আগামীর বাংলাদেশে যেখানে বৈষম্য থাকবে না, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার থাকবে, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার থাকবে এবং মানুষের ভোটের অধিকার থাকবে, এমন একটি সুন্দর স্বপ্নে জন্মভূমি গড়তেই অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল হাজার হাজার তরুণ আলেম, হাফেজ এবং আলিয়া ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদমুক্ত করার পটভূমি তৈরি করেছেন রংপুরের বীর শহীদ আবু সাঈদ। ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা ৩৬ দিনে দেখতে পেয়েছি বিভিন্ন বাঁকের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন এগিয়ে গেছে। সেই বাঁকের মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিল ইসলামী দলগুলো, আলেম-উলামা, হাফেজরা এবং আলিয়া ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যাদের কোটার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু দেশকে ইতিহাসের ভয়ংকর নিষ্ঠুর কুখ্যাত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দুঃশাসন থেকে মুক্ত করতে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল এবং রাজপথে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল। যার প্রমাণ আমরা দেখেছি যাত্রাবাড়ী-চিটাগাং রোড, সাভার, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা-রামপুরা, টঙ্গী ও উত্তরাসহ সারাদেশে। আন্দোলনের শুরু থেকেই বন্দুকের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিল মাদরাসার ছাত্র, হাফেজ ও আলেমরা। পুলিশ ও ভয়ংকর খুনি শেখ হাসিনাকে চোখ রাঙিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল সারাদেশের মাদরাসার ছাত্র ও আলেমরা, যারা বিভিন্ন স্তরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে ও সাহসী ভূমিকা রেখেছে। ইতিহাসের ভয়ংকর নিষ্ঠুর কুখ্যাত খুনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যায়।

২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণপ্রতিরোধের প্রতিটি স্তরে স্তরে মাদরাসার ছাত্র ও আলেমদের সিগনিফিক্যান্ট স্টোরি, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের অনেক গল্প লুকিয়ে আছে। আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জায়গায় কোটা আন্দোলনের শুরু থেকে রাজপথে অবস্থান নিলেও ১৯ জুলাই ২০২৪ জুমার নামাজের পর ব্যাপকভাবে প্রতিরোধের দৃঢ় ইস্পাত প্রাচীর গড়ে তুলেছিল। কারণ ঐদিন জালিম শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জুমার নামাজের বয়ানে ইমাম ও খতীবরা প্রেরণাদায়ক সাহসী বক্তব্য রাখেন। তারমধ্যে ভাইরাল হওয়া ভিডিও বক্তব্যটি দিয়েছিলেন কওমি মাদরাসার শিক্ষক ফুআদ মুবতাসিম। জুলাই আন্দোলনের সময় মিম্বার নয়, রাজপথেই খুতবায় জ্বালাময়ী বার্তা দিয়েছিলেন এই তরুণ জুলাইযোদ্ধা আলেম। শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪ সারাদেশে শহীদ হয়েছে শতাধিক। শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪ শুধুমাত্র আলেম ও মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শহীদ ছিল দশের অধিক। অসংখ্য আহত এখনও চিকিৎসাধীন, যারা ১৯ জুলাই আহত হয়েছে। এ ইতিহাস অবিকৃত এবং সত্য। আমরা সে ইতিহাস অবিকৃত রেখে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও আলেম সমাজের সেই রক্তে ভেজা প্রতিরোধকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্মরণ করতে হবে। ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের এই ভূমিকা শুধু সাহসের নয়, বরং জালিম শাসকের বিরুদ্ধে মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক ইসলামের অঙ্গীকারের প্রকাশ। বাংলাদেশের ভবিষ্যত শুধু নাগরিকদের নয়, নৈতিক ভিত্তি সম্পন্ন আদর্শিক প্রজন্মেরও। অতএব, ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ, সাহসীকতা, বীরত্ব গাঁথাকে ফ্যাসিবাদী চক্র মুছে ফেলার নানান চক্রান্ত করছে। সেই চক্রান্ত রুখে দিতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে শুধুমাত্র ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নয় বরং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রাখা আলেম ও মাদরাসার ছাত্রদের প্রতিরোধের অবস্থানকে সম্মান জানাতে হবে।

৩৬শে জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শর্ত ছিলো, কোটা প্রথা বাতিল, সবার কথা বলার স্বাধীনতা ফিরে দেয়া, মানুষের ভোটের অধিকার ফিরে দেয়া, ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করা। ২৪-এর জুলাই আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হিম্মত নিয়ে রাজপথে লড়াই করে অনেক মাদরাসা ছাত্র ও হাফেজ শাহাদাত বরণ করেন, তাদের অবদানকে আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখতে হবে। তাদের আত্মত্যাগ ও রক্তাক্ত দেহের কথা আমরা যেন ভুলে না যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে আলেম সমাজ সামনে এগিয়ে এসেছিলেন, যেমন এগিয়ে এসেছেন ২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে। কিন্তু প্রতিবারই বিজয়ের পর তাঁদের অবদান মুছে ফেলার চেষ্টা হয়। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় কাজে আলেম সমাজকে একটি মহল উপেক্ষিত করে রাখতে চাইছে, এটা হতে দেওয়া যায় না। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগ ও তার দোসর ১৪দল এবং জাতীয় পার্টি (এরশাদ) শোষণ ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশি জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছে আলেম-উলামা, হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ অনেক আওয়ামী বিরোধী ইসলামী দলগুলো ও প্রতিষ্ঠানগুলো। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনকালে ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাদেই ১০৩ জন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীকে শহীদ করা হয়, পঙ্গুত্ব বরণ ও নির্যাতনের শিকার হয় হাজার হাজার জামায়াত-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী। এরমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪০ জন নেতাকর্মীকে জেল হাজতে ও অন্যান্য উপায়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ইতিহাসের ভয়াবহ নারকীয় নির্যাতন করে। ২০২১ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলনের দমনপীড়ন প্রায় অর্ধশত আলেম ও মাদরাসার ছাত্র হত্যা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়।

৩৬শে জুলাই অভ্যুত্থানে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিশ, ইসলামী ঐক্যজোট, কওমি ছাত্র অন্দোলন, ছাত্র মজলিশ, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। বলিষ্ঠ নেতৃত্বে হাজার হাজার আলেম সমাজ, আলিয়া ও কওমি মাদরাসার ছাত্রসহ সকল স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসের কিংবদন্তিতুল্য আখ্যান। ২ হাজারের অধিক নিহত, ২ হাজারের অধিক এক বা দু’চোখ হারানো এবং ৪০ হাজারের অধিক আহত ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে সৃজিত হয়েছে নতুন ইতিহাস। যুগান্তকারী এ ইতিহাস বিনির্মাণে অংশ নিয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলেম-উলামা এবং আলিয়া ও কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীরাও। ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করে কোটা সংস্কারের দাবিতে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। ইসলামও সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং যৌক্তিক সংস্কারের পক্ষে। একই সঙ্গে সব ধরনের জুলুম ও বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও রাজপথে রক্তের স্রোত প্রবাহিত করে দেশের আলেম সমাজ এবং মাদরাসা শিক্ষার্থীরা। দেশের আলেম সমাজ ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে যেভাবে রক্ত দিয়েছেন, তেমনি ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেও আন্দোলনের পক্ষে রাজপথে অবস্থানকারী শতাধিক আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছেন, অঙ্গ হারিয়েছেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে জুমার খুতবা দেওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন। এ ছাড়া সারাদেশে অসংখ্য আলেম শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক দলগুলো তো নির্যাতিত ছিলো, সেই সাথে আলেম-উলামা হয়েছিলেন অমানবিক নির্যাতনের শিকার। বিনা অপরাধে আলেম-উলামাদের জেলে ভরেছে, অন্যায়ভাবে বছরের পর বছর কারাবন্দি ও আয়নাঘরে বন্দি করে রেখেছে, সেই নির্মম ইতিহাস যেন আর ফিরে না আসে এটাই প্রত্যাশা করে দেশের আপামর জনগণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে কিংবদন্তিতুল্য আখ্যান হয়ে বেঁচে থাকবে অনাগত দিনে। ছাত্র-জনতার সাথে আলেম ও কওমি-আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে টানা দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে দেশ জুড়ে জুলুম-নির্যাতন, দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচার, ত্রাস ও গ্রাসের রাজত্ব কায়েম করা নিষ্ঠুর আওয়ামী ও তার দোসর ১৪দল এবং জাতীয় পার্টি (এরশাদ) জালেম গোষ্ঠীর দৃষ্টান্তমূলক পতন ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোমবার। জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলন ৫ আগস্ট সমাপ্ত হওয়ায় সে দিনটিকে ঘোষণা করা হয় ‘৩৬শে জুলাই’।

স্বাধীন দেশে পরাধীনতার জাতাকলে নিষ্পেষিত জনগণ সেদিন দ্বিতীয়বার ফিরে পায় স্বাধীনতার স্বাদ, তাই ছাত্র-জনতা ফ্যাসিস্ট মুক্ত নতুন বাংলাদেশের নাম দিয়েছেন দ্বিতীয় স্বাধীনতা। সমগ্র দেশের মানুষ সেদিন একযোগে রাজপথে নেমে আসে এবং উদযাপন করে কেয়ামত পেরিয়ে পাওয়া বিজয়ের নেয়ামত। সেদিনটি ছিল মুহাররম মাসের ২৯ তারিখ, যে মাসে পতন হয়েছিল অতীতের এক জালেম ফেরআউনের। আর সেই দিনই পতন হয় নব্য ফেরআউন কুখ্যাত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার। যুগান্তকারী এই ইতিহাস বিনির্মাণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলেম-উলামা এবং মাদরাসা শিক্ষার্থীরা। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে মাদরাসার ছাত্র ও আলেম সমাজের অংশগ্রহণ নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বইটি। ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দুঃশাসনকালে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন হাজার হাজার আলেম।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তথা আজাদী আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার জেন-জি’র বিপ্লবে তরুণ মাদরাসার ছাত্র, আলেম-উলামা সরব উপস্থিতি ছিলো। তরুণ মাদরাসার ছাত্র, আলেম উলামা তথা ইসলামপন্থীদের অগ্রণী ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে শক্তিশালী ন্যারেটিভ বা বয়ান দাঁড় করাতে না পারায় তাদের ইতিহাস ছিনতাই হয়েছে বারংবার। সে চেষ্টা যাতে আবার নতুন করে না করতে পারে এই চিন্তা থেকে এই বইটি লেখা। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আলেম সমাজ তথা ইসলামপন্থীদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। চব্বিশে আন্দোলনে আলেম হিসেবে সবার সাথে রাজপথে ছিলেন চরমোনাইর পীর সাহেব। চরমোনাই পীরের দল রাজনৈতিক ব্যানারেই দলটির নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম তাঁর নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুরু থেকে রাজপথে ছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সারাদেশে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সাহসী ভূমিকা রাখে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম, সেক্রেটারি মো. জাহিদুল ইসলাম, দফতর সম্পাদক নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, কেন্দ্রীয় নেতা সিবগাতুল্লাহ, আজিজুর রহমান আজাদ, মু’তাসিম বিল্লাহ শাহেদী, সাইদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সাদিক কায়েম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্রটারি এস এম ফরহাদসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা জীবনবাজি রেখে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রাখে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জামায়াতের ভূমিকার প্রসঙ্গে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২৪ এর গণ-আন্দোলনে কোনো নেতা মাস্টারমাইন্ড নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কোন মাস্টারমাইন্ড মানিনা। অনেকে আবার নিজেরা আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবী করে। আমি মাস্টারমাইন্ড, অমুক ভাই মাস্টারমাইন্ড তমুক নেতা মাস্টারমাইন্ড। মহান আল্লাহ ছিলেন মহাপরিকল্পনাকারী। মহান রাব্বুল আলামিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা এবং জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ সারাদেশের জামায়াতের ইসলামী নেতাকর্মীরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পুরো ৩৬ দিন ছাত্র-জনতার সাথে মাঠে ছিলেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সমন্বয় করেছেন, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন, শহীদদের লাশ পরিবারের কাছে নিয়ে গেছেন ও জানাজা নামাজ-দাফনের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়াও হেফাজতে ইসলাম, কওমি-আলিয়ার আলেম-উলামা, আলিয়া ও কওমি মাদরাসার ছাত্ররা চব্বিশের আন্দোলনে স্বশরীরে রাজপথে ছিল। জুলাই বিপ্লবে হটস্পট ছিলো যাত্রাবাড়ি এলাকা। যাত্রাবাড়ি পুরো এলাকায় ছিলো ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদরাসা যাত্রাবাড়ি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা, সাথে ছিল যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থিত তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসাসহ আলিয়া মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা। জুলাই বিপ্লবে শতাধিক আলেম শহীদ হয়েছেন। ভয়ংকর নিষ্ঠুর আওয়ামী লীগ ও তার দোসর পুলিশরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত মাদরাসার ছাত্র ও আলেমদের জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে যাত্রাবাড়ী, সাভার ও আশুলিয়াতে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ও মিডিয়াতে সেই ভিডিও ভাইরালও হয়েছে। তা সত্ত্বেও এখনো আলেম সমাজ উপেক্ষিত। আলেম সমাজকে উপেক্ষা করে কোনো দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় বেশি দিন টিকতে পারবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচারে আলেম সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে টিকতে পারে না, সেটা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে। আগামীতে যারা ক্ষমতায় যাবে তাদের সেই শিক্ষা গ্রহণ করা দরকার। তাদের উচিত পীর মাশায়েখ, আলেম-উলামার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। সেই সাথে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ এদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিকে জায়নামাজ মনে করে আলেম-উলামারা, এই জায়নামাজে যারা হাত দিবে তাদের পতন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মতো হবে। কারণ জুলাইয়ে আলেম-মাদরাসার ছাত্ররা জীবন দিতে শিখেছে তাদের মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের শ্রদ্ধা ও স্মরণে ৫৮ শহীদের নামফলক দিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় নির্মিত হচ্ছে ‘শহীদি ঐক্য চত্বর’। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা এলাকায় নিহতদের স্মরণে ‘শহীদি ঐক্য চত্বর’ উদ্বোধন করা হয় ২১ অক্টোবর ২০২৪ সোমবার। জুলাইয়ের আন্দোলনে চরম প্রতিরোধ গড়ে তোলার কারণে যাত্রাবাড়ীকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ বলা হচ্ছে। তুমুল লড়াই করে যাত্রাবাড়ীবাসী তাদের ত্যাগের প্রমাণ দিলেও তার স্বীকৃতি মেলেনি একদমই। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার যাত্রাবাড়ীর অবদান স্বীকার করা তো দূরের কথা, মনেই রাখেনি। অথচ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধটা যাত্রাবাড়ীতে হয়েছে এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কার থেকে শুরু করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী যা কিছু হয়েছে, তাতে যাত্রাবাড়ীবাসীর তথা মাদরাসার ছাত্রদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জার্মান নাৎসি বাহিনী রাশিয়ার স্ট্যালিনগ্রাদ শহরে ব্যাপক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর ইতিহাসে শহরাঞ্চলে এত বড় লড়াই আর হয়নি। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ মিলে ছাত্র-জনতার ওপর প্রতিদিন গুলি চালালেও আন্দোলন দমানো যায়নি। তাই পৃথিবীর ইতিহাসে যাত্রাবাড়ীর নাম রাশিয়ার স্ট্যালিনগ্রাদ শহরের মতো খ্যাতি লাভ করবে কিনা এটা ইতিহাসই বলে দিবে।

আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভূমিকা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে সেভাবে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়নি। গণমাধ্যমে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে এটা দেশের আপামর জনগণের দাবি। জুলাই-২৪ বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে ইসলামী দলগুলোর, ইসলামী ছাত্র সংগঠনগুলোর, মাদরাসার শিক্ষার্থী, কুরআনে হাফেজ ও আলেমদের অবদান উল্লেখ থাকতে হবে। কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার পাশে মাদরাসার শিক্ষার্থী ও আলেমরা ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় ছিল। আন্দোলনে ইসলামপন্থীদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া দেশের আলেম সমাজ গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অতএব জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে তাদের অবদানের উল্লখ না থাকলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে যাত্রাবাড়ী ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সক্রিয়। এই এলাকার কওমি মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা সাধারণ ছাত্র-জনতার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে সংগ্রামে নেমেছিলেন। ‘সাধারণ আলেম সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এক সংহতি সমাবেশে মাওলানা রিদওয়ান হাসানের নেতৃত্বে মাওলানা মূসা আল-হাফিজ, মাওলানা আবদুল্লাহ আল-মাসউদ, মাওলানা উসামা সিরাজসহ অনেক আলেম সাহসিকতার সঙ্গে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। এই সমাবেশ থেকে একটি মিছিল বের হয়, যা কাজলা থেকে কুতুবখালী খাল অতিক্রম করে। তারা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ‘গাশত কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন, যার মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদের স্বাতন্ত্র্য ফুটে ওঠে।

এই আন্দোলনে শতাধিক কওমি আলেম ও শিক্ষার্থী শাহাদাত বরণ করেন। কওমি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা মাওলানা শিহাব উদ্দীন জুমার নামাজের পর ঘাতকের গুলিতে নিহত হন। তরুণ আলেম রোকন রাইয়ান যাত্রাবাড়ীতে বুলেটবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। ১২ বছর বয়সি মাদরাসা শিক্ষার্থী আরাফাতের শাহাদাত ছিল হৃদয়বিদারক এক ঘটনা, যা কওমি সমাজের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক অমর সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। ৯ বছর বয়সী শাফক্বাত সামির শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪ নিহত হয়। এ শিশু মিরপুরে জামেউল উলূম মাদরাসার নূরানী বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। একই দিনে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে নিহত হয় ১২ বছর বয়সী জোবাইদ হোসাইন ইমন। ১৩ বছর বয়সী রাব্বি মাতবর ১৯ জুলাই ২০২৪ মিরপুরে নিহত হয় গুলিতে, মিরপুর এলাকার তা’লীমুল কোরান হাফেজি মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল। ১৪ বছর বয়সী ইবরাহীম খলিল যাত্রাবাড়ীর সাইনবোর্ড এলাকার হাফেজি মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল। সমবয়সী সাদ মাহমুদ খান ছিল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জাবালে নূর দাখিল মাদরাসার ছাত্র। ২০ জুলাই ২০২৪ সাভারের নিউমার্কেটের সামনে গুলিতে নিহত হয় সে। কিশোর আশিকুল ইসলাম আল-ইয়াস আশিক ১৯ জুলাই হত হয়। ২০ জুলাই ২০২৪ চোখে গুলিবিদ্ধ ১৬ বছর বয়সী মো. বাঁধন ৬ আগস্ট মারা যান। সমবয়সী আশিকুল ইসলাম ১৯ জুলাই দিনাজপুরে গুলিতে নিহত হয়। শরীয়তপুরের মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং হাফেজ সিফাত হোসাইন পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের ইংলিশ রোডে গুলিতে নিহত হন। ১৭ বছর বয়সী শহীদ নাহিদুল ইসলাম ৫ আগস্ট আদাবর থানার সামনে নিহত হয়। একই দিনে নিহত হন খিলগাঁওয়ের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলূমের ছাত্র হাফেজ মুহাম্মাদ যুবায়ের আহমাদ। ৫ আগস্ট চাঁনখারপুলে গুলিবিদ্ধ ১৭ বছর বয়সী ইশমামুল হক দুই দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান। ১৯ জুলাই ২০২৪ ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বরে প্রাণ হারান চাঁদপুরের ফুলছোঁয়া মাদরাসার ১৮ বছর বয়সী হাফেজ সাজ্জাদ হোসাইন সাব্বির। গাজীপুরের মাখলাজুন ঈমান মাদরাসার শিক্ষার্থী মো. আয়াতুল্লাহর লাশ ১৬ আগস্ট ২০২৪ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাওয়া যায়। ৪ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হন জামিয়া আশরাফিয়া মাদরাসার আব্দুল্লাহ আল মামুন। মাদারীপুরে হাফেজ সাদিকুর রহমান ও তাওহীদ সান্নামাত ১৯ জুলাই ২০২৪ নিহত হন। দেবীদ্বার ছৈয়দপুর মাদরাসার মুহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম রাসেল ৪ আগস্ট ২০২৪ কুমিল্লায় নিহত হন। মাদরাসাতুল আবরারের শিক্ষার্থী হাফেজ আবদুল্লাহ শনির আখড়ায়, হাফেজ আনাস বিল্লাহ ও আরজ আলী সাতক্ষীরায় নিহত হন ৫ আগস্ট ২০২৪। সাব্বির ১৮ জুলাই গুলিতে নিহত হন। বারিধারার জামিয়া মাদানিয়ার হাফেজ মাহমুদুল হাসান, খালিদ সাইফুল্লাহ, জামিয়া বাগে জান্নাত মাদরাসার মাবরুর হুসাইন (গোলাম রাব্বি) ও শাহজাহান হৃদয় মহাখালীতে ২৪ জুলাই ২০২৪ নিহত হন। ৫ আগস্ট ২০২৪ যাত্রাবাড়ীতে মো. শাকিল, দারুস সালাম মাদরাসার নুর মুস্তফা কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ে, জামিয়া কারিমিয়া আলেয়া বেগম বহুমুখী মাদরাসার জয়নুল আবেদীন ও কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলূমের মুহাম্মাদ সিফাতুল্লাহ নিহত হন। ২১ জুলাই ২০২৪ যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ মাইন উদ্দিন ২৫ জুলাই ২০২৪ নিহত হন। ২০ জুলাই ২০২৪ নরসিংদীর মাধবদীতে গুলিবিদ্ধ সুমন মিয়া ২৩ আগস্ট ২০২৪ মারা যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হোসাইন মিয়া ৪ আগস্ট ২০২৪ নিহত হন। একই দিনে ফেনীতে গুলিবিদ্ধ মাহবুবুল হাসান মাসুম ৭ আগস্ট ২০২৪ চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এতো এতো তাজা প্রাণের বিনিময়ে আমরা ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট হাসিনা হতে মুক্তি পাই। কওমি মাদরাসার এই আলেম ও শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ যেন আমরা ভুলে না যায়। কওমি মাদরাসার ভূমিকা শুধু রাজপথে নয়, বরং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বারিধারার জামিয়া মাদানিয়া মাদরাসা আন্দোলনকারীদের জন্য নিজেদের দরজা খুলে দেয়। মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর নির্দেশে ছাত্ররা আন্দোলনকারীদের জন্য পানি, শরবত, স্যালাইন, বিস্কুট ও বিরিয়ানি বিতরণ করেন। বিশ্রাম ও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মাদরাসার গেট সর্বদা উন্মুক্ত রাখা হয়। এমনকি ট্রাফিক পরিচালনা ও রাস্তা পরিষ্কারের কাজেও তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ আহতদের চিকিৎসার জন্য পাঁচ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং পরে আরও পাঁচ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি দেন। জুলাই বিপ্লবের সময় এবং পরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও কওমি শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেছেন। মাওলানা উসাইদ মুহাম্মদের আঁকা ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ শীর্ষক গ্রাফিতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি পুরোনো দেয়ালে ফুটে ওঠে, যা জুলাই বিপ্লবের এক প্রতীকী চিত্র হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরামের আয়োজিত ‘জুলাই কবিতা প্রতিযোগিতা’-তে আলেম কবিরা স্বরচিত কবিতার মাধ্যমে বিপ্লবের চেতনাকে অমর করে রাখেন। সবমিলিয়ে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কওমি মাদরাসার ছাত্র ও আলেম সমাজ শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিনিধি হিসেবেই নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, মানবতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাদের এই অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মিল্লাত মাদরাসার ভূমিকা: ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে এক অকুতোভয় দুঃসাহসী ভূমিকা রাখে তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থীরা, জুলাই বিপ্লবে ৫ জন মিল্লাত মাদরাসার ছাত্র শহীদ হয়। ১৬ জুলাই তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা টঙ্গীর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। আন্দোলন দমাতে না পেরে সরকার সারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে দেয়। এতে করে জনমনে সরকারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব আরো প্রকট হয়ে ওঠে। সরকার আন্দোলন দমাতে পেশিশক্তি ও অস্ত্রের ব্যবহার করেও শিক্ষার্থীদের রুখতে ব্যর্থ হয়। ১৮ জুলাই উত্তরাতে তা’মীরুল মিল্লাতের অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। মিল্লাতের ছাত্র শাকিল পারভেজ এদিন শাহাদাত বরণ করেন উত্তরাতে। এর প্রেক্ষিতে ১৯ জুলাই আবার উত্তরাতে ব্যাপক ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে আন্দোলন তীব্রতা লাভ করে। হাসপাতালগুলোতে লাশের স্তূপ বাড়তে থাকে, সারা দেশে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। তবুও ছাত্র-জনতা থামেনি। এদিন রাতে ২০ জুলাই ২০২৪ আওয়ামী প্রশাসন জোরপূর্বক তা’মীরুল মিল্লাতের আবাসিক সকল ছাত্রাবাস থেকে শিক্ষার্থীদের রাতের মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। প্রশাসন এই নির্দেশ পেয়ে মাদরাসার উপাধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের সাথে অকথ্য গালিগালাজ করে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষার্থীরা দিগবিদিক হয়ে হল ত্যাগ করতে বাধ্য হয় তারা। তবুও অনেক শিক্ষার্থী ছাত্রাবাসের ছাদে, বারান্দায় নির্ঘুম রাত কাটায়। প্রথম দফায় ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ করলেও দ্বিতীয় দফায় দুপুর ৩.৩৫ মিনিটে গাজীপুর থেকে ঢাকা অভিমুখে রাস্তায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, হেলিকপ্টার থেকে র‌্যাব এবং ঢাকা থেকে গাজীপুর অভিমুখে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা মিলে চারিদিক থেকে হামলা চালায়। হেলিকপ্টার থেকে র‌্যাব ও সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবির অসংখ্য গুলিতে শুধু এশিয়া পাম্পেই তা’মীরুল মিল্লাতের শিক্ষার্থী শহীদ নাসির ইসলামসহ ১০ জনের অধিক শহীদ হয় এবং আহত হয় অন্তত তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা।