প্রতিদিন সকালে পত্রিকার পাতা খুললেই পরিচিত একটি শিরোনাম চোখে পড়ে- ‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ‘। এসব খবর এখন আমাদের কাছে এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে, আমরা পাতা উল্টে পরের খবরে চলে যাই। কিন্তু প্রতিটি শিরোনামের পেছনে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প, একজন মায়ের বুক ফাটা কান্না, একটি শিশুর অনাথ হয়ে যাওয়ার বেদনা লুকিয়ে থাকে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়- এটি একটি নিয়মিত ঘটনা, একটি নীরব হত্যাযজ্ঞ, যার দায় এড়াতে পারে না রাষ্ট্র।

বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার মানুষ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ অনেক দুর্ঘটনা রিপোর্ট করা হয় না। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এর মধ্যে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী- সব শ্রেণির মানুষ রয়েছেন। শুধু মৃত্যু নয়, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেন, যাদের পুরো জীবন বদলে যায় একটি মুহূর্তে। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন দুর্ঘটনায় মারা যান বা পঙ্গু হয়ে যান, তখন সেই পরিবার পড়ে যায় অসহায়ত্বে। সন্তানরা ঝরে পড়ে স্কুল থেকে, স্ত্রী হয়ে পড়েন অসহায়, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের কেউ থাকে না।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ একটি নয়, বহুমুখী। প্রথমত, আমাদের সড়কব্যবস্থা। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় অবস্থা কতটা ভয়াবহ। রাস্তায় গর্ত, অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার, ভাঙা কালভার্ট, সাইনবোর্ডের অভাব- এসব তো আছেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ দখল। রাস্তার দুই পাশে দোকান, হোটেল, মার্কেট যেন সড়কের অংশ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বড় কারণ হলো অদক্ষ ও অসচেতন চালক। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামান্য ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। প্রকৃত ড্রাইভিং পরীক্ষা হয় না। ফলে রাস্তায় নামে এমন চালক, যারা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন নন, সঠিকভাবে গাড়ি চালাতে জানেন না। বাসের চালক ও হেলপাররা পথে-ঘাটে প্রতিযোগিতা করে, যাত্রী তোলার জন্য ছুটোছুটি করে, ওভারটেক করে। মাদকাসক্ত চালকদের কথা তো আলাদা- অনেক দুর্ঘটনার পেছনে এই মাদকাসক্তি দায়ী। তৃতীয় কারণ হলো যানবাহনের ত্রুটিপূর্ণ অবস্থা। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলে অহরহ। ব্রেক নেই, লাইট নেই, হর্ন নেই- এমন গাড়িও চলাচল করে। বাসের মালিকরা শুধু টাকা কামাতে চান, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন না। চতুর্থত, ট্রাফিক আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। সিগন্যাল ভাঙা, ভুল পথে চলা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া- এসব নিত্যদিনের ঘটনা। পুলিশ কখনো কখনো অভিযান চালায়, কিন্তু তা স্থায়ী সমাধান নয়।

গত এক দশকে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। এটি একদিকে যেমন যাতায়াত সহজ করেছে, অন্যদিকে বাড়িয়েছে দুর্ঘটনার হার। বিশেষত তরুণরা বাইক চালানোর সময় হেলমেট পরেন না, অতিরিক্ত গতিতে চালান, রাতের বেলা বিপজ্জনক স্টান্ট করেন। ফলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একটি মোটরসাইকেলে তিন-চারজন আরোহী। কেউ কেউ শিশুসহ পুরো পরিবার নিয়ে বাইক চালান, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ডেলিভারি রাইডাররা সময়ের চাপে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সরকার সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে, ট্রাফিক আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের দায়িত্বে আছে, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদানের দায়িত্বে আছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কতটা সফল? প্রথমত, সড়কের মান উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু নতুন সড়ক তৈরি নয়, পুরোনো সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। কিন্তু দেখা যায়, একবার সড়ক তৈরি হলে তা বছরের পর বছর মেরামত হয় না। গর্ত পড়লে সাময়িক তালি দেওয়া হয়, যা কিছুদিন পরেই আবার উঠে যায়। দ্বিতীয়ত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। ঢাকা শহরে যানজট যেমন একটি বড় সমস্যা, তেমনি মহাসড়কগুলোতেও সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব। সিগন্যাল ব্যবস্থা দুর্বল, জেব্রা ক্রসিং নেই বললেই চলে, ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস যথেষ্ট নয়। পথচারীদের জন্য নিরাপদ রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা নেই। ফলে মানুষ রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। তৃতীয়ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ। আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু তা কাগজেই থেকে যায়। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, সিট বেল্ট না পরা, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো- এসব অপরাধের জন্য যথাযথ শাস্তি হয় না। ঘুষ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। চতুর্থত, গণসচেতনতা বৃদ্ধি। রাষ্ট্রের উচিত ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা। স্কুল-কলেজে ট্রাফিক আইন শেখানো, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা- এসব উদ্যোগ নিতে হবে।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিমানবন্দর সড়কে দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকায় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। তারা নিজেদের হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে দেখিয়েছিল যে ইচ্ছা থাকলে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব। সেই আন্দোলনে সরকার নড়েচড়ে বসে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে। কিন্তু আজ কয়েক বছর পর দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। দুর্ঘটনা হচ্ছেই, মানুষ মরছেই।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা আনতে হবে, প্রকৃত দক্ষতা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এছাড়া, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে, মাদকাসক্ত চালকদের চিহ্নিত করে চাকরিচ্যুত করতে হবে। যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে- ওভারলোডেড বা ত্রুটিপূর্ণ গাড়িতে না চড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। মহাসড়কে জরুরি সেবা কেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জোরদার করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা এখন বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নের জন্য একটি বড় হুমকি। প্রতিটি দুর্ঘটনায় শুধু একটি প্রাণই যায় না, ধ্বংস হয় একটি পরিবার, নষ্ট হয় স্বপ্ন, থেমে যায় সম্ভাবনা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের জীবন রক্ষায় দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন অর্থহীন। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়, এটি প্রতিরোধযোগ্য। সঠিক নীতি, কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং সবার সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পারি। রাষ্ট্রকে তার নীরব দায় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তবেই আমরা আশা করতে পারি, একদিন সকালের পত্রিকায় আর সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ শিরোনাম দেখতে হবে না, পথে বের হওয়া মানুষটি নিরাপদে ঘরে ফিরবেন।