচ্ছে দামাল ছেলের দল। আজও দেশের পবিত্র শিক্ষাঙ্গণে তৌহিদী ছাত্র সমাজ শাহাদতের মিছিল ভারী করছে। আজও অসূয়াবশবর্তী হয়ে মুসলমান শাসকরাই আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদেরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাচ্ছে। কেন এমনটি হচ্ছে? দেশেতো আরা ভিন্ দেশী শাসক নেই, নেই ভিন্ন ধর্মের ভিন্ন মন্ত্রীÑসান্ত্রী। স্বাধীনতা কেন অসহায় হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ কেন শিকার হচ্ছে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বা Political expe-diencyi।
এঅবস্থা শুধু আমাদের দেশেই নয়, গোটা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় মানবতা আজ অর্তনাদ করে ফিরছে। সৈই আর্তনাদ থামাতে ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে স্বধীনতার পতাকাবাহী মুরুব্বী (মোড়ল)রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ। তারা গড়ে তুলছে লীগ আব নেশনস, জাতিসংঘ সংস্থা। কিন্তু তথাকথিত স্বাধীনতার পাহারাদারেরা ব্যর্থ। তারা কাপালিকদের খড়ক কৃপাণের নিচ থেকে মজলুম কাশ্মিরীদেরকে , জেরুজালেম বাসীদেরক রক্ষা করতে । দেশে দেশে স্বাধীনতা ব্যর্থ হচ্ছে , নষ্ট হচ্ছে শান্তি।্ এর কারণ শান্তির ধ্বজাধারী মুরুব্বিরা আজ উচ্ছৃঙ্খতারও মুরুব্বি। সম্প্রতি মার্কিন টাইম ম্যাগাজিনে দেখ যায়,সে দেশে প্রতি ৫ মিনিটে ১টি করে ধর্ষণ, প্রতি ২ মিনিটে ১টি করে ফৌজদারী অপরাধ, প্রতি ১৬মিনিটে একটি সহিংস অপরাধ প্রতি ২০ মিনিটে একটি করে খুন, প্রতি ২০ সেকেন্ডে ১টি করে গাড়ি চুরি অরও কতকি! কই স্বাধীনত তো তাদেরকে শান্তি বিলাতে পারছে না। মানুষ যে এত বিপদে অশান্তিতে, কারণ সে স্বাধীন নয়, উচ্ছৃঙ্খল, সে আত্মার শাসন , বিধাতার নিয়ন্ত্রণ, বিবেকের ফায়সালা মানতে রাজি নয়। স্বাধীনতার দাবিদার লবনের পুতুল যেন সাগরের গভীরতা অনুসন্ধানে ব্যস্ত। ওরা ভুলে গেছে ঈমানের স্টিম যদি বিধানের সিলিণ্ডারে আবদ্ধ পিস্টনে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয় তবে সমাজে শান্তির গাড়ি চলতে পারে না। ওদের ঈমানের স্টীমে তাপ নেই, বিধানের সিলিণ্ডার ছিদ্র, তাইআজ শান্তির চাকা রাস্তা ছেড়ে অশান্তির গহ্বরে পড়ছে বার বার। স্বাধীনতায় নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিপদ, স্বাধীনতায় বাধা দিলেও বিপদ। পাহাড়ের শীর্ষে বরফপিণ্ড গলে সৃষ্টি হয় ঝর্না নদী। যদি বরফ গলা স্রোতের স্বাধীনতাকে বাঁধ দিয়ে পরাধীন করতে চায়, তখন সে বাধ ডিঙ্গিয়ে অশান্তির প্লাবনে দেশকে ডুবিয়ে মারে , শস্য নষ্ট হয়, ধন মান জন সবই শেষ হয়ে যায়।
আমাদের দেশটি স্বাধীন হলো অনেক বছর হয়ে গেল, কিন্তু পরিতাপের বিষয় আজও এদেশের মানুষ স্বাধীনতার মর্ম বুঝেনি। আর তাইতো তারা স্বধীনতার নামে ট্রেনে টিকেট কাটে না , দুর্বলদেরকে আসন ছাড়ে না,বিদ্যালয়ে পড় লেখা শিখছে না, মুরুব্বীদেরকে সম্মান দিচ্ছে না , ছোটদেরকে স্নেহ বিলাচেছ না। বোন পাচ্ছে না সম্ভ্রমের নিরাপত্তা , স্ত্রী পাচ্ছে না তার পাওনা অধিকার, মা পাচ্ছে না শ্রদ্ধা ও নিরাপত্তা। সর্বত্রই উচ্ছৃঙ্খলতার সয়লাব। কারণ স্বাধীনতা কী তা আমরা বুঝি না চিনি না। “ স্বাধীনতার মধ্যে- একটি স্বাভাবিক সংযম বোধ আছে। স্বাধীনতার মর্ম যিনি বুঝেছেন তিনি জানেন যে একের স্বাধীনতা অপরের স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে তা হলে কারো স্বাধীনতাই অক্ষুন্ন থাকে না। স্বাধীন মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের চাইতে সমষ্টিগত স্বার্থকে বড় করে দেখে।সেজন্য যথার্থ স্বাধীন সমাজে স্বার্থের সংঘাত স্বাভাবিক ঘটনা নয়। স্বাধীনতা মানুষ মাত্রেরই নরৎঃয ৎরমযঃ; এই বলে তারস্বরে চিৎকার করছি। কখন ভেবে দেখেনি যে স্বাাধীনতা কেউ জন্মের অধিকারে লাভ করে না। যোগ্যতার অধিকারে লাভ করে। স্বাধীনতার সুফল লাভ করতে গেলে আগে দেশবাসীকে তার যোগ্য হতে হবে। অযোগ্যের হাতে পড়লে উৎকৃষ্ট জিনিসকেও নিকৃষ্ট কাজে ব্যবহার করা হয়।... তবে একথাও বলব, বিদেশী শাসনের চাইতেও খারাপ অক্ষমের শাসন।” ( সাহিত্যের আড্ডা Ñ হীরেন্দ্রনাথ দত্ত) আমরাস্বাধীনতা ভোগের অক্ষম তাই আজ পবিত্র স্বাধীনতার নামে চলছে উচ্ছৃঙ্খলতার তাণ্ডব নৃত্য।
আমাদের মনে রাখা দরকার-Democracy helds no promise for happiness but show the path of persuit of happi-ness; অর্থাৎ গণতন্ত্র সুখের কোনও প্রতিশ্রুতি দেয় না বরং সুখের সন্ধানের পথ দেখায়।আবার তাও সব সময় নয়। উচ্ছৃঙ্খলতার যাতাকলের নিষ্পেষণ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারে সেই স্বাধীনতা যার মধ্যে থাকে আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্বানুভূতি। স্বাধীনতা বিধান মুক্ত নয়। মানব জতিকে শান্তি প্রদায়িনী স্বাধীনতা ওহীর বিধানাবরণ মণ্ডিত। ওহীর জ্ঞানপুষ্ট মর্দে কামেলই দিতে পারে মানব সমাজকে জাতিকে স্বাধীনতা। এর প্রকৃষ্ট নমুনা বিশ্বের ইতিহাসের পাতায় ‘ রহমাতুল্লিল আলামীন’। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে,ওহীলদ্ধ জ্ঞানালোকে যারা জাতির নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব পরিচালনা করেছেন তাদের হাতেই মানুষ লাভ করেছে পূর্ণ ও প্রকৃত স্বাধীনতা। রসুল (সঃ)Ñএর পরে সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ খোলফায়ে রাশেদা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হজরত দাউদ ও হজরত সোলায়মান (আঃ)Ñএর ন্যায় বিচার ছিল ইতিহাস নন্দিত। হজরত সোলায়মান (আঃ)-এর ন্যায় বিচারের কথা সমাজে এখনও উপখ্যান হিসেবে চালু আছে। সোলায়মান (আঃ)-এর প্রতাপে সাবার রানীর স্বাধীনতা খর্ব হয়নি; বরং নবুওয়তীর আলোকে সাবা জাতি লাভ করল স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা।
আজও মানুষ মিশরের পিরামিডের দিকে তাঁকিয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মুসা (আঃ)Ñএর ইতিহাস।তিনি উপহার দিয়েছিলেন একটি শৃঙ্খলিত জাতিকে স্বাধীনতা, জাতিকে মুক্ত করলেন ফেরাউনের গোলামী ও অত্যাচার থেকে। আজও মানুষের শির নত হয়ে আসে হজরত ইবরাহীম (আঃ)কে স্মরণ করে। তিনি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তাঁর জাতিকে জালেম নমরুদের জুলুম Ñনির্যাতন থেকে।
ওহীর জ্ঞানের আলোকে শাসিত দেশেই মানুষ অর্জন করে পূর্ণ স্বাধীনতা, সেখানে থাকে না সহিংসতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা। সেখানে থাকে না শাসকের জুলুমের ভয়Ñভীতি বরং সেখানের জনগণ শাসকদেরকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করে থাকে। আমরা দেখেছি হজরত ওমরকে নির্ভীক জনতার প্রশ্নের জওয়াব দিতে, দেখেছি মসজিদে নববীতে এক যুবকের দাবির সামনে খোতবা থামিয়ে দিতে। দেখেছি হজরত আলী(রাঃ) কে বিচার প্রার্থী এক ইহুদী যুবকের সাথে কাজীর সামনে দঁড়িয়ে থাকতে। সেখানে ছিল ওহীর আলোকে শাসন, ছিল ন্যায় ইনসাফ লাভের স্বাধীনতা , ছিল জনগণের বাক স্বাধীনতা ও মৌলিক চাহিদা পুরণের নিশ্চয়তা। খোলাফায়ে রাশেদার পরে ওহীর ঝাপসা আলোতে আলোকিত শাসকদের আমলেও মানুষ ভোগ করেছে মুক্তির স্বাদ। গিয়াস উদ্দীন আযম শাহ, সম্রাট নাসির উদ্দীন, সম্রাট আওরঙ্গজেবকে আজও মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে চাই আল্লাহর বিধানের কছে আত্মসমর্পণ। এবিধান সমাজে মূর্ত হয় এক দল খোদাভীরু,জ্ঞানী ও যোগ্য লোকের মাধ্যমে। ভোগলিপ্সা মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে। স্বাভাবিক ভোগপ্রবৃত্তি জীবন ধারাকে সচল রাখে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পানি মানুষের তৃষ্ণা মেটায়, মাঠে ফসল ফলায়। কিন্তু অত্যাধিক তাপমাত্রায় এর অণুুগুলি হয়ে ওঠে উচ্ছৃঙ্খল। ফলে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে তৃষ্ণা মেটাবার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে, পানি পানকারীর কন্ঠ জ¦ালায়।আবার তাপ হারিয়ে ফেললে লাভ করে জাড্য গুণ। শৈত্যের দাসত্ব পানির রূপ বদলিয়ে দেয়। পানি কঠিন বরফখণ্ডে পরিণত হয়ে এমনকি টাইটানিককে ধ্বংস করার ক্ষমতা লাভ করে। এভাবে আল্লাহ প্রদত্ত জৈবিক চাহিদাকে যারা স্বাভাবিক খাতে চালাতে সক্ষম তারাই পারে মানুষকে স্বাধীনতা দিতে, স্বাধীন থাকতে। শক্তির মদমত্ততায় লিপ্ত বা তথাকথিত তাকওয়ার প্রভাবে জাড্যগুণ প্রাপ্ত জনগোষ্ঠী পরিচালিত দেশের অধিবাসীরা সত্যিকার স্বাধীনতা ভোগ করতে ব্যর্থ হয়।
বাঙালী মুসলমানদে স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু হয় ১৯০৫ সাল থেকে বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে।তারপরে দ্বিতীয় স্তরে ঔপনেবেশিক শক্তির হাত থেকে ১৯৪৭ সাল পাকিস্তান রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভ করে। এর দুই যুগ পরে সে রাষ্ট্রটি দুই খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং জন্ম হলো বাংলাদেশের। বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ গড়াতে প্রায় দেড় শত বছর অতিবাহিত হলো। তখন যে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা যেন আজও চলছে। এখনও এদেশের মানুষ পেল না রাজনৈতিকÑ অর্থনৈতিক মুক্তি, চিন্তার মুক্তি, সহিত্য Ñসংস্কৃতির স্বাধীনতা। এখনও এদেশের মানুষ ইনসাফ বঞ্চিত,খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবন্দবস্ত থেকে বঞ্চিত। বাঙালী মুসলমান এখনও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ঔপনেবিশক শাসকদের রেখে যাওয়া তাদের চিন্তাÑ চেতনায় লালিত হওয়া জনগোষ্ঠী দ্বারা।
স্ববর্ণের দেশী শাসকদের শাসনের পরেও এখনও এল না শন্তি।আজও এদেশের পথচারীরা উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে হচ্ছে নিগৃহীত নারীরা হচ্ছে এসিড দগ্ধা, লাঞ্ছিতা, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হচ্ছেন শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত অপমানিত। রাজনীতিবিদগণ চিৎকার দিচ্ছেন স্বাধীনতা সংগ্রাম নাকি এখনও বাকি।
আসলেই কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা পেতে অনেক বাকি। এদেশের মজলুম জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে হেরার আলো বুকে নিয়ে, মুসার যষ্টি হাতে নিয়ে, সোলায়মানের প্রজ্ঞা নিয়ে, ঈসার কৌশল ও ধৈর্য নিয়ে কবে আসবে খলিফা? ঘন কুহেলিকা ছিন্ন করে দিগন্ত উজ্জ্বল করে ওরা এলই এদেশের মানুষ পাবে মুক্তির স্বাদ, স্বাধীনতার আনন্দ। ওদের আগমন পথ ফুলে সজ্জিত নয়,পদে পদ বাধা। তাই এদেশের সচেতন জনতার দায়িত্ব ওদের আগমন পথের বাধা দূর করে আহলান সাহ্লান বলে খোশ আম্দেদ জানানো। তা হলেই যে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল তৌহিদী জনতা, তা মাথার উপর জ¦লবে। জাতির স্মরণ রাখা দরকরÑ“প্রশান্ত ধর্মের পথে চলাই নিজের শক্তির প্রতি সম্মান এবং উৎপাতের সঙ্কীর্ণপথ সন্ধান করাই কাপুরুষতা Ñ এই বিকৃতিকে
যেকোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একবার আশ্রয় দিলে শয়তানের কছে মাথা বিকাইয়া রাখা হয়...।