বাংলা ভাষায় ইংরেজি একটি শব্দ শুনলেই সবারই মন আঁতকে ওঠে। সে শব্দ হলো Gang. যার সহজ বাংলা অর্থ হলোÑ দল।
Gang শব্দটি কখনও কারো কাছে ভালো শোনা যায় না। যদি আমরা বলি কিশোর দল, অন্যদিকে যদি বলা হয় কিশোর গ্যাং, তাহলে কি আমাদের মনে একই অর্থ প্রকাশ পাবে? আমার মনে হয় নিশ্চয়ই তা নয়। আমরা যারা বাবা-মা, ভাই-বোন, খালা-মামা, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক তথা বয়স্ক সকল মানুষের মনেই আজ এই প্রশ্ন। কোথা থেকে এবং কিভাবে কিশোর গ্যাং এর আবির্ভাব ঘটল। শিশুরা তো হলো পুত-পবিত্র। ফুলের মতো সুন্দর। প্রবাদ আছেÑ শিশুরা ফেরেশতার মতো। শিশুকাল পেরিয়ে কৈশোরে যখন পা দেয়, ধীরে ধীরে যৌবনের উন্মেষ পর্বে ওঠেÑ বয়ঃপ্রাপ্তির আগ পর্যন্ত এ সময়টা তো জীবন পরিক্রমা পরিবর্তনের পালা। জীবনকে গঠন করে তোলার অধ্যায়। এ সময় কি করে অন্য মাত্রায় চলে যায়, তখন তো তারা কিছুই বোঝে না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পথের খাদে পড়ে যায়Ñ সেখান থেকে উঠে আসা কঠিন এবং অসম্ভব হয়ে ওঠে।
কিশোর গ্যাং নিয়ে আমি কোনো বিস্তারিত আলোচনা করতে যাব না। কিশোররা কিশোর গ্যাং না হয়ে যাতে কিশোর আলো হয়ে দেখা দেয়, সেটা নিয়েই আজকে আমার এই ক্ষুদ্র লেখা। আজকাল মাঝে মধ্যেই কিশোরদের যেসব কর্মকাণ্ড পত্র-পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে দেখতে পাই তাতে আমরা নির্বাক হয়ে যাই, আমাদের মনটা দুমড়ে-মুচড়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। জীবনের মাত্র শুরুতে কিশোর কিশোরীদের অনৈতিক-উচ্ছৃঙ্খল তথা সমাজে সংঘটিত চারদিকের এসব অনৈতিক ঘটনার তীব্র যন্ত্রণাবোধ থেকেই একজন অভিভাবক হিসেবে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। আজ আমাদের ভাবতে হবে আমরাও তো একদিন কিশোর-কিশোরী ছিলাম। আমাদের তো এ সকল ক্লান্তিকাল পাড়ি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষের স্তরে পৌঁছাতে হয়েছে। তাই আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়ে তথা কিশোর-কিশোরীকে কিশোর আলো হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারা যেন কিশোর গ্যাং না হয়Ñ এদিকে সুতীক্ষè নজর রাখতে হবে। বাবা-মা, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের যে কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তা যদি সযত্নে সতর্কতার সাথে তারা পালন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে আদর্শ, চরিত্রবান, সুশিক্ষিত, সভ্য, উন্নত সমাজ ও জাতি তথা দেশে বিনির্মাণ করতে অপরাগ হয়ে যাবে।
সব বাবা-মাকেই তো শিশু ও কৈশোরকাল পেরিয়ে আসতে হয়। এছাড়া আরো একটি কাল পেরিয়ে আসতে হয় যাকে বলা হয় যৌবনের উন্মেষ পর্ব। কৈশোরের শেষ পাদ এবং যৌবনের সূচনার মধ্যবর্তী সময়টাই ‘এ কাল’ বলে পরিচিত। সাধারণত ১০ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে সময়টা হয়ে থাকে। সময়টাকে শিশু কৈশোরকালের মধ্যেই গণ্য করা হয়। অবশ্য কোনো কোনো সময় আবহাওয়া ও ভৌগোলিক কারণে এ সময়ের তারতম্যও হতে পারে। তবে সত্য এবং আসল কথা এই যে, সকল মানুষের জীবনে এ কাল আসে এবং এ কাল পেরিয়ে যায়। এ কালকে বলা যায় যৌবনের উৎকর্ষ বা বিকাশ-পর্ব। ইংরেজিতে এ সময়টাকে বলা হয়, ‘Adolescent period’.
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, Adolescent period is the period of storm and stress.কোনো কোনো মনোবিজ্ঞানী বলেছেন, It is the period of identity crisis.কিশোর-কিশোরী যখন তাদের কৈশোর পেরিয়ে এ কালে পা রাখে, তখন নানারূপ ভাবনা জাগে। জানা-অজানা নানা আকুতিও তাদের হৃদয়ে দোলা দেয়। তাদের চিত্ত-চাঞ্চল্য বেড়ে যায়। যৌবনের আগমন সম্পর্কে চিন্তা ও তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভাব দেখা যায়। দুর্বার, দূরন্ত, দুর্গম হয়ে উঠতে চায়। হাসি-কান্না, উদ্বেগ-কৌতূহল বাড়ে। হঠাৎ অশান্ত কিংবা দ্রোহ ভাবের প্রকাশ ঘটে। আবার আবেগ-উচ্ছ্বাস, উৎসাহ ইত্যাদির আগমনও ঘটে।
ঠিক এ মুহূর্তে কিশোর-কিশোরী তাদের অস্থিরতার কারণ বুঝতে পারে না। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই তারা বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ে।
১০ থেকে ১৮ বছর অর্থাৎ শৈশব আর তারুণ্যের মধ্যবর্তী এই যে সময়Ñ এটা একজন মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালার মধ্যে ছোট একটা নৌকা যেমন দুলতে থাকে, যে কোনো মুহূর্তে সে নৌকা তরঙ্গাঘাতে ডুবে যেতে পারে, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে চিরতরে, ঠিক তেমনি বয়ঃপ্রাপ্তির এ সন্ধিকালটা একজন কিশোর-কিশোরীর জীবনকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ছোট নৌকাটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে যেমন দরকার সুদক্ষ কোনো মাঝির দৃঢ় হাতে নৌকার হাল ধারণ করা, তেমনি একজন কিশোরের এ কালটাকে পার হয়ে আসার জন্য দরকার সংবেদনশীল ও স্নেহশীল একজন কাণ্ডারির সতর্ক সংসর্গ প্রদান। এ কাণ্ডারি হতে পারে প্রধানত মা-বাবা বিশেষ করে মা। নেপোলিয়ন বোনাপাট বলেছেন, ও If you give a good mother, I shall give you a good nation. একটি সুন্দর এবং আদর্শ জাতি গঠনের ক্ষেত্রে মা-বাবার ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা উক্ত একটি মাত্র বাক্যে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।
মা-বাবাকে এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এগিয়ে আসতে হবে বন্ধুরূপে, শিক্ষকরূপে। একান্ত দরদের আপনজন হিসেবে হৃদয় নিংড়ানো অকৃত্রিম আদর ও ভালবাসা নিয়ে সন্তানের মাঝে এসে তাদের দাঁড়াতে হবে, পথ নির্দেশ করতে হবে। মনে রাখতে হবেÑ পারিবারিক অশান্তি এবংBroken family সমূহ কুফল বয়ে আনতে পারে। অনাথ বাস্তুহারা শিশু-কিশোরদের ছন্নছাড়া জীবনও এসব কাজে ইন্ধন জোগায়। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তাদের সমাদরের সাথে সমাজে পুনর্বাসন করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে স্বাবলম্বী করা। এ বয়সের ছেলেরা অনেকটা দুরন্ত হয়ে উঠতে চায়, নিজেকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করতে চায়। মহান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বিধান এবং প্রকৃতিগতভাবে মেয়েরা রূপ সচেতন হয়ে ওঠে, সাজগোজ করতে আগ্রহী হয়, পারস্পরিক একটা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। তাই এই Transitional period-এ যতসব বিষয় ছেলেমেয়েদের চরিত্র গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে তার সবগুলোর দিকেই লক্ষ রাখতে হবে। আর্থিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সবগুলো দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া দ্রুত এবং অতি সহজে প্রভাবিত করে এরূপ কতগুলো দিকও রয়েছে যেমনÑ টিভি, ভিসিআর, সিনেমা-নাটক, খুন-খারাবি, গান-বাজনা, যাত্রানুষ্ঠান, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, বিদেশি সংস্কৃতি এবং অপসংস্কৃতি অনুসরণ, মারামারি, কাটাকাটি, ছল-চাতুরি, অশ্লীল শব্দ, ঝগড়া-বিবাদ, অশুভ দৃশ্য, আধুনিকতার নামে নীতি-নৈতিকতা, ভালো-মন্দ কোনো বাছবিচার না করে অনুকরণের প্রবণতা এবং অসৎ সংসর্গ ইত্যাদি। বর্তমানে অত্যধিক প্রভাব বিস্তার করে আছে স্মার্ট মোবাইল ফোন, তথা ইউটিউবসহ অন্যান্য অনৈতিক উপাদানসমূহের যথেচ্ছ ব্যবহার। এসব কারণে কত দুর্ঘটনা ঘটছে সেটা তো সর্বত্র দৃশ্যমান। অত্যন্ত দুঃখ এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, স্মার্ট মোবাইল হাতে নিয়ে খোলার সঙ্গে-সঙ্গেই এমন কিছু ছবি দৃশ্যমান হয় যে, চোখ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। আর কেউ যদি কিছু দেখতে চায় তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অবশ্য অনেক ভালো এবং গঠনমূলক জ্ঞান-গবেষণার উপায়-উপকরণের অজানা তথ্যসমূহ, জানা-অজানা জ্ঞানের ভাণ্ডার এতে আছে। এটার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সংযত হতে হবে।
পত্রপত্রিকায় যারা কাজ করেন, যারা নাটক, সিনেমা, থিয়েটার নির্মাণ করেন এবং লেখালেখি করেন অথবা যারা এগুলোর ব্যবসা করেন, তারা সকলেই কোনো না কোনো স্তরের বাবা-মা কিংবা ভাই-বোন সর্বোপরি সমাজের একজন ব্যক্তি। মনে রাখতে হবেÑ ‘শিশুর পিতা ঘুমিয়ে আছে সব শিশুদের অন্তরে।’ তাই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ যত অঙ্গন আছে, সকল অঙ্গনে এই বোধ নিয়ে যদি আমাদের সুকুমার বৃত্তির পরিচয় ঘটে, তাহলে সামগ্রিকভাবে পরিবেশটা নির্মল ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক অনুষ্ঠান নির্মল আনন্দ প্রদানের ব্যবস্থাসহ শিশু-কিশোরদের চাহিদা মিটানোর সর্বপ্রকার সুন্দর সুব্যবস্থা থাকা দরকার। তাদের উপযোগী শিশু-কিশোর সাহিত্য, ম্যাগাজিন, রম্যরচনা নির্মাণ, হাসির গল্প, নবী-রাসূল (সা.), সাহাবী (রা.)সহ বড় বড় মানুষের বাল্যকালের জীবনী, গল্প ইত্যাদি ব্যাপকভাবে তাদের পড়ানো এবং শোনানো দরকার। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান একটি অপরিহার্য বিষয়। গৃহের পরিবেশে বাবা-মাকে ও স্কুলের পরিবেশে শিক্ষক-শিক্ষিকাকে এ সকল বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, বইপড়াসহ বিভিন্নমুখী নির্মল বিনোদনমূলক কাজে আগ্রহী করে তুলতে হবে এবং নিয়োজিত রাখতে হবে।
কিশোর-কিশোরীরা আজ দিশেহারার মতো অবস্থায়, কারণ তাদের সামনে কোনো আদর্শ নেই, কোনো লক্ষ্য নেই। তাই দরকার একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ আদর্শ এবং লক্ষ্যের। সে আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা এগিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ইসলামই পূর্ণাঙ্গ, সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ সর্বযুগের কল্যাণময় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শ দিয়েছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষের জীবনে যত সমস্যার উদ্ভব হতে পারে, তার সমাধান দিয়েছে এবং চলার পথ বলে দিয়েছে। আজ দরকার মুক্তমন নিয়ে সে আদর্শ বুঝবার, উপলব্ধি করার এবং সেই লব্ধজ্ঞান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার। এ পৃথিবীতে প্রত্যেক ধর্মই তো মানুষকে ভালো হতে শিক্ষা দেয়, নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেÑ সৎভাবে জীবনযাপন করতে বলেÑ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। সকল জাতিই তাদের সন্তানদের এবং সমাজকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে চায়। অনৈতিকতা, অসততা, অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা কেউ তো চায় না।
বিস্তৃত আলোচনায় না গিয়ে শুধুমাত্র এসবের আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে একটি দিক নিয়ে বলা যায় যে, ইসলাম শিশুকাল থেকেই সন্তানদের উঁচু মানের শিষ্টাচার এবং নীতি-নৈতিকতা ও আদব-কায়দা শিক্ষা দিতে তাগিদ দিয়েছে। আমাদের সন্তানদের ৭ বছর বয়সে সালাত (নামাজ) আদায় করতে শিক্ষা দিতে বলেছে। দশ বছর বয়সে নামাজ পড়ার জন্য সোহাগের সাথে শাসন করতে বলেছে এবং ১০-১২ বছর বয়স থেকেই ছেলেমেয়েকে আলাদা বিছানায় থাকতে নির্দেশ দিয়েছে, এমনকি বাবা-মার বিছানা থেকেও তাদের আলাদা থাকতে বলা হয়েছে। বয়ঃপ্রাপ্তির পর থেকেই মেয়েদের পর্দা মেনে চলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পর্দা মানে তো এটা নয় যে কালো রঙের বোরখা আপদমস্তক পরিধান করে চলতে হবে। পর্দা করার মানে ছেলেমেয়ে তথা নারী-পুরুষকে এমন পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন, যে পোশাক পরলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং অবয়ব বাইরে প্রকাশ পায়।
আজকাল পার্কের কোনো গাছতলায় কিংবা লেকের ধারে, সিনেমা-থিয়েটারে, কিংবা পাশাপাশি বসে টিভি, ভিসিআরে কোনো অশ্লীল দৃশ্য দর্শন বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের কোন্ দিকে নিয়ে যাবে, তা বাবা-মাকে বুঝতে হবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের হাতে হাতে স্মার্ট মোবাইল এবং তার যথেচ্ছ ব্যবহার তাদের ওপর জীবনের শুরুতেই কী সব প্রভাব ফেলছে, তা সকলকেই ভাবতে হবে। মনোবিজ্ঞানে ইংরেজিত একটি বাক্য আছে- ‘Method of introspection’. অর্থাৎ To look in to one’s own self. or, to look within oneself. অর্থাৎ অন্তর্দশন করা। আসুন- নিজের দিকে নিজে তাকিয়ে দেখি।
আমরা যারা আজ অভিভাবক, সন্তানদের পিতামাতা তারা তো সকলেই শিশু-কিশোর এবং বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে এসেছি। তাই আমরা যদি আমাদের অন্তদর্শনের মাধ্যমে এ সময়টার দিকে পিছনে ফিরে তাকাই তাহলে আমাদের চোখে কি ভেসে উঠবে? এ সময়টা যে কঠিন সময় তা সকলেই আমরা নিশ্চয়ই একমত হব। এ সময়টার প্রভাব কি তাও আমরা অন্তর দিয়ে বুঝতে সক্ষম হব। তাই আমাদের অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। ছেলেমেয়েদের প্রতি অতি দরদ-স্নেহ-সোহাগ ভরা মন নিয়ে তাদের পরিচালনা করতে হবে এবং তাদের আপন বন্ধু হয়ে সঠিক পথের সন্ধান দিতে হবে। মা-বাবা, ভাইবোন, শিক্ষক-শিক্ষিকার সঠিক দায়িত্ব পালন এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এতে আমরা অবহেলা বা শৈথিল্য দেখাই আমাদের জীবনটাও এবং আমাদের সন্তানদের জীবনটাও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। সন্তানদের সাথে রূঢ় বা কঠিন আচরণ করা যাবে নাÑ আবার একেবারে নরম বা হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা সর্বোপরি নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত ও ধারণ করে গড়ে তুলতে হবে।
বাবা-মা তথা অভিভাবকদের নিজের জীবনের কাজকর্ম, চালচলন তাদের সামনে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন, আচার-আচরণ, ব্যবহার, কথাবার্তা, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির দিকেও সুতীক্ষè নজর রাকতে হবে। সর্বোপরি আমাদেরকে তাদের একান্ত আস্থাভাজন, পরম দরদি বন্ধু হতে হবে এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে।
বাবা-মা হিসেবে আজ খুব গভীরভাবে তার কিশোর ছেলেমেয়েরা তাদের বয়ঃসন্ধিকাল কীভাবে উৎরে যাচ্ছে, তা দেখতে হবে। কারণ এ বয়সের ওপর নানান প্রভাবের কারণে তার ছেলেমেয়ে হাইজ্যাকার, চোর, ছিনতাইকারী খুনি, লুটেরা, লম্পট, উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যেতে পারে। কিশোর গ্যাং এবং কিশোর অপরাধ কেন সংঘটিত হয়, তা বাবা-মা অভিভাবকসহ সমাজের সকলকেই লক্ষ রাখতে হবে।
আমাদের সন্তানদের আমরা কিশোর গ্যাং-এ দেখতে চাই না। আমরা কিশোর আলোয় আলোকিত অঙ্গনে দেখতে চাই। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে আমরা তাদের দেখতে চাই আলোকিত অঙ্গনে । আর এই হোক আমাদের স্বপ্ন ও ধ্যানধারণা এবং প্রতিটি কাজে এর বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিফলন।
সব শেষে হযরত ওমর (রা.)-এর জীবনের একটি শিক্ষণীয় ঘটনা উল্লেখ করে আল্লাহর ভয় এবং সততা ছেলে-মেয়েদের জীবন গঠনে যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা অনুধাবন করার জন্য মা-বাবা তথা অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
“একবার হযরত ওমর (রা.) গভীর রাতে ছদ্মবেশে মদীনার পথ ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন এবং প্রজাদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। এই সময় দেখতে পেলেন এক রাখাল ছেলে একপাল ছাগল নিয়ে তার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। তিনি রাখাল ছেলেটাকে পরীক্ষা করার উদ্দেশে বললেন, ‘এই ছাগলগুলোর মধ্য থেকে যে কোনো একটা ছাগল আমার কাছে বিক্রি করে দাও।”
ছেলেটি বলল, ‘এ ছাগলগুলো আমার নয়। আমার মনিবের। আমি তার ক্রীতদাস।’
হযরত ওমর (রা.) বললেন, ‘আমরা যে জায়গায় আছি, এখানে তোমার মনিব আমাদের দেখতে পাবে না। একটা ছাগল বেচে দাও। আর মনিবকে বলে দিও যে, একটা ছাগল বাঘে খেয়ে ফেলেছে।’
রাখাল ছেলেটি রাগান্বিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আল্লাহ কি দেখতে পাচ্ছেন না?’ হযরত ওমর (রা.) চুপ করে রইলেন। ছেলেটি তার দিকে রাগত চোখে তাকিয়ে গরগর করতে করতে ছাগল নিয়ে চলে গেল।
পরদিন সকালে হযরত ওমর (রা.) ঐ রাখালের মনিবের কাছে গেলেন এবং তাকে মনিবের কাছ থেকে কিনে নিয়ে স্বাধীন করে দিলেন। অতঃপর বললেন, ‘হে যুবক, কালকে তুমি আল্লাহ সম্পর্কে যে কথাটা বলেছিলে, তা আজ তোমার দুনিয়ার গোলামি ঘুচিয়ে দিল। আমি আশা করি, তোমার এই আল্লাহভীতি কিয়ামতের দিন দোযখের আজাব থেকেও মুক্তি দেবে।” (হাদীসের কিসসা, হাফেজ মাওলানা আকরাম ফারুক)।
আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সৎ ও আল্লাহভীরু।
আলোচনার এই প্রেক্ষিত সামনে রেখে আসুন মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার কাছে আমাদের সন্তান-সন্ততি তথা কিশোর-কিশোরীদের জন্য এই দোয়া করিÑ তারা যেন সমাজে দীপ্তিময় আলোকবর্তিকা হয়ে নিজেদের জীবন গড়ে তোলার তৌফিক লাভ করে।
‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী, স্বামী ও সন্তান-সন্ততি, বংশধর দান কর, যাদের দেখে আমাদের নয়ন জুড়াবে এবং আমাদেরকে পরহেজগারদের জন্য অনুসরণযোগ্য বানাও।’ (সূরা ফুরকান : ৭৪)।
হে আমার রব! আমাকে তৌফিক দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নিয়ামত দান করেছ, আমি যেন তোমার সেইসব নিয়ামতের শোকর আদায় করতে পারি এবং আমি যেন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করেছো এবং যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও। আমার সন্তানকেও সৎকর্মপরায়ণ বানাও। আমি তোমারই অভিমুখী হলাম এবং আত্মসমর্পণ করলাম। (সূরা আহকাফ : ১৫)।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেনÑ মানুষ যখন ইন্তেকাল করে তখন তিনটি আমল ব্যতীত তার সকল আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আর তা হলোÑ ১. ছদকায়ে জারিয়াহ, যেমনÑ (সমাজ হিতকর কাজকর্ম। যেমনÑ ব্রিজ-কালভার্ট, রাস্তা নির্মাণ, মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা ও বৃক্ষ রোপণ ইত্যাদি) এবং দ্বীনি ইলম প্রদান) এবং ২. উপকারী ইলম এবং ৩. নেক সন্তান। (মুসলিম শরীফ)।
অর্থাৎ সৎ-চরিত্রবান-আদর্শবান ছেলেমেয়ে রেখে গেলে তাদের সৎ কর্মগুলোর জন্য তাদের বাবা-মাগণ পরপারে যাওয়ার পরও সাওয়াব বা পুণ্য লাভ করতে থাকবে। তাদের দোয়া জারি থাকবে।
তাই আমরা সকল অভিভাবকরা এ দোয়াই করবÑ আল্লাহ তায়ালা আমাদের পিতা-মাতাকে কবরে শান্তি দান করুন এবং তাদের জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমাদের সন্তান-সন্ততি এমনভাবে গড়ে তোলার তৈফিক দান করুন যেন আমরা ইন্তেকাল করার পর ছেলেমেয়েরা আমাদের জন্য রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করতে পারে।
রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানী সাগিরা।
‘হে আমার প্রভু তাদের (পিতা-মাতা) প্রতি রহম করো যেভাবে মৈশবে তারা দয়া, মায়া ও কোমলতার পরশে আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সূরা বনী ইসরাইল : ২৪)।
আমরা যারা পিতা-মাতা এবং অভিভাবক তারাও আল্লাহর কাছে দোয়া করবÑ রাব্বান্না হাবলানা মীন আওয়াজিনা, ওয়া জুররীযাতিনা কুররাতা আওনীন ওয়াজআলনা লীল মুত্তাকীনা ইমামা।
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি বংশধর দান কর যারা হবে আমাদের নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদেরকে কর মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ।’ (সূরা আলফুরকান : ৭৪)।
সব আমলের মূল হলো সালাত। তাই শিশুকাল থেকেই নামায কায়েমে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তান-সন্তুতিকে নামায আদায় করতে আদেশ করো, যখন তারা সাত বছরে পদার্পণ করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে। Ñসূরা আনকাবুত : ৪৫। আর নামাযের জন্য তাদের শাসন করো, যখন তারা দশ বছর বয়সে উপনীত হয়। (আবু দাউদ)। ‘(হে ছেলে) সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎকাজে বাধা দেবে এবং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করবে। এটাই দৃঢ় সঙ্কল্পের কাজ।’ (সূরা লোকমান : ১৭)। ‘অহঙ্কার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করিও না। কারণ আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা লোকমান : ১৮)। ‘তুমি পদচারণ করিও সংযতভাবে এবং তুমি তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করিও, স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সূরা লোকমান : ১৯)। সন্তানদের শৈশব থেকেই সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে হযরত লোকমানের এই সব নসিহতের গুরুত্ব অপরিসীম। পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে যদি আমরা সন্তানদের শিশু এবং কিশোরকাল থেকেই কুরআন এবং হাদীসের উপরোক্ত এই শিক্ষাগুলোর ভিত্তিতে সৎ, আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতার মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে তাদের দেখে পিতা-মাতার চোখ জুড়াবে এবং তারা যাবতীয় কাজে-কর্মে, অফিস-আদালতে নেতৃত্ব-কর্তৃত্বে জ্ঞানে-গুণে ও নীতি-আদর্শে সর্বত্র গৌরবময় আসন লাভ ও সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।
উপরোক্ত নৈতিক শিক্ষাগুলোর মাধ্যমে যে সমাজ তথা দেশ গড়ে উঠবে, সে সমাজে শান্তির সুশীতল ছায়া নেমে আসবে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে, দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত সমাজ তথা রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে সুদৃঢ় ও মজবুত।