আমাদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল ৫ জুন ২০২৪। সেদিন প্রথম আমরা কোটার বিরুদ্ধে মিছিল করি এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করি। তারপর কুরবানির ঈদ ও অন্যান্য ছুটি থাকায় আমরা সবাই যার যার মতো ছুটি কাটাই। ক্যাম্পাসে ফিরে শুনতে পাই, হাইকোর্ট কর্তৃক কোটা পুনর্বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা সেটি মেনে নিতে পারিনি এবং তখন থেকে আমরা ব্যানার-বক্তব্যসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে থাকি।

১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ছাড়া সকলকে রাজাকার উপাধি দিলে তারই প্রেক্ষিতে সেদিন রাত ১১:৩০টায় আমরা মিছিলের ডাক দিই। মিছিলে গিয়ে শুনতে পাই, আমাদের কয়েকজন সহযোদ্ধাকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ আটক করে নির্যাতন করছে। আমরা মিছিল নিয়ে বটতলা থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের অভিমুখে যাত্রা শুরু করি।

হলে গিয়ে আমরা ঘটনার সত্যতা যাচাই ও জড়িতদের পরিচয় জানতে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাই। কিন্তু হলের তৎকালীন প্রাধ্যক্ষ নজমুল হোসেন তালুকদার আমাদের কাছে কিছুক্ষণ সময় চান। আমরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে পুনরায় হলের সামনে গেলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের বাধা দেয় এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আহত করে। শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে তারা হলে পালিয়ে যায় এবং হলের গেটে তালা মেরে দেয়। পরে আমরা আবার সিসিটিভি ফুটেজ চাইলে প্রাধ্যক্ষ দেখাতে অপারগ হন এবং তোপের মুখে পদত্যাগ করেন।১৫ জুলাই আমরা আগের রাতের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করি। শত শত শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বটতলায় প্রবেশ করলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি, হকিস্টিক, লোহার রড ও হাতুড়ি নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়। মিছিলে সামনের সারিতে থাকায় প্রথম হামলার শিকার হই আমি। অনেক শিক্ষার্থী মারাত্মক আহত হয়; নারীরাও রেহাই পায়নি। অনেককে ক্যাম্পাস মেডিকেলে ও পরে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করে। ১৬ জুলাই আশেপাশের এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাজারো মানুষ ক্যাম্পাসে এসে সংহতি জানায়। ১৭ জুলাই প্রশাসন হল ভ্যাকেন্ট ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে পুলিশ গুলি চালায়; প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়। হলগুলোতে পুলিশি অভিযান চালানো হয় এবং শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে বাধ্য হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে আমরা আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাই। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মোবাইল কল ও এসএমএসের মাধ্যমে কর্মসূচি সমন্বয় করি। আমি আহত থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি। পরিবার ও গ্রামে নানা চাপ, হুমকি ও মামলার ভয় দেখানো হয়। পুলিশ বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায়। কিছুদিন আত্মীয়ের বাসায় ও বিভিন্ন স্থানে থেকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকি। ৫ আগস্ট নিজেকে আর আটকে রাখতে পারিনি। আত্মীয়সহ গণভবনের উদ্দেশ্যে বের হই। সেদিন উত্তরা এলাকায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। কিছু সময় পর খবর আসে—স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে। সারা দেশে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এভাবেই প্রায় ২০০০ শহীদ ও অসংখ্য গাজীর আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছি।